চট্টগ্রাম নগর ও পার্শ্ববর্তী এলাকার প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপ্রবাহ কৃষ্ণ খাল এখন কার্যত একটি চলমান ডাস্টবিনে পরিণত হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে শিল্পকারখানা, বাজার, গরুর খামার, আবাসিক ভবন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য, পলিথিন এবং প্লাস্টিক ফেলে খালটির স্বাভাবিক প্রবাহ প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতে পশ্চিম কুয়াইশ, দক্ষিণ কুয়াইশ, পশ্চিম মোহরা, উত্তর মোহরার একাংশ, বাইন্নাপাড়া, বুড়িরচর, লালাচন্দ্র বিলসহ বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জলাবদ্ধতা নিরসনে গৃহীত প্রকল্পে খালটিকে অন্তর্ভুক্ত করা হলে পরিস্থিতি এত নাজুক হতো না। খালটি পুনরুদ্ধার এবং খনন না হওয়ায় প্রতি বর্ষায় হাজার হাজার মানুষকে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, পশ্চিম কুয়াইশের বেল্লা বাপের বাড়ি এলাকা থেকে কৃষ্ণ খাল বুড়িরচর হয়ে হালদা নদীতে গিয়ে মিলেছে। এই খাল দিয়ে পশ্চিম কুয়াইশের লালাচন্দ্র বিল, শিকারপুর ইউনিয়নের একাংশ, এভারকেয়ার হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকা, দক্ষিণ কুয়াইশ, বাইন্নাপাড়া, বুড়িরচর, পশ্চিম মোহরা ও উত্তর মোহরার একাংশসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে হালদা নদীতে নিষ্কাশিত হওয়ার কথা। কিন্তু খালের বিভিন্ন অংশ দখল, পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া এবং অবাধে কঠিন বর্জ্য ফেলার কারণে সেই সক্ষমতা প্রায় হারিয়ে গেছে। সবচেয়ে সংকটপূর্ণ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে পশ্চিম মোহরার গোলাপের দোকান সংলগ্ন ব্রিজের নিচে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন সেবা সংস্থার একাধিক পাইপলাইন সেতুর নিচ দিয়ে নেওয়ায় সেখানে ভেসে আসা বর্জ্য আটকে গিয়ে স্থায়ী বাঁধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এতে উজান থেকে নেমে আসা বৃষ্টির পানি দ্রুত হালদা নদীতে প্রবাহিত হতে পারে না। একটু ভারী বৃষ্টি হলেই আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে। জলাবদ্ধতার কারণে প্রতি বছর হাজারো বসতবাড়ি, দোকানপাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ব্যাহত হচ্ছে যান চলাচল ও স্বাভাবিক জনজীবন।
স্থানীয়রা জানান, খালটি নিয়মিত খনন ও পরিষ্কার করা হলে এবং বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা গেলে এ অঞ্চলের জলাবদ্ধতার বড় অংশই কমে আসবে।
এলাকাবাসীর দাবির পর সম্প্রতি সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহর উদ্যোগে গোলাপের দোকান সংলগ্ন সেতুর নিচে জমে থাকা বর্জ্য অপসারণের কাজ শুরু হয়েছে। তবে স্থানীয়দের মতে, এটি সাময়িক উদ্যোগ। স্থায়ী সমাধানের জন্য পুরো কৃষ্ণ খালের পুনঃখনন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং খালে বর্জ্য নিক্ষেপকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। স্থানীয়রা বলেন, চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে গৃহীত চলমান প্রকল্পের আওতায় সীমিত পরিসরে হলেও এই খালটির ব্যাপারে কিছু পদক্ষেপ নিলে এলাকার হাজার হাজার মানুষ উপকৃত হতো।
চট্টগ্রাম ডেভেলপমেন্ট ফোরাম বলেছে, কৃষ্ণ খাল ও কুয়াইশ খাল চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ। তাই শুধু আংশিক পরিষ্কার বা সংস্কার নয়, চলমান জলাবদ্ধতা নিরসনের মেগা প্রকল্পের আওতায় এনে খাল দুটির পূর্ণাঙ্গ পুনরুদ্ধার ও উন্নয়নকাজ জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করতে হবে। এ দুটি খালকে পরিকল্পিতভাবে পুনরুদ্ধার ছাড়া চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
ফোরামের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ খোরশেদ আলম সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং সরকারের নীতিনির্ধারকদের প্রতি কৃষ্ণ খাল ও কুয়াইশ খালকে জলাবদ্ধতা নিরসনের চলমান মেগা প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করে দ্রুত উন্নয়নকাজ শুরুর আহ্বান জানিয়েছেন।












