প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের (এমপি) সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত ১০ অক্টোবর সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদ ভবনে সরকারদলীয় সদস্যদের সভাকক্ষে এ সভা শেষে সাংবাদিকদের চিফ হুইপ মো. নুরুল ইসলাম মনি বলেছেন, চাঁদাবাজ ও দখলদারদের বিএনপিতে কোনো জায়গা নেই। কেউ বিএনপির নাম ব্যবহার করে অন্যায় করে পার পেয়ে যাবেন, এমন সুযোগ দল দেবে না। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছেন।
বৈঠকে সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন সমস্যা, সরকারের কার্যক্রম, সংসদ পরিচালনা, আইন–শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, শিক্ষা ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।
আসন্ন দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপন ও আইন–শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সংসদ সদস্যদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে জানান চিফ হুইপ। তিনি বলেন, ‘পূজায় যাতে কোনো ধরনের ব্যত্যয় না ঘটে, সে জন্য আইন–শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসন কাজ করবে। পাশাপাশি বিএনপির নেতারা, কর্মী এবং সংসদ সদস্যদেরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত থাকতে বলা হয়েছে। সনাতন সমপ্রদায়সহ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর কেউ যাতে কোনো সমস্যার সম্মুখীন না হন, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে এবং তাদের পাশে দাঁড়াতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।’ দলীয় শৃঙ্খলা নিয়ে আলোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে চিফ হুইপ বলেন, ‘বৈঠকে শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সবাইকে দলীয় শৃঙ্খলার মধ্যে থাকার কথা বলা হয়েছে।’
চাঁদাবাজি ও দখলদারির অভিযোগে বিভিন্ন স্থানে দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার প্রসঙ্গ তুলে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বলা হয়েছে। চাঁদাবাজ ও দখলদারদের কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।’
চাঁদাবাজ ও দখলদারদের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী যে জিরো টলারেন্স দেখিয়েছেন, তা প্রশংসনীয়। তবে এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা বলেন, মুশকিল হলো, এ ধরনের অনুপ্রেরণাদায়ক কথাবার্তা রাজনৈতিক মহলে হরহামেশাই বলা হয়ে থাকে। এই চোখরাঙানির সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির কোনো মিল থাকে না। দলের নেতৃস্থানীয় মহল যেসব কথা বলে থাকে, তা স্থানীয় পর্যায়ের অনেক মাসলম্যানই অগ্রাহ্য করে থাকেন। আওয়ামী সরকারের পতনের পর থেকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় যে দখল ও চাঁদাবাজির ঘটনাগুলো ঘটেছে, তার অনেকগুলোই রাজনৈতিক দলের নেতা–কর্মীদের করা। অর্থাৎ পটপরিবর্তনের পর একটি গণতান্ত্রিক শান্তিপূর্ণ দেশের যে আকাঙ্ক্ষা জন্মেছিল দেশবাসীর মনে, তা ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসার পেছনে এই ধরনের দখলদারত্ব আর চাঁদাবাজির প্রভাব রয়েছে। শুধু একটি দলের কথা বললেই হবে না, অনাচার তৈরি করার দিকে অন্য অনেক দলেরই ‘সাফল্য’ রয়েছে। ফলে মব সন্ত্রাসকেও পুরোনো বোতলে নতুন মদ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে সরকারের লোকজনই। ভয়ানক বিশৃঙ্খল মবকে প্রেশার গ্রুপ হিসেবে উল্লেখ করলে তা ইতিবাচক হয়ে যায় না। বরং এর মধ্যে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনদের জন্ম হতে থাকে, এ কথা বুঝতে না পারলে বোকার স্বর্গে বসবাস করার বিকল্প নেই। অনৈতিক এবং বেআইনি শক্তি প্রদর্শন করার অর্থ আইনশৃঙ্খলার ভরাডুবি, এটা না বুঝলে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতেই থাকবে এবং তা সামাল দেওয়া একসময় কঠিন হয়ে পড়বে।
বিশ্লেষকদের মতে, চাঁদাবাজি ও দখলের মতো অপরাধের সঙ্গে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকলে সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাঁরা বলেন, ক্ষমতায় যাওয়ার পর রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের একটি অংশ অতীতের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার নামে শক্তি প্রয়োগ করে দখল ও চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়তে পারেন। এসব অপরাধ ঠেকাতে দলীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি আইনের কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ জরুরি। চাঁদাবাজি ও দখলের ঘটনায় সরকারি দলের কারও কারও নাম আসার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সরকার অপরাধীদের প্রশ্রয় দিচ্ছে না। তবে সরকারি দলের কেউ এসব ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগও তাঁরা উড়িয়ে দেননি। তাঁদের মতে, অপরাধের শিকার মানুষ প্রতিকার না পেলে এর দায় শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপরই বর্তাবে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, জমি দখল ও নির্মাণ কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগগুলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।






