গণিত অলিম্পিয়াড : বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশী মেধার অনন্য অভিযাত্রা

ড. উজ্জ্বল কুমার দেব | বৃহস্পতিবার , ২৩ জুলাই, ২০২৬ at ৭:২৩ পূর্বাহ্ণ

বিশ্বের প্রায় সকল মানুষ মাসব্যাপী একধরনের ফুটবল উন্মাদনার মধ্যে ছিল। ফুটবল বিশ্বকাপের ডামাডোলে বাংলাদেশও যে আরেকটা বিশ্ব প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল সেটা আমরা অনেকেই হয়ত জানিনা। আর সেটা হলো গণিতের বিশ্ব শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। এটি ছিল ৬৭তম আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াড (আইএমও), যা অনুষ্ঠিত হয় চীনের সাংহাই প্রদেশে। এবারের অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের সোনার ছেলেরা একটি রৌপ্য ও পাঁচটি ব্রোঞ্জপদক পেয়ে নতুন ইতিহাস গড়েছে। আরও আনন্দের ব্যাপার হচ্ছে ছয়জন প্রতিযোগীর সবাই পদক পেয়েছে; আগে বাংলাদেশের অলিম্পিয়াড ইতিহাসে যা কখনও ঘটেনি। এবারের আসরে বাংলাদেশ দলীয়ভাবে মোট ১২১ নম্বর অর্জন করেছে, যা এখন পর্যন্ত এ আয়োজনে দেশের সর্বোচ্চ দলীয় নম্বর। বাংলাদেশের অবস্থান ১১৭টি দেশের মধ্যে ৩৯তম। প্রতিটি দেশ থেকে প্রাক্‌–বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের সর্বোচ্চ ছয়জন শিক্ষার্থী এই মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারে। এবার ১১৭টি দেশ ও অঞ্চল থেকে ৬৬৬ জন শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণ করেছে। গত ১৪ জুলাই উদ্বোধনী পর্বের মাধ্যমে শুরু হয় এবারের আয়োজন। ১৫ ও ১৬ জুলাই দুই দিন পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষার্থীদের দুই দিনে জ্যামিতি, কম্বিনেটরিক্স, নাম্বার থিওরি ও বীজগণিতের মোট ৬টি সমস্যার সমাধান করতে দেওয়া হয়। প্রতিদিন তিনটি সমাধানের জন্য সাড়ে চার ঘণ্টা করে মোট ৯ ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়। আমাদের শিক্ষার্থীরা সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে মেধার স্বাক্ষর রেখে সাফল্য ছিনিয়ে এনেছে। আমার আলাদা করে ভালো লাগছে এজন্য যে, বিজয়ী ছয় জনের দুজন চট্টগ্রামের।

গণিত অলিম্পিয়াডের শুরুটা আসলে বলতে গেলে ১৯৯৪ সালে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে তল্পিতল্পা ঘুছিয়ে বিলেত জীবনকে বিদায় জানিয়ে দেশে ফিরেছেন অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল, সঙ্গে এনেছেন গণিতের প্রতি এক ভিন্ন দর্শন। তিনি দেখেছিলেন কীভাবে পশ্চিমা দেশগুলোতে ছোট ছোট শিশুরা ধাঁধার মতো গণিত সমস্যা সমাধান করে আনন্দ পায়। সেই দর্শন তিনি ভাগ করে নেন তৎকালীন বুয়েট অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ স্যারের সঙ্গে। বর্তমানে তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন এবং বাংলাদেশ গণিত অলিম্পয়াড কমিটির সভাপতি হিসেবে আছেন। দুজনে মিলে ভাবতে থাকেন–কীভাবে বাংলাদেশের মাটিতেও এমন একটা আন্দোলন গড়ে তোলা যায়? কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবের আঘাতে বারবার কুঁকড়ে যাচ্ছিল। কারণ তখনকার বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় গণিত ছিল মুখস্থনির্ভর এক ভয়াবহ যন্ত্রণার নাম। কেউ ভাবতেও পারত না যে গণিতকে উৎসবের অংশ করা যায়।

এই উৎসাহের ধারাবাহিকতায় ২০০২ সালের ২৬ জানুয়ারি কারওয়ান বাজারের একটি সাধারণ মিলনায়তনে আয়োজন করা হলো ‘গণিত অলিম্পিয়াড’ নামের এক ছোট পরিসরের প্রতিযোগিতা। অংশ নিয়েছিল মাত্র কয়েকশো শিক্ষার্থী। কিন্তু তার মধ্যেই ছিল এক অসাধারণ সম্ভাবনার ইঙ্গিত। পরের বছর, ২০০৩ সালে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হলো প্রথম জাতীয় গণিত অলিম্পিয়াড যেখানে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল স্যার অধ্যাপনা করতেন। সেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছাত্রছাত্রীরা সমবেত হলো। সেই অনুষ্ঠান দেখে অনেকের চোখে জল এসে গিয়েছিল–আহা, আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরাও পারে।

লেখাটি এতটুকু পড়ে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগছে– কীভাবে কাজ করে গণিত অলিম্পিয়াড? আপনারা যারা বিস্তারিত জানেন না তাদের জন্য প্রক্রিয়াটি একটু বলছি। বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করে। সাধারণত জুন মাসে শুরু হয় অনলাইন নিবন্ধন যাতে কোন পয়সা দিতে হয়না। তারপর শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি নিয়ে ধাপে ধাপে এগোতে হয়। প্রথম ধাপে অনলাইন বাছাই পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এই পর্বে তৃতীয় শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণির যেকোনো শিক্ষার্থী অংশ নিতে পারে। প্রশ্ন থাকে ১০– ১৫টি, উত্তর দিতে হয় অনলাইনে। বাছাই পর্বে ভালো করলেই পরবর্তী ধাপের সুযোগ মেলে যা আঞ্চলিক পর্ব নামে পরিচিত। সারা দেশে প্রায় ১৫–১৮টি আঞ্চলিক কেন্দ্রে এই পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, ময়মনসিংহ–প্রায় সব বিভাগীয় শহরেই কেন্দ্র রয়েছে। আঞ্চলিক পর্বে সাধারণত ২ থেকে ৩ ঘণ্টার একটি পরীক্ষা নেওয়া হয়, যেখানে ছয় থেকে আটটি জটিল সমস্যা সমাধান করতে হয়। এই পর্ব থেকে সেরা প্রায় ১২০০ জন নির্বাচিত হয় জাতীয় পর্বের জন্য। এদের নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় পরবর্তী ধাপ জাতীয় পর্ব য়া জাতীয় গণিত উৎসব নামে পরিচিত। ঢাকায় সব নির্বাচিত শিক্ষার্থী একসঙ্গে জড়ো হয়। এখানে হয় আরেকটি কঠিন পরীক্ষা। সেখান থেকে প্রায় ৮০–৮৫ জনকে নির্বাচিত করা হয়। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। এই ৮৫ জনের জন্য আয়োজন করা হয় একটি ‘ন্যাশনাল ক্যাম্প’–যেখানে এক সপ্তাহব্যাপী কঠোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। দেশের অভিজ্ঞ গণিতবিদ ও অলিম্পিয়াড কোচরা ক্যাম্পে অংশগ্রহণকারীদের বিশেষ সমস্যা সমাধানের কৌশল শেখান। ক্যাম্প শেষে আরেকটি পরীক্ষার মাধ্যমে নির্বাচিত করা হয় বাংলাদেশ জাতীয় গণিত দল ; যার সদস্য সংখ্যা মাত্র ছয়জন। এই ছয়জনই অংশ নেয় আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে। পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক। প্রশ্ন তৈরি করেন অভিজ্ঞ গণিতবিদরা। যাতে কোনো পক্ষপাতিত্বের সুযোগ না থাকে। আর সবচেয়ে বড়ো ব্যাপার–এই প্রতিযোগিতায় বলে রাখা ভালো, আন্তর্জাতিক অলিম্পয়াডে যাওয়া আসা, রেজিস্ট্রেশন ফি, থাকা খাওয়া কোন কিছুই প্রতিযোগীকে বহন করতে হয় না । ডাচ্‌–বাংলা ব্যাংক ও ‘প্রথম আলো’ এর প্রধান পৃষ্ঠপোষক। বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি নিরলস পরিশ্রম করে বছরের পর বছর এই বিশাল আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন করছে।

এখন আসি আমাদের সবচেয়ে গর্বের জায়গায়। ২০০৫ সালে প্রথমবার আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে পা রাখে বাংলাদেশ। সেই প্রথম যাত্রায় আমরা কোনো পদক পাইনি, তবে বাংলাদেশের নাম বিশ্ববাসীকে জানান দিতে পেরেছিলাম। তারপর থেকে এই অভিযাত্রা একবারও থেমে নেই। আজ বাংলাদেশের দল আইএমওতে পদক পাওয়ার দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সফল দল। আমার কাছে পরিসংখ্যানটি বিস্ময়কর মনে হয়। এ পর্যন্ত আমরা পেয়েছি একটি স্বর্ণপদক। সেটিও ২০১৮ সালে–চট্টগ্রামের ছেলে আহমেদ জাওয়াদ চৌধুরীর মাধ্যমে যা আমাদের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক। এর আগে কখনো স্বর্ণ জোটেনি। এই স্বর্ণপদক জয়ের কাহিনী ভবিষ্যতে গল্প হয়ে মুখে মুখে ফিরবে। এবারের ৬৭ তম আসরসহ মোট আটটি রৌপ্যপদক। পঁয়তাল্লিশটিরও বেশি ব্রোঞ্জপদক। আর চুয়াল্লিশটির মতো সম্মানসূচক স্বীকৃতি (অর্থাৎ পদকের একেবারে কাছাকাছি)। প্রতিটি পদকের পিছনে রয়েছে একেকটি গল্প, মা–বাবার ও পরিবারের অনেক ত্যাগ ও নিষ্ঠার প্রতিফলন।

গণিত অলিম্পয়াডের হাত ধরে এখন সায়েন্স, ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, এ আই, রোবোটিক্স অলিম্পয়াড চলছে বেশ ক‘বছর ধরে। যারা ভাবছে–আমি পারব কি না? বা আমি তো তেমন ভালো গণিত জানি না–তাদের বলব, প্রথমে ভয় কাটিয়ে উঠতে হবে। অলিম্পিয়াডের জন্য আলাদা কোনো জন্মগত মেধা লাগে না। লাগে শুধু কৌতূহল, লাগে একটু ধৈর্য। গণিতের বইয়ের বাইরের গল্পগুলো জানতে হবে। ধাঁধার জগতে পা বাড়াতে হবে। ছোট ছোট সমস্যা দিয়ে শুরু করতে হবে। দিনে অন্তত আধঘণ্টা চর্চা করতে হবে এবং ধীরে ধীরে যুক্তির জগতে হারিয়ে যেতে হবে। পরিশেষে বলি, গণিত অলিম্পিয়াড এমন এক জায়গা, যেখানে ক্লাস এইটের একজন ছাত্র ক্লাস টুয়েলভের ছাত্রকে হারাতে পারে। পরীক্ষার নম্বর সেখানে মুখ্য নয়, মুখ্য হলো সমাধানের পথটা কতটা মৌলিক ও সুন্দর। এটাই এই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য। গণিত শেখো, স্বপ্ন দেখো–এই স্লোগানটি যেন আমরা সবার হৃদয়ে লিখে ফেলি। কারণ এখান থেকেই তৈরি হবে আগামীর বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, উদ্ভাবক। তারা একদিন আমাদের দেশকে বদলে দেবে। তাহলেই একদিন সত্যি হবে বাংলার মেধার বিশ্বজয়ের স্বপ্ন।

লেখক : অধ্যাপক, গণিত বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রযুক্তি ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়;

সদস্য, বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবই আলোকিত মানুষ গড়ার অনুপ্রেরণা ও মূল ভিত্তি
পরবর্তী নিবন্ধ২০২৪-উত্তর গণপ্রত্যাশা ও নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ