প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কর্ণফুলী টানেল প্রতিদিন গড়ে ১১ লাখ টাকার বেশি লোকসান দিচ্ছে। চালু হওয়ার পর তিন বছর হতে চললেও সমীক্ষার হিসাব অনুযায়ী যানবাহন চলাচল বাড়ছে না। টানেলটি সচল রাখতে প্রতিদিন বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও টোল থেকে মিলছে অর্ধেকের কাছাকাছি। বাকি টাকা লোকসান দিয়ে টানেলটি চালু রাখতে হচ্ছে।
সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, মাসে গড়ে ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা টোল আদায়ের বিপরীতে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হচ্ছে ৬ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এতে মাসে ঘাটতি থাকছে ৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১১ লাখ ১৭ হাজার টাকা। টানেলটির ব্যবহার বাড়াতে প্রায় ৩৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে আনোয়ারা থেকে চন্দনাইশের গাছবাড়িয়া পর্যন্ত ১৭ কিলোমিটার সড়ক প্রশস্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কর্ণফুলীর তলদেশে নির্মিত দেশের প্রথম টানেল ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবর যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এই টানেল নগরীর সঙ্গে আনোয়ারা ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের যোগাযোগে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে। পরিকল্পনা ছিল, টানেলকে ঘিরে শিল্পায়ন, বাণিজ্য, পর্যটন ও আঞ্চলিক যোগাযোগের বিস্তার ঘটবে। কিন্তু বাস্তবে যানবাহন চলাচল প্রত্যাশিত পর্যায়ে না পৌঁছায় এখন টানেলটি গলার কাঁটা হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে পণ্যবাহী ভারী যানবাহন টানেল ব্যবহার না করায় টানেলটির সক্ষমতা অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। তাছাড়া দক্ষিণ চট্টগ্রামে প্রত্যাশিত শিল্পায়নও ঘটেনি।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, টানেল দিয়ে কক্সবাজারের দিকে যাওয়া যানবাহনকে বর্তমানে আনোয়ারা থেকে পটিয়া ক্রসিং হয়ে মহাসড়কে উঠতে হয়। অথবা পেকুয়া হয়ে বিকল্প পথে যেতে হয়। এত পথ ঘুরে যেতে হয় বলে অনেক চালক টানেল ব্যবহার করতে চান না। এই সমস্যা সমাধানে আনোয়ারার কালা বিবির দিঘি থেকে চন্দনাইশের গাছবাড়িয়া কলেজ গেট পর্যন্ত সড়ক প্রশস্ত করে চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রকল্প অনুমোদনসহ আনুষঙ্গিক কার্যক্রমও সম্পন্ন হয়েছে। রাস্তাটি প্রশস্ত করা হলে কক্সবাজার যেতে প্রায় ৩০ মিনিট সময় কমবে।
প্রকল্পটির আওতায় কালা বিবির দিঘি থেকে বরকল সেতু পর্যন্ত সড়ক উন্নয়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮২ কোটি টাকা। বরকল সেতু থেকে গাছবাড়িয়া কলেজ গেট পর্যন্ত অংশে ব্যয় হবে ১৪৪ কোটি টাকা। দ্বিতীয় অংশের প্রায় ১০ দশমিক ২ কিলোমিটার সড়ক বর্তমানে ১৮ ফুট প্রশস্ত। এটি বাড়িয়ে ৩৪ ফুট করা হবে। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক সোজা করা, বাজার এলাকায় আরসিসি সড়ক ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা নির্মাণ এবং নয়টি সেতু ও কালভার্ট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। জমি অধিগ্রহণেরও প্রয়োজন হবে। ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দেওয়ার পর দুই বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলেও সূত্র জানিয়েছে।
সওজ সূত্র জানায়, আনোয়ারা থেকে গাছবাড়িয়া পর্যন্ত সরাসরি সড়ক যোগাযোগ তৈরি হলে টানেল দিয়ে যানবাহন চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। বর্তমান সড়ক যোগাযোগের সীমাবদ্ধতার কারণে টানেল ব্যবহার করে কঙবাজারে যাওয়া অনেক যানবাহনকে ঘুরপথে চলতে হচ্ছে।
টানেলের ব্যয় সাশ্রয়ের উদ্যোগও ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে। বেশ কিছু খাতের ব্যয় কমিয়ে আনা হয়েছে। ব্যয় সাশ্রয়ের উদ্যোগে দৈনিক পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় আগে প্রায় ৩৭ লাখ টাকা থাকলেও তা কমিয়ে ২২ থেকে ২৩ লাখ টাকায় আনা হয়েছে। তবু টোলের আয় দিয়ে ব্যয় মেটানো যাচ্ছে না। কর্ণফুলী টানেল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে বিদ্যুৎ, আলো, বায়ু চলাচল, অগ্নিনিরাপত্তা, নজরদারি ক্যামেরা এবং যানবাহন ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতের ব্যয় কমিয়ে আনা সম্ভব নয়। এসব ব্যবস্থা সার্বক্ষণিক সচল রাখতে হয়। যানবাহন কম থাকলেও পরিচালন ব্যয় চলতে থাকে। ফলে যানবাহনের চলাচল বাড়লে টোল থেকে আয় বৃদ্ধি পেলে খরচের সাথে ঘাটতি কমে আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।
সূত্র বলেছে, টানেল প্রকল্পের বাস্তবায়নকালে ব্যয় ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরকারের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) মূল্যায়ন প্রতিবেদনে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পটিতে ১ হাজার ৬১৬ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। ক্রয়প্রক্রিয়া, ব্যয় ব্যবস্থাপনা, মূল্য সমন্বয় এবং নিরীক্ষা আপত্তি নিষ্পত্তি না হওয়ার মতো বিষয়ও চিহ্নিত হয়েছে। মোট ৬৮টি নিরীক্ষা আপত্তির মধ্যে ৪৮টিকে গুরুতর আর্থিক অনিয়ম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, টানেলটিকে পুরোপুরি কার্যকর করতে শিল্পকারখানা, অর্থনৈতিক অঞ্চল, বন্দর ও পণ্য পরিবহনের কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে গতিশীল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। আনোয়ারাসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামে শিল্পায়ন বাড়লে টানেলের ব্যবহার বাড়বে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করে সূত্র বলেছে, বিশেষ করে আনোয়ারায় নির্মাণাধীন চায়না ইকোনমিক জোনসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু হলে টানেলের ব্যবহার প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাবে।











