চলন্ত সিঁড়ি, উন্মুক্ত সবুজ চত্বর, চারতলা পর্যন্ত ওয়াকওয়ে, প্রশস্ত হাঁটার পথ মিলে ষাটের দশকের চমৎকার স্থাপনা চট্টগ্রাম নগরীর নিউ মার্কেট। আসল নাম বিপণি বিতান। নগরীর প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা চট্টগ্রামের ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সাথে জড়িয়ে থাকা নিউ মার্কেট দীর্ঘদিনের অযত্ন আর অবহেলায় যেন ক্ষয়িঞ্চু এক ঐতিহ্য। একসময় এটি ছিল চট্টগ্রামের আধুনিকতার প্রতীক। ষাটের দশকে এমন একটি বাণিজ্যিক স্থাপনা চট্টগ্রামের জন্য ছিল যুগান্তকারী ঘটনা। কিন্তু ছয় দশকের বেশি সময় পেরিয়ে সেই নিউ মার্কেট এখন নানা সংকটের ভারে জর্জরিত। অবকাঠামোগত রক্ষণাবেক্ষণ, পার্কিং, ব্যবস্থাপনা, আধুনিকায়ন ও আশপাশের পরিবেশ–সব মিলিয়ে ঐতিহ্যের বিপণি বিতান ক্রমে তার জৌলুস হারাতে বসেছে। কোথাও পলেস্তারা খসে পড়ছে, বেরিয়ে পড়েছে রড। একসময়কার আধুনিক স্থাপত্যে আজ নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে অনেকে শঙ্কিত।
জানা যায়, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ষাটের দশকে নিউ মার্কেট নির্মাণ করে। নিউ মার্কেটের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল ১৯৬১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজম খান এই মার্কেটের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। খ্যাতিমান স্থপতি ফিদা হোসেন প্রকাশ জি ইব্রাহিম প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার বর্গফুট আয়তনের এই বিপণিকেন্দ্রের নকশা করেন। ১৯৬৪ সালে ৪৮০টি দোকান নিয়ে শুরু হয় এর বাণিজ্যিক কার্যক্রম।
নিউ মার্কেট নির্মাণের সময় এর স্থাপত্য পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল মানুষের স্বাচ্ছন্দ্যকে। প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার ৮৯ বর্গফুট জায়গা রাখা হয়েছিল চলাচল, আলো–বাতাস ও খোলা পরিবেশের জন্য। ভবনের মাঝখানে ছিল সবুজ এলাকা ও নার্সারি। সবুজের পাশ দিয়ে ওয়াকওয়ে উঠে গিয়েছিল চতুর্থ তলা পর্যন্ত।
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলেছেন, ষাটের দশকে যে মার্কেটের নকশায় খোলা জায়গা, আলো–বাতাস ও মানুষের চলাচলকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে সেই পরিকল্পনার অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। চট্টগ্রামের প্রথম আধুনিক বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে নিউ মার্কেটের রয়েছে আলাদা ঐতিহাসিক গুরুত্ব। এক ছাদের নিচে পোশাক, প্রসাধনী, গৃহস্থালি সামগ্রী, ইলেকট্রনিক পণ্য, মনিহারি, খাবারসহ নানা ধরনের পণ্য পাওয়ার কারণে দ্রুত এটি নগরবাসীর প্রধান কেনাকাটার কেন্দ্রে পরিণত হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও ক্রেতারা আসতেন। বহু পুরনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিউ মার্কেটের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এর যাত্রার শুরু থেকে।
ব্যবসায়ীরা বলেছেন, সময় গড়ানোর সঙ্গে শহরের চেহারা পাল্টেছে।
নিউ মার্কেটের আশপাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বিপণি বিতান ও আধুনিক শপিং মল। নগরের বিভিন্ন প্রান্তে তৈরি হয়েছে নতুন নতুন কেনাকাটার কেন্দ্র। ফলে একসময় যে নিউ মার্কেট ছিল নগরবাসীর কেনাকাটার প্রধান গন্তব্য, এখন তার সেই অবস্থান নেই। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, আগে চট্টগ্রামসহ আশেপাশের বহু এলাকা থেকেও ক্রেতারা এখানে আসতেন। এখন জেলা–উপজেলায় অনেক মার্কেট হওয়ায় ক্রেতাদের একটি অংশ সেসব স্থানে কেনাকাটা করেন। নিউ মার্কেটের দিকে আর আসেন না।
নিউ মার্কেটে এখনো বহু মানুষ শপিং করেন। প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করেন। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যের স্মারক এই মার্কেটে কেনাকাটা এখনো আধুনিক। কিন্তু মার্কেটে বিকিকিনি বা ক্রেতা সাধারণের ব্যাপক উপস্থিতি থাকলেও মার্কেটটির অবকাঠামো নিয়ে অনেকে সংশয় প্রকাশ করেছেন।
নিউ মার্কেটের ভবনটির বয়স ৬০ বছর পেরিয়ে গেছে। ষাট বছরের বেশি সময় আগেকার প্রযুক্তিতে যে স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছিল তা উন্নত মানের রড, সিমেন্ট বা কংক্রিট ব্যবহার করার সুযোগ ছিল না। নিয়মিত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ছয় দশকের পুরনো বাণিজ্যিক ভবনের সৌন্দর্য বহুলাংশে নষ্ট হয়ে গেছে। দেখা দিয়েছে নিরাপত্তার বিষয়ও। ভবনটির পেছনের দিকে প্লাস্টার খসে পড়েছে। বিম থেকে বেরিয়ে এসেছে রড। কবে ভবনটি সংস্কার করা হয়েছে বা রং করা হয়েছে তাও ব্যবসায়ীদের কেউ স্মরণ করতে পারছেন না। ভবনের প্লাস্টার খসে পড়া এবং রড রেরিয়ে পড়ায় অনেকে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন, নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলেছেন। এছাড়া দীর্ঘদিনের পুরনো ভবনটির অগ্নিনিরাপত্তা, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, জরুরি বহির্গমন পথ, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, সিঁড়ি ও চলাচলের পথসহ পুরো বিষয়টি নিয়মিত কারিগরি ইন্সপেকশনের আওতায় আনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
নিউ মার্কেটের বড় সমস্যা পার্কিং। ক্রেতাদের সুবিধার জন্য নির্মিত বহুতল কার পার্কিং ঠিকভাবে কাজে লাগছে না বলে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। মার্কেটের আশপাশের সড়ক ও ফুটপাতের ওপরও চাপ বাড়ছে। চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ফুটপাত দখল করে হকার বসার বিষয়টি আলোচিত। নিউ মার্কেটসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত দখল এখন শহরের প্রাত্যহিক চিত্রে পরিণত হয়েছে। ক্রেতাদের স্বাভাবিক চলাচল, পথচারীদের নিরাপত্তা এবং যানবাহন চলাচলে নানাভাবে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে, যা নিউ মার্কেটের সার্বিক ব্যবসা–বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
কয়েক বছর আগে নিউ মার্কেটের পরিধি বাড়ানো হয়েছিল। বি–ব্লক নির্মাণ করে তাতে দোকান বরাদ্দ দেয় সিডিএ। কিন্তু সেই উদ্যোগও পুরোপুরি সফল হয়নি বলে সূত্র জানিয়েছে। পুরনো মূল ভবনের সঙ্গে নতুন ভবনের সংযোজন করে সমন্বিত ব্যবহার করা হলে কিছুটা সুফল মিলত বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মন্তব্য করেছেন।
নিউ মার্কেটের মূল নকশায় এটি কোনো ঘিঞ্জি বাণিজ্যিক ভবন হিসেবে পরিকল্পিত ছিল না। নির্মাণের সময় বিপুল পরিমাণ জায়গা চলাচল ও আলো–বাতাসের জন্য খোলা রাখা হয়েছিল। মাঝখানে ছিল সবুজ এলাকা। হাঁটার জন্য ছিল আলাদা ওয়াকওয়ে। ষাটের দশকের একটি মার্কেটের নকশায় এমন নগর স্বাচ্ছন্দ্যের চিন্তা ছিল, যা বর্তমান সময়ে অনেক নতুন বাণিজ্যিক ভবনের জন্য অনুসরণীয় হতে পারে বলে মন্তব্য করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিউ মার্কেট চট্টগ্রামের নগরায়ণের ইতিহাসের অংশ। শহরের মানুষ কীভাবে কেনাকাটা করত, কীভাবে একটি আধুনিক শপিং কমপ্লেঙের ধারণা তৈরি হয়েছিল, কীভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই মার্কেটে ব্যবসা করেছে তার ইতিহাস ধারণ করছে নিউ মার্কেট। অথচ সেই মার্কেট আজ নানা সংকটে রয়েছে। এটিকে আধুনিক, নিরাপদ ও নান্দনিক বাণিজ্যিক কেন্দ্রে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হলে চট্টগ্রামের ইতিহাস এবং ঐতিহ্য সমৃদ্ধ হবে বলে জানান তারা।
তাদের মতে, নিউ মার্কেটের জন্য একটি সমন্বিত মাস্টার প্ল্যান প্রয়োজন। প্রথমে ভবনের কাঠামোগত অবস্থা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রকৌশল জরিপ করতে হবে। এরপর বৈদ্যুতিক লাইন, অগ্নিনিরাপত্তা, পানি নিষ্কাশন, শৌচাগার, আলো–বাতাস, লিফট ও চলন্ত সিঁড়ি, পথচারী চলাচল, পার্কিং এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ সার্বিক চিত্র তুলে আনতে হবে। পাশাপাশি মূল স্থাপত্যের চরিত্র অক্ষুণ্ন রেখে এটিকে সংস্কার করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে নিউ মার্কেটের পাশের ফুটপাত ও সড়ককে দখলমুক্ত করে পথচারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।










