কোন দিকে যাচ্ছে ইরান ও আমেরিকা-ইসরায়েলের সংঘাত

ডা. মোহাম্মদ ওমর ফারুক | সোমবার , ৪ মে, ২০২৬ at ১০:২৭ পূর্বাহ্ণ

বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। ইরানের উপর বিশ্ব সন্ত্রাসী আমেরিকা ও জায়নবাদী ইসরায়েলের বর্বর হামলার পর বৈশ্বিক রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারী ইরানের উপর আমেরিকা ও ইসরায়েলের একতরফা যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনীসহ ৪০ জনের কাছাকাছি সামরিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার শাহাদাতের মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে আগ্নেয়গিরীর মতন লাভার বিষ্ফোরণ ঘটছে। ক্ষ্যাপাটে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে মধ্যপ্রাচ্যের কসাই হিসাবে পরিচিত বর্বর ইহুদিদের নেতা, খুনি হিটলার খ্যাত নেতানিয়াহু যুদ্ধের মধ্যে ঠেলে দেওয়ার মাধ্যমে আবারও অশান্ত পরিবেশ উৎরে দিল মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা বিশ্বে। দীর্ঘ ৩৯ দিন রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে উভয়পক্ষ পাকিস্তানের মধ্যস্থতায়। পাকিস্তানের এটা একটি কূটনৈতিক বিজয় বলা যায়। ইরানের রণকৌশলের কাছে চরমভাবে পরাজিত বর্বর আমেরিকা ও ইসরায়েল। আমেরিকা ও ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ইরানের শাসকগোষ্ঠী পরিবর্তন। কিন্তু তাদের সেই স্বপ্ন স্বপ্নই যেন থেকে গেল। বর্বর ইহুদী নেতা মনে করেছিলঅল্প কয়েকটি বোমা ফেললে হয়তো বা ইরানের সামরিক ক্ষমতা ধ্বংস হয়ে যাবে এবং ইরানের জনগণ শাসক গোষ্ঠী পরিবর্তনের দাবিতে রাজপথ উত্থাল করে তুলবে কিন্তু বিধিবাম তাদের সেই আশা গুড়েবালি। বর্বর হায়েনারা মনে করেছিল ইরানের মত পারমাণবিক শক্তিহীন রাষ্ট্রকে সহজেই টমাহক বিমানের ঝাঁঝরা গুলিতে স্তম্ভিত করে দিবে। উল্টোদিকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আইআরজিসির কঠোর প্রতিরোধে কুকুরের মত লেজ গুটিয়ে পালালো দুই কুখ্যাত স্বৈরশাসক ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ২০২৫ সালের জুন মাসের ১২ দিনের যুদ্ধে পরাজয়ের চরম অপমান যেন এবারের যুদ্ধে স্বাদ নিল ট্রাম্প। পথ খুঁজছিল পালানোর। তড়িঘড়ি করে যুদ্ধবিরতির জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছিল আর সেই সুযোগটি লুফে নিল পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিফ মুনির ও প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে উভয়পক্ষের প্রথম দফার বৈঠকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অযাচিত চাহিদার কারণে কোন সমাধান ছাড়াই শেষ হল। এদিকে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বর্তমানে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে প্রচন্ড স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। ইরানের নৌ বন্দরগুলোতে আমেরিকার অবরোধের কারণে তেহরান বিগড়ে গেল। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের তেলবাহী ট্যাঙ্কার জব্দের কারণে উভয়পক্ষের মধ্যে আবারও সামরিক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। ইরান কখনো হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ হারাতে চায় নাএটা আমেরিকা ও ইসরায়েল জানে। আর সেজন্যেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফাঁকাবুলি এখন বৈশ্বিক হাস্যরসে পরিণত হয়েছে। ইরানে রক্ষিত সাড়ে চারশত কেজির মতন ইউরেনিয়াম চুরি করার কৌশল নিয়ে এগুচ্ছিল মার্কিন গোয়েন্দা বাহিনী। কিন্তু তাদের সেই ফন্দি বুঝতে পেরে তেহরান আরও তেলেবেগুনে যেন জ্বলে উঠল। ডোনাল্ড ট্রাম্প এক রাতের মধ্যেই হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতা ধ্বংস করার যে হুমকি দিয়েছেতা শুধুমাত্র মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষের পক্ষেই এধরনের বুলি আওড়ানো সম্ভব। বর্তমানে একতরফা যুদ্ধ বিরতির ঘোষণা দিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ২২ এপ্রিল। আবারও কূটনৈতিক মধ্যমণি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে পাকিস্তান। ইরানের নৌকমান্ড বাহিনীর ফিল্মি স্টাইলে দুটি ভারতীয় তেল ট্যাঙ্কার আটকের খবরে আবারও দেখা দিয়েছে বৈশ্বিক উত্তেজনা। ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার হুমকি দিয়ে ইরানের অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে কিন্তু হাজার বছরের সভ্যতার ধ্বজাধারী ইরানের জনগণ আমেরিকার রক্তচক্ষুকে ভয় পায় না। যেদিন ক্ষ্যাপাটে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা দিলএকটি প্রাচীন সভ্যতার দেশ নিমিষেই পৃথিবীর মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে অর্থাৎ প্রচ্ছন্নভাবে পারমাণবিক বোমা দিয়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর দিকেই ইঙ্গিত দিল ট্রাম্প। আর সেই রাতেই লাখ লাখ ইরানী রাজপথে নেমে এসে শাহাদাতের তামান্না পেশ করল। ঐদিন ট্রাম্পের গালে চপেটঘাত করে ইরানীরা বিশ্বকে জানিয়ে দিলইরানের জনগণ পরাভব মানে না। তারা এগিয়ে যায় দুর্বার গতিতে। ইরানের ভিন্নধর্মী রণকৌশল সারাবিশ্বের বাঘা বাঘা সামরিক বিশেষজ্ঞদের মাথায় চিন্তার ভাঁজ এঁকে দিল। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর দুটি এফ৩৫ বিমান গুলি করে ভূপাতিত করার মাধ্যমে ইরানের মিসাইল ক্ষমতাকে আরও একধাপ এগিয়ে দিল। হাজার ডলারের শাহেদ ড্রোন দিয়ে মিলিয়ন ডলারের বিমান ভূপাতিত করাএ যেন বিশ্বের অত্যন্ত শক্তিধর রাষ্ট্র আমেরিকার লজ্জাজনক হার ছাড়া আর কিছুই নয়। সর্বশেষ ২৮০০ কোটি টাকার ড্রোন আকাশেই উড়িয়ে দিল ইরানের সামরিক বাহিনী আর এতেই চোখ ছানাবড়া ট্রাম্পের। বিশ্বের যে কয়টি দেশে পারমাণবিক বোমা রয়েছে তাদের ব্যাপারে কোন মাথাব্যথা নেই ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর। অথচ ইরান কেন পারমাণবিক শক্তির দিকে এগিয়ে যাবেতারা সেটা সহ্য করতে পারছে না। অথচ তেহরান বারবার বলে আসছে তাদের এই পারমাণবিক প্রচেষ্টা শুধু গবেষণার জন্য। বিশ্ব পরমাণু সংস্থা ইরানে তল্লাশি চালিয়ে পারমাণবিক ক্ষেত্রে সামরিক প্রচেষ্টার কোন লক্ষণ পায়নি। আর সেটাকে বারবার সন্দেহের চোখে দেখছে কুখ্যাত শাসক ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু। কোনভাবে যদি ইরান পারমাণবিক শক্তিধর হয়ে যায়। ইরানের সামরিক সক্ষমতার আরেকটি উদাহরণ হল: মধ্যপ্রাচ্যে থাকা আমেরিকার সামরিক ঘাঁটিগুলোর উপর দুর্ধর্ষ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। এতে অধিকাংশ মার্কিন ঘাঁটিগুলো ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। ইসরায়েলের তেলআবিব ও অন্যান্য শহরে ইরানের মিসাইলের আঘাতে জর্জরিত হয়েছেতা যেন গাজার অবস্থাকেই দেখিয়ে দেয়। ৫৭ টি মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানরা শুধুমাত্র নিন্দা ও প্রতিবাদ দিয়েই যেন তাদের দায়িত্ব শেষ করে। আর মুনাফেক আরব শাসকরা ইরানী জনগণের এই দূরাবস্থা দেখেও না দেখার ভান করে আর এজন্যেই তেহরান ক্ষেপেছে আরব শাসকদের উপর। যুগের পর যুগ সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করতে দিয়েছে এই অসভ্য আরব দেশগুলো। বিশ্ব মুসলিম চুপচাপ, অথচ অমুসলিম রাষ্ট্র চীন ও রাশিয়া গোয়েন্দা প্রযুক্তি দিয়ে ইরানকে সহায়তা করছে। আর এতে কুপোকাত হচ্ছে মার্কিনইসরায়েলি বাহিনী। আমেরিকার যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথ এর এক মন্তব্যে তোলপাড় হয়েছে মুসলিম বিশ্ব। আর সেটি হল সুন্নি বা শিয়া নয়, ইসলামই তাদের শত্রু।

তার এই বক্তব্য এক ভয়ানক বিপজ্জনক অবস্থায় নিয়ে গেছে ইরান যুদ্ধকে। আর এই কথা দিবালোকের মতো সত্য যে, ইরান কখনো যেচে আক্রমণ করেনি। দুবারের আক্রমণ ছিল আমেরিকা ও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে। ইরানের আত্নরক্ষার অধিকার আছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনীর জীবন উৎসর্গ এবং কয়েক ডজন পরমাণু বিজ্ঞানী, মন্ত্রী, উপমন্ত্রী পর্যায়ের সদস্যবৃন্দ, লারিজানির মতন দুঃসাহসিক নিরাপত্তা উপদেষ্টা সহ হাজার হাজার ইরানী নিহত হওয়াকে তেহরান কখনো মেনে নিতে পারেনা। ইরানের জনগণের এ আত্মত্যাগ বিশ্বের কাছে এক রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। দুটি যুদ্ধের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে ইরানের সবচেয়ে বেশি। তারা হারিয়েছে বাঘা বাঘা বিজ্ঞানী, মন্ত্রী, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, সামরিক উপদেষ্টা এবং কয়েক হাজার ইরানী নাগরিক। আমেরিকাইসরায়েলের বর্বরতার আরেকটি নিকৃষ্ট উদাহরণ: তেহরানের একটি স্কুলে বোমার আঘাতে ছিন্নভিন্ন শতাধিক ক্ষুদে শিশু শিক্ষার্থীর দেহ। দুটি যুদ্ধে ইসরায়েলের ক্ষতি হয়েছে ইরান থেকে অনেক কম। ১২ দিনের যুদ্ধে মাত্র ২৯ জন ইহুদী নিহত হয়েছে। আর এবারের যুদ্ধে ২৯ জন ইহুদীও নিহত হয়নি। কারণ মিসাইলের আওয়াজ শুনলেই ইসরায়েলের আকাশে সাইরেন বেজে উঠে আর এতেই ইহুদীরা তড়িঘড়ি করে বাঙ্কারে ঢুকে যায়এতে তারা খুব সহজেই আত্মরক্ষা করতে পারে। কিন্তু ইরানি জনগণের সেই সুযোগটি নেই, তাদের কোন বাঙ্কার নেই। আর ইরানী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইসরায়েল থেকে অনেক দুর্বল। বর্তমান বৈশ্বিক টানটান উত্তেজনার মধ্যে পাকিস্তান চালিয়ে যাচ্ছে কুটনৈতিক প্রচেষ্টা। তবে এর মাঝে ক্ষ্যাপাটে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিপজ্জনক কোন সিদ্ধান্ত নিতে হয়তো বা দ্বিধা করবে না। তখন আবারও চরম অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হবে বিশ্ব। তেলের বাজারে আবার জ্বলবে আগুন। আর এই পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাবে বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো।

লেখক: সভাপতি, রাউজান ক্লাব, সহযোগী অধ্যাপক (ইএনটি), সংযুক্তি: জেনারেল হাসপাতাল, রাঙ্গামাটি

পূর্ববর্তী নিবন্ধশিক্ষা নিয়ে সামপ্রতিক ভাবনা
পরবর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকা জরুরি