করোনার নতুন ধরনে আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সতর্কতার

চমেক হাসপাতালসহ বিভাগীয় হাসপাতালগুলোতে প্রস্তুতি

| সোমবার , ১৬ জুন, ২০২৫ at ৮:০৮ পূর্বাহ্ণ

দেড় বছর পর আবার করোনা। সম্প্রতি তিনজনের মৃত্যুতে বাংলাদেশের মানুষের মাঝে উদ্বেগ কিছুটা বেড়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংক্রমণ বৃদ্ধি পেলেও এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সবাইকে শুধু একটু সচেতন থাকতে হবে। গত ৫ জুন রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে প্রবীণ এক ব্যক্তি, ১৩ জুন রাজধানী ঢাকায় একজন এবং চট্টগ্রামে একজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এই তিনজনের মৃত্যুর পর নড়েচড়ে বসেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। জারি করা হয়েছে ১১টি নির্দেশনা।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার নতুন দুটো সাব–ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। সতর্ক থাকতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি না মানলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এক্ষেত্রে যারা বয়স্ক, শারীরিকভাবে দুর্বল কিংবা আগে থেকে জটিল রোগে আক্রান্ত তাদের স্বাস্থ্যবিধি মানাটা জরুরি। কেননা তাদের জন্য এই ভ্যারিয়েন্ট মারাত্মক হতে পারে। খবর বাসসের।

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) তথ্যমতে, চলতি বছর সংক্রমণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো করোনার নতুন দুটো সাব–ভ্যারিয়েন্ট এঙএফজি এবং এঙএফসি। যেগুলো ওমিক্রন জেএন. ১–এর একটি উপ–শাখা। সম্প্রতি যেসব নমুনা পাওয়া গেছে, তার প্রায় সবগুলোতে এঙএফজি ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হয়েছে। এই ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ ক্ষমতা বেশি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবু জাফর বলেন, এখন পর্যন্ত দুটি সাব–ভ্যারিয়েন্ট দ্বারা করোনা সংক্রমণের যে হার, তাতে উদ্বেগের কিছু নেই। অনেক দিন ধরে কোভিডের কোনো রোগী ছিল না। ফলে আমাদের হাসপাতালগুলোতে তেমন কোনো প্রস্তুতি রাখা হয়নি। এখন যেহেতু অল্প পরিমাণে সংক্রমিত রোগী পাওয়া যাচ্ছে, ফলে আমরা ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ও কুর্মিটোলা হাসপাতালকে প্রস্তুত করেছি। আপাতত ৫০ শয্যার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বেশি শয্যা প্রস্তুত করে কী করব? হাসপাতালে তেমন রোগীর চাপ নেই।

তিনি বলেন, করোনার সংক্রমণ বাড়ায় নতুন করে পরীক্ষা শুরু করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে সব রোগীকে করোনা পরীক্ষার প্রয়োজন নেই। শুধুমাত্র যাদের জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট বা অন্যান্য উপসর্গ রয়েছে এবং যারা জটিল অবস্থায় রয়েছে, তারাই করোনা পরীক্ষা করাবেন। ভ্যাকসিন প্রদান কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, যাদের কখনোই ভ্যাকসিন দেওয়া হয়নি তাদের অবশ্যই ভ্যাকসিন নিতে হবে। বিশেষ করে ১৮ বছরের উপরে যারা, বিভিন্ন ব্যক্তিদের সঙ্গে কাজ করেন, অন্তঃসত্ত্বা নারী তাদের ভ্যাকসিন দিতে হবে। আর পুরাতনদের মধ্যে ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের ভ্যাকসিন দেওয়া জরুরি।

তিনি বলেন, আশপাশের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে সংক্রমণের হার কম। যেহেতু পাশের দেশগুলোয় কোভিড–১৯ এর প্রাদুর্ভাব বেড়েছে, তাই সরকারের দায়িত্ব হিসেবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে। ভয় পাওয়ার কিছু নেই।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও আইসিডিডিআরবির উপদেষ্টা ডা. মুশতাক আহমেদ বলেন, শুধু বাংলাদেশ নয়, থাইল্যান্ড, চীন ও ভারতেও করোনার কিছু নতুন ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হয়েছে। যেগুলো দ্রুত সংক্রমিত করতে পারে। তবে বর্তমানে দেখা দেওয়া উপধরনগুলো আগের মতো প্রাণঘাতী নয়। সাধারণ জ্বর, সর্দি বা মৌসুমি ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের মতো। রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি হতে হচ্ছে না। তাই ভাইরাস বহনকারী ব্যক্তিরা এখন আর পরীক্ষা করছেন না। কিন্তু এখন থেকেই স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনে গুরুত্ব না দিলে এটি আরও বাড়তে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. হালিমুর রশীদ জানান, প্রাথমিকভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট ও ময়মনসিংহসহ বিভাগীয় শহরের হাসপাতালগুলোতে করোনা পরীক্ষা চালু হয়েছে। যেসব হাসপাতালে আরটি–পিসিআর ল্যাব রয়েছে, শুধু সেখানেই শুরুতে এই সুবিধা মিলবে।

তিনি জানান, স্থানীয় কোম্পানিগুলো থেকে পরীক্ষার কিট সংগ্রহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিদেশ থেকেও কিট আমদানির জন্য সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোরস ডিপোকে (সিএমএসডি) নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যাদের উপসর্গ থাকবে তারাই পরীক্ষার সুযোগ পাবেন। সংক্রমণের হার যদি আরও বাড়ে, তাহলে পরীক্ষার পরিধিও বাড়ানো হবে।

জনগণকে মাস্ক পরা, হাত ধোয়া এবং উপসর্গ দেখা দিলে ঘরে থাকার আহ্বান জানিয়ে অধ্যাপক ডা. হালিমুর রশীদ বলেন, আমরা চাই না পরিস্থিতি আবার হাতের বাইরে চলে যাক। তাই সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

হাসপাতালগুলোতে আলাদা করে কোভিড শয্যা প্রস্তুত করা হয়েছে জানিয়ে অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার পরিচালক ডা. মো. মঈনুল আহসান বলেন, দেশের সব হাসপাতালে সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ভারতে করোনাভাইরাসের নতুন ধরনের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্তের স্থল ও নৌবন্দরগুলোর পাশাপাশি সবকটি বিমানবন্দরে স্ক্রিনিং বা স্বাস্থ্য পরীক্ষা জোরদার করা হয়েছে। ভারতসহ যেসব দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ বেড়েছে, ওইসব দেশে ভ্রমণের ব্যাপারে সতর্কবার্তা দিয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। প্রয়োজন ছাড়া ওইসব দেশে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া সংক্রমণ প্রতিরোধে জনসাধারণের করনীয়তে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তরফ থেকে দেওয়া হয়েছে ১১ নির্দেশনাও। এছাড়া প্রয়োজন হলে নিকটস্থ হাসপাতালে অথবা আইইডিসিআর (০১৪০১–১৯৬২৯৩) অথবা স্বাস্থ্য বাতায়ন (১৬২৬৩) নাম্বারে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। এ নম্বরে ফোন করে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত যেকোনো পরামর্শ পাওয়া যায়।

স্বাস্থ্য বাতায়নের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ডা. নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, করোনায় মৃত্যুর ঘটনার পর থেকেই আমরা এ সংক্রান্ত কল বেশি করে পাচ্ছি।

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) প্রোগ্রাম ম্যানেজার এ এফ এম শাহাবুদ্দিন খান বলেন, আমাদের হাতে এখন ৩২ লাখ ফাইজারের তৈরি করোনার টিকা আছে। এর মধ্যে গত দুই মাসে ১৭ লাখ ১৬ হাজার ৯০০ ডোজ ফাইজারের টিকা সব জেলায় পাঠানো হয়েছে, যার মেয়াদ শেষ হবে ৬ আগস্ট। এর বাইরে আছে আরও ১৫ লাখ টিকা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধআছেন জেলে, নিজেকে অসুস্থ দাবি করে ছুটির আবেদন
পরবর্তী নিবন্ধপ্রভোস্টের স্বাক্ষর জালিয়াতি করে টাকা উত্তোলন, চবির কর্মচারী বরখাস্ত