চট্টগ্রামে এখনো চাহিদার অর্ধেকের কম গ্যাস

সামিট থেকে সরবরাহ শুরু, এক্সিলারেট থেকে আসছে আংশিক দুর্ভোগ কমেনি, আজ থেকে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়তে পারে

আজাদী প্রতিবেদন | রবিবার , ১৬ আগস্ট, ২০২৬ at ৬:৫৮ পূর্বাহ্ণ

মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে সামিট থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে আংশিক গ্যাস সরবরাহ চলছে। দুটি মিলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ বাড়লেও চট্টগ্রামে এখনো চাহিদার অর্ধেকের কম গ্যাস পাচ্ছে। গতকাল শনিবার সকালে চট্টগ্রামে ১২০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং রাতে ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হয়েছে। অবশ্য আজ থেকে সরবরাহ কিছুটা বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সূত্র জানিয়েছে, সামিট এলএনজি টার্মিনাল থেকে গতকাল ৪৬০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনাল থেকে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মিলে জাতীয় গ্রিডে মোট ৭৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। তবে দুটি টার্মিনাল স্বাভাবিকভাবে পুরোদমে সরবরাহ করতে পারলে অন্তত ১১শ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যাওয়ার কথা। এক্সিলারেট পরিচালিত টার্মিনালের দৈনিক রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং সামিট টার্মিনালের সক্ষমতা ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে যাচ্ছে সক্ষমতার মাত্র ৬৯ শতাংশ। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির শীর্ষস্থানীয় একজন কর্মকর্তা বলেন, এখানকার পরিস্থিতি আমরা উপর মহলে জানিয়েছি। দুয়েকদিনের মধ্যে চট্টগ্রামের পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে।

সামিটের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গত কয়েক দিনে দেশের গ্যাস পরিস্থিতি নাজুক হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে চট্টগ্রামসহ শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশন এবং আবাসিক গ্রাহকেরা বড় সংকটে পড়ে। সামিট থেকে সরবরাহ পুনরায় শুরু হওয়ায় জাতীয় পর্যায়ে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও চট্টগ্রামের সার্বিক সংকটের দুরবস্থা এখনো কাটেনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সামিটের টার্মিনালে নতুন একটি এলএনজি কার্গো ভেড়ানোর পর রিগ্যাসিফিকেশন শুরু হয়। বুধবার বেলা ৩টার পর টার্মিনালটি থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। নতুন কার্গো ভেড়ানোর ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল।

পেট্রোবাংলার দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা বলেন, এর আগে আসা ‘আল হামরা’ নামের এলএনজিবাহী জাহাজটি সামিটের টার্মিনালে খালাসের ক্ষেত্রে জাহাজটির উপযোগিতা ও নিরাপত্তা নিয়ে আপত্তি ছিল। টার্মিনালসংশ্লিষ্ট পক্ষের আপত্তির কারণে ওই কার্গো ভেড়ানো সম্ভব হয়নি। ফলে নতুন কার্গো না আসা পর্যন্ত টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়।

মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর একটি এঙিলারেট এনার্জির এবং অন্যটি সামিট এলএনজি টার্মিনাল। দেশে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ার পর আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা ক্রমেই বেড়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম পুরোপুরি এই আমদানিকৃত এলএনজি নির্ভর। ফলে এই দুটি টার্মিনালের যেকোনো একটিতে সমস্যা দেখা দিলে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়।

গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে এঙিলারেট পরিচালিত এলএনজি টার্মিনালে আগুনের ঘটনায় বয়লার পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত বৈদ্যুতিক তার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যায়। দুই সপ্তাহের বেশি সময় বন্ধ থাকার পর একটি রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট আংশিকভাবে চালু করা সম্ভব হয়। তবে এখনো টার্মিনালটি পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরে আসেনি। বর্তমানে সেখান থেকে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে, যেখানে পূর্ণ সক্ষমতায় সরবরাহ করার কথা ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট।

একই সময়ে সামিট টার্মিনালও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় সংকট তৈরি হয়। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়। চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যায়। সিএনজি স্টেশনগুলোতেও দীর্ঘ অপেক্ষা তৈরি হয়। বাসাবাড়িতেও গ্যাসের চুলা বন্ধ হয়ে যায়।

দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি করা এলএনজি মিলিয়ে স্বাভাবিক সময়ে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ থাকে প্রায় ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে স্বাভাবিক সময়ে চাহিদার তুলনায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এলএনজি সরবরাহে সামান্য ব্যত্যয় ঘটলে সেই ঘাটতি আরো প্রকট হয়।

গ্যাসের এই সংকটের পেছনে দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতাও ভূমিকা রাখছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি সরবরাহে বাধা তৈরি হয়েছে। ফলে চাহিদা মেটাতে সরকারকে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকেও কার্গো সংগ্রহের দিকে যেতে হচ্ছে।

এদিকে সামিট এলএনজি টার্মিনালের মালিকানায় সামিট কর্পোরেশনের অংশীদারত্ব রয়েছে ৭৫ শতাংশ এবং জাপানের মিতসুবিশির ২৫ শতাংশ। টার্মিনালটিতে এঙিলারেট এনার্জির ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) ব্যবহার করা হয়। ২০১৯ সালে চালুর পর ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এই টার্মিনালে ২৫০টি জাহাজ থেকে এলএনজি স্থানান্তর সম্পন্ন হয়েছে বলে সামিটের তথ্য থেকে জানা যায়। অন্যদিকে এঙিলারেটের মালিকানাধীন মহেশখালী এলএনজি টার্মিনালটি ১৫ বছর পরিচালনার পর চুক্তি অনুযায়ী পেট্রোবাংলার কাছে হস্তান্তরের কথা রয়েছে। দেশের গ্যাস সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আনার ক্ষেত্রে দুটি টার্মিনালের নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রমকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দুটি টার্মিনাল থেকে গতকাল ৭৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেছে। টার্মিনাল দুটি কবে নাগাদ পুরো সক্ষমতায় চলতে পারবে তা অনিশ্চিত। এতে করে ঠিক কবে নাগাদ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে তাও নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না কেউ। শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের চাহিদা বেশি। বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো হলে শিল্পকারখানা ও সিএনজি খাতে চাপ তৈরি হচ্ছে। আবার শিল্পে সরবরাহ বাড়ালে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ রাখতে হচ্ছে। সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনগুলোতে গাড়ির লাইন কয়েক কিলোমিটার ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

দেশের অন্যতম প্রধান শিল্প ও বন্দরনগরী হিসেবে চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ, সার, স্টিল, সিমেন্ট, পোশাক, কাচ, জাহাজ নির্মাণসহ বিভিন্ন শিল্পে বিপুল পরিমাণ গ্যাস প্রয়োজন। একই সঙ্গে নগরীর পরিবহনব্যবস্থার একটি বড় অংশ সিএনজিনির্ভর। ফলে এখানে গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে হাহাকার শুরু হয়। গত কদিন ধরে চট্টগ্রামে হাহাকারই চলছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধগ্যাসের সংকট কয়েক দিনের মধ্যে অনেকাংশে কমে আসবে : প্রধানমন্ত্রী
পরবর্তী নিবন্ধআনোয়ারায় ‘নতুন যুগের’ অপেক্ষা