চাঁদা না দেওয়ায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, লুট

বাকলিয়া এক্সেস রোডের ঘটনা । বিদেশি নম্বর থেকে ডেভিড ইমন পরিচয়ে ফোন । এককালীন দুই কোটি ও মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি

আজাদী প্রতিবেদন | মঙ্গলবার , ১৪ জুলাই, ২০২৬ at ৬:০৩ পূর্বাহ্ণ

নগরীতে দুই কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে দিনদুপুরে একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী (আইএসপি) প্রতিষ্ঠানে সশস্ত্র হামলা, ব্যাপক ভাঙচুর ও ৩৫ লাখ টাকা লুটের অভিযোগ উঠেছে। হামলার ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে নগরীর ইন্টারনেট ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে। পুলিশ বলছে, বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অনুসারীরা এ ঘটনায় জড়িত থাকতে পারে। তাদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

গতকাল সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নগরীর চকবাজার থানাধীন চন্দনপুরাবাকলিয়া এক্সেস রোডে অবস্থিত ডিজিটাল ডট নেট (ডিডিএন) কার্যালয়ে এ হামলার ঘটনা ঘটে। ঘটনার ব্যাপারে চকবাজার থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির মালিক আদিল বিন মামুন পুলিশকে জানিয়েছেন, ঘটনার দুই দিন আগে বিদেশি একটি নম্বর থেকে মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন পরিচয়ে একজন তাকে ফোন করে ব্যবসা চালিয়ে যেতে হলে এককালীন দুই কোটি টাকা এবং পরে প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। তিনি চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে হামলার হুমকিও দেওয়া হয়। ফোনে বলা হয়, ব্যবসা করতে হলে দুই কোটি টাকা রেডি রাখেন, আর প্রতিমাসে দশ লাখ টাকা করে দিয়ে দেবেন।

থানায় করা অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গতকাল দুপুরে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি সশস্ত্র দল হঠাৎ অফিসে ঢুকে কর্মচারীদের জিম্মি করে ব্যাপক তাণ্ডব চালায়। তারা অফিসের কম্পিউটার, নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম, আসবাবপত্র ও কর্মীদের মোবাইল ফোন ভাঙচুর করে। হামলাকারীদের একজনকে কুড়াল দিয়ে কম্পিউটার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতিতে আঘাত করতে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে। হামলার সময় প্রতিষ্ঠানটিতে সেবা নিতে আসা নারী পুরুষকে আতঙ্কে ছোটাছুটি করতে দেখা যায়। সন্ত্রাসীদের তান্ডবে পুরো অফিসটি লন্ডভন্ড হয়ে যায়। কাচের শোকেস, টেবিলসহ সবকিছু ভেঙে তছনছ করে দেয়া হয়। চাইনিজ কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে ভেঙে ফেলা হয় সবকটি ডেঙটপ। সন্ত্রাসীরা অফিসের ল্যাপটপ নিয়ে যেতে দেখা যায়। সন্ত্রাসীদের হুমকি ধমকি, গালাগাল এবং শোরচিৎকারে আশেপাশেও আতংকের সৃষ্টি হয়। চাঁদা না পেয়ে মনের খেদ মিটিয়ে তাণ্ডব চালানোর পর সন্ত্রাসীরা অফিস ছেড়ে নির্বিঘ্নে চলে যায়।

গতকাল বিকেলে অফিসের একজন কর্মচারী বলেন, তাদের ইন্টারনেট সেবা প্রদান বন্ধ রয়েছে। এতে এলাকার বহু পরীক্ষার্থীসহ মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন বলেও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক রিদোয়ানুল কবির বলেন, অফিস চলাকালীন সময়েই হামলাকারীরা কর্মচারীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে বেতন পরিশোধের জন্য অফিসে রাখা ৩৫ লাখ টাকা নিয়ে যায়। পুরো ঘটনাটি প্রতিষ্ঠানের সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ হয়েছে।

হামলার পরপরই চকবাজার থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে গতরাতে চকবাজার থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নুর হোসেন মামুন বলেন, ঘটনার ব্যাপারে মামলা হয়েছে। হামলায় জড়িতদের শনাক্তে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। তিনি সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে পুলিশ ইতোমধ্যে অভিযান শুরু করেছে বলেও জানান।

প্রতিষ্ঠানটির মালিক আরও দাবি করেন, ফোনালাপে ডেভিড ইমন নিজেকে চট্টগ্রামের সবাই চেনে বলে উল্লেখ করেন। এমনকি নিজের ছবি পুলিশ কমিশনারকে দেখিয়ে চিনে নিতে বলেছিলেন। পাশাপাশি স্মার্ট গ্রুপের পরিচালক মুজিবুর রহমানের বাসায় চাঁদা না পেয়ে গুলি চালানোর ঘটনার কথাও উল্লেখ করে একই পরিণতির হুমকি দেন।

উল্লেখ্য, চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি এই ডিডিএন কার্যালয়ের পাশেই পুলিশি পাহারায় থাকা স্মার্ট গ্রুপের পরিচালক মুজিবুর রহমানের বাসা লক্ষ্য করে দুর্বৃত্তরা গুলি চালায়। অভিযোগ ছিল, কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অনুসারীরা ওই হামলা চালিয়েছিল। এরও আগে ২ জানুয়ারি একই বাসায় গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে। পরপর দুই দফা হামলার পর বাসাটিতে পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছিল।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মোবারক হোসেন ওরফে ইমন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার বাসিন্দা। তিনি মো. মুসার ছেলে। বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে চট্টগ্রামে অপরাধী চক্র পরিচালনা করছেন বলে পুলিশ জানায়। ইমনের বিরুদ্ধে অন্তত সাতটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকায় আলোচিত জোড়া খুন এবং একই বছরের ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় সন্ত্রাসী ‘ঢাকাইয়া আকবর’ হত্যা মামলাও রয়েছে। পুলিশ বলছে, বাকলিয়ার জোড়া খুনে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী ও মোটরসাইকেল সরবরাহের দায়িত্বে ছিলেন তিনি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, ইমন অন্তত ১৫ থেকে ২০টি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেছেন এবং অস্ত্র পরিচালনায় দক্ষ। তিনি বিদেশে থাকা বড় সাজ্জাদের নির্দেশে চট্টগ্রামে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

পুলিশ জানায়, বড় সাজ্জাদের হয়ে বর্তমানে চট্টগ্রামে অপরাধী নেটওয়ার্ক পরিচালনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন মোবারক হোসেন ও মোহাম্মদ রায়হান। এর আগে একই নেটওয়ার্কের নেতৃত্বে ছিলেন সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ। তিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। রায়হানের বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজি, অস্ত্র ও হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে অন্তত আটটি মামলা রয়েছে।

পুলিশের দাবি, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে প্রায় ৫০ জন শুটার ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছে। তারা ব্যবসায়ী, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে নিয়মিত চাঁদা দাবি করছে। অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগ করলেও পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।

গতকালের ঘটনায় নগরীর ব্যবসায়ী মহলে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সিসিটিভি ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষিতে ঘটনাটি আলোচনায় উঠে আসে। ব্যবসায়ীরা দ্রুত হামলাকারীদের গ্রেপ্তার এবং চাঁদাবাজ চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ১৩ হাজার ৮৬০ ঘর, ৩৭৪ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
পরবর্তী নিবন্ধকুতুবদিয়ায় বোটডুবিতে নিখোঁজ চার জেলের মরদেহ উদ্ধার