কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে ফিজিওথেরাপি

আইনুর নিশাত রাজীব | সোমবার , ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ১০:৩৭ পূর্বাহ্ণ

আগামীকাল ৮ই সেপ্টেম্বর বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস। বিশ্বের ১২৯টি দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও যথাযোগ্য মর্যাদা ও উৎসাহউদ্দীপনার মধ্য দিয়ে এ দিবসটি পালিত হয়। বিশ্ব ফিজিওথেরাপি সংস্থা অনুযায়ী এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো – ‘কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ এবং স্ট্রোক প্রতিরোধ, ব্যবস্থাপনা এবং পুনর্বাসনে ফিজিওথেরাপি ভূমিকা’এ বছর হৃদরোগ ও স্ট্রোকসহ অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা এবং নিয়মিত এক্সারসাইজ গুরুত্বকে সামনে রেখে এবারের দিবসটি পালিত হচ্ছে। বর্তমান বিশ্বে মানুষের স্বাস্থ্য ও সুস্থতার জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো অসংক্রামক রোগ বা Non-communicable Diseases (NCDs) ও অসংক্রামক রোগ হলো এমন দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যা একজন ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির মধ্যে সংক্রমিত হয় না। বিশ্বব্যাপী অসংক্রামক রোগের মধ্যে হৃদরোগ ও স্ট্রোক, ক্যান্সার, দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগ এবং ডায়াবেটিস সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এর মধ্যে হৃদরোগ ও রক্তনালিজনিত রোগ বা কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর প্রধান কারণ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী প্রায় ২০.৫ মিলিয়ন মানুষ হৃদরোগ ও রক্তনালিজনিত রোগে মারা যায়। বিশ্বে মোট মৃত্যুর প্রায় ৩০% কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজের কারণে ঘটে। এর মধ্যে প্রায় ৮৫% মৃত্যু হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের কারণে হয়। বিশ্বব্যাপী অসংক্রামক রোগজনিত মোট মৃত্যুর ৭৩ শতাংশ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ঘটে। অসংক্রামক রোগ বর্তমানে শুধু একটি স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়; বরং এটি ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ কী : কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ হলো এমন সব রোগের সাধারণ নাম, যা হৃদপিণ্ড ও রক্তনালীকে প্রভাবিত করে। এসব রোগের কারণে শরীরের বিভিন্ন অংশে রক্ত, অক্সিজেন ও পুষ্টি উপাদান স্বাভাবিকভাবে পৌঁছাতে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রক্তনালী সরু, শক্ত বা ব্লক হয়ে যেতে পারে এবং হৃদপিণ্ডকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। এর ফলে মস্তিষ্ক, হৃদপিণ্ড ও পেশির মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে রক্তপ্রবাহ কমে যেতে পারে এবং হার্ট অ্যাটাক বা হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।

কার্ডিয়াক রিহ্যাবিলিটেশন : হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর শুধু ওষুধ বা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে চিকিৎসা শেষ হয় না; রোগীকে নিরাপদে স্বাভাবিক ও সক্রিয় জীবনে ফিরিয়ে আনাও চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই লক্ষ্যেই কার্ডিয়াক রিহ্যাবিলিটেশন একটি সমন্বিত ও পরিকল্পিত পুনর্বাসন কর্মসূচি। হার্ট অ্যাটাক, হৃদযন্ত্রের বিভিন্ন রোগ, অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি বা বাইপাস সার্জারির পর রোগীর শারীরিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার, ভবিষ্যতে হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে কার্ডিয়াক রিহ্যাবিলিটেশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কার্ডিয়াক রিহ্যাবিলিটেশন টিমে ফিজিওথেরাপিস্ট রোগীর শারীরিক সক্ষমতা ও হৃদরোগের অবস্থা মূল্যায়ন করে ব্যক্তিভেদে নিরাপদ ও উপযোগী থেরাপিউটিক এক্সারসাইজ পরিকল্পনা তৈরি করেন। কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজের ঝুঁকি কেনো বাড়ছে বিশ্বব্যাপী উচ্চ রক্তচাপ কার্ডিওভাসকুলার রোগের অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ। নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রমের অভাব, দীর্ঘ সময় বসে বা শুয়ে থাকা, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত লবণ ও চিনি গ্রহণ, অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়া, ধূমপান, তামাকের ধোঁয়ার সংস্পর্শে আসা, ক্ষতিকর মাত্রায় অ্যালকোহল গ্রহণ এবং বায়ুদূষণএসবই অসংক্রামক রোগের প্রধান ঝুঁকির কারণ। এই ঝুঁকিগুলোর ফলে মানুষের উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধি, উচ্চ কোলেস্টেরল, অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। পরবর্তীতে এসব অবস্থা হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন গুরুতর অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।

কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ প্রতিরোধে ফিজিওথেরাপিস্টের ভূমিকা : হৃদরোগ প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনায় একজন ফিজিওথেরাপিস্টের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফিজিওথেরাপিস্ট শুধু রোগ বা আঘাতের পর চিকিৎসা ও পুনর্বাসন করেন না; বরং শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। একজন ফিজিওথেরাপিস্ট ব্যক্তির বয়স, শারীরিক সক্ষমতা, রোগের অবস্থা এবং ব্যক্তিগত চাহিদা বিবেচনা করে নিরাপদ ও উপযোগী শারীরিক কার্যক্রম এবং থেরাপিউটিক এক্সারসাইজ পরিকল্পনা করেন। যারা দীর্ঘদিন শারীরিকভাবে নিষ্‌ক্িরয়, অতিরিক্ত ওজনের সমস্যায় ভুগছেন অথবা দীর্ঘমেয়াদি রোগের কারণে স্বাভাবিক কার্যক্রমে অংশ নিতে পারছেন না, তাদের ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

সঠিকভাবে পরিকল্পিত ও নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম মানুষের শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, শক্তি উন্নয়ন এবং ভালো ঘুমে সহায়তা করতে পারে। এটি ওজন নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে এবং হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসের কার্যক্ষমতা উন্নত করতে পারে। নিয়মিত থেরাপিউটিক এক্সারসাইজ উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের ঝুঁকি কমাতে ও সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

হৃদপিণ্ড সুস্থ রাখতে কার্যকরী থেরাপিউটিক এক্সারসাইজ :

. অ্যারোবিক এক্সারসাইজ : হাঁটা, সাইক্লিং, সাঁতার বা অন্যান্য উপযুক্ত অ্যারোবিক এক্সারসাইজ হৃদপিণ্ডকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। নিয়মিত অ্যারোবিক এক্সারসাইজ দৈনন্দিন কাজকর্ম সহজ করে, শারীরিক সহনশীলতা বৃদ্ধি করে এবং ক্লান্তি ও শ্বাসকষ্টের অনুভূতি কমাতে সাহায্য করে।

. রেজিস্ট্যান্স বা শক্তিবর্ধক এক্সারসাইজ : রেজিস্ট্যান্স ট্রেনিং শরীরের পেশিশক্তি বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। একজন ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী উপযুক্ত রেজিস্ট্যান্স এক্সারসাইজ হৃদস্বাস্থ্য রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

. ভারসাম্য ও নমনীয়তা বৃদ্ধির এক্সারসাইজ : ভারসাম্য ও নমনীয়তার এক্সারসাইজ নিরাপদ ও স্বাভাবিক চলাফেরায় সাহায্য করে। নিয়মিত স্ট্রেচিং পেশির শক্তভাব ও টান কমিয়ে শরীরকে আরও নমনীয় রাখতে সাহায্য করে এবং ব্যথা ও আঘাতের ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে, ভারসাম্য বৃদ্ধির এক্সারসাইজ শরীরের স্থিতিশীলতা বাড়ায় এবং বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তিদের পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।

বয়সভেদে শারীরিক কার্যক্রমের নির্দেশনা : শারীরিকভাবে সুস্থ থাকতে দীর্ঘ সময় বসে থাকা কমিয়ে নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ করা প্রয়োজন। প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে ১৫০৩০০ মিনিট অ্যারোবিক কার্যকলাপের পাশাপাশি সপ্তাহে অন্তত ২ দিন পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম করা উচিত। শিশু ও কিশোরকিশোরীদের প্রতিদিন অন্তত ৬০ মিনিট শারীরিক কার্যকলাপে অংশগ্রহণ করা প্রয়োজন। অন্যদিকে, বয়স্কদের সপ্তাহে অন্তত ৩ দিন ভারসাম্য ও পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম করা উচিত। যারা সক্ষম, তারা সপ্তাহে ৩০০ মিনিটের বেশি শারীরিক কার্যকলাপ করলে আরও বেশি স্বাস্থ্যগত উপকার পেতে পারেন। “Start early, Stay active, Keep moving for life. শৈশব থেকে শুরু করে বার্ধক্য পর্যন্ত নিয়মিত ব্যায়াম ও শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।

লেখক: জুনিয়র কনসালট্যান্ট ও ইনচার্জ, ফিজিওথেরাপি বিভাগ, সিআরপি চট্টগ্রাম.কে. খান কেন্দ্র।

পূর্ববর্তী নিবন্ধযেখানে স্থাপত্যশৈলীর সাথে প্রকৃতির কোনো বিরোধ নেই
পরবর্তী নিবন্ধগণমাধ্যমের স্বাধীনতা শুধু পেশার অধিকার নয়, এটি জাতির মানসিক স্বাধীনতার ভিত্তি