বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের নগরী কক্সবাজারে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে। সমপ্রসারিত হচ্ছে হোটেল–রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট ও পর্যটনকেন্দ্রিক নানা ব্যবসা। কিন্তু পর্যটনের এই প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে গড়ে ওঠেনি প্রয়োজনীয় যোগাযোগ অবকাঠামো। বিশেষ করে কলাতলী ও আশপাশের এলাকায় যানজট এখন পর্যটক ও স্থানীয়দের নিত্যভোগান্তির অন্যতম কারণ।
এই সংকট কাটিয়ে উঠতে সৈকতঘেঁষে সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে কলাতলী হয়ে বেইলী হ্যাচারি পর্যন্ত প্রায় ২ দশমিক ৮ কিলোমিটার নতুন সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রথম ধাপে সুগন্ধা থেকে কলাতলী মোড় পর্যন্ত ১ দশমিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ২৪ মিটার প্রশস্ত সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। পর্যটনসংশ্লিষ্টদের আশা, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে কক্সবাজারের পর্যটন জোনের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসবে। কলাতলী প্রধান সড়কের ওপর চাপ কমবে, পর্যটন এলাকা একমুখী বা পরিকল্পিত ট্রাফিক ব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব হবে এবং মেরিন ড্রাইভমুখী পর্যটনও নতুন গতি পাবে। কক্সবাজার পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, নগর উন্নয়ন ও নগর শাসন প্রকল্পের আওতায় সড়কটি নির্মাণ করছে পৌরসভা। প্রকল্পটির অর্থায়ন করছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা–জাইকা। ২০২৫ সালের ১৭ জুন প্রকল্পটির জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। পরে নির্মাণকাজ পায় ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স (এনডিই)। প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে ২০২৭ সালের ৫ অক্টোবর। গত কয়েক দিন ধরে শুরু হয়েছে প্রথম ধাপের নির্মাণকাজ। পরিকল্পনা অনুযায়ী সড়কটির পাশে থাকবে দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে, স্ট্রিট লাইট, পর্যটকদের জন্য পরিচ্ছন্নতা সুবিধা, পার্কিং ব্যবস্থা এবং সৈকতে নামার জন্য সিঁড়ি। পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মতে, এটি শুধু একটি বিকল্প সড়ক নয়, বরং পুরো পর্যটন জোনের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজানোর সুযোগ তৈরি করবে।
কক্সবাজার হোটেল–মোটেল–গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, পর্যটকের আগমনের তুলনায় কক্সবাজার শহরের অবকাঠামো এখনও অনেক ছোট। বিশেষ করে পর্যটন জোনে চলাচলের জন্য কার্যত একটি প্রধান সড়কের ওপর নির্ভর করতে হয়। তিনি বলেন, পর্যটন মৌসুমে প্রতিদিন লক্ষাধিক পর্যটক এই এলাকায় চলাচল করেন। একই সড়ক ব্যবহার করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কর্মরত বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের যানবাহনও। ফলে বছরের বড় সময়ই কলাতলী ও পর্যটন জোনে তীব্র যানজট দেখা দেয়।
তার মতে, বিকল্প একটি সড়কের প্রয়োজন বহু আগেই দেখা দিয়েছিল। সৈকতঘেঁষা সুগন্ধা থেকে বেইলী হ্যাচারি পর্যন্ত সড়কটি পুরোপুরি নির্মিত হলে যানবাহন চলাচলকে পরিকল্পিতভাবে ভাগ করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, কলাতলী প্রধান সড়ক এবং নতুন সৈকতঘেঁষা সড়ককে পৃথক ধরনের বা একমুখী যান চলাচলের আওতায় আনা গেলে যানজট উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। পাশাপাশি মেরিন ড্রাইভমুখী অনেক যানবাহন শহরের ভেতরের চাপ এড়িয়ে চলাচলের সুযোগ পাবে।
মেরিন ড্রাইভ এলাকায় গত কয়েক বছরে পর্যটনের ব্যাপক সমপ্রসারণ ঘটেছে। সেখানে গড়ে উঠেছে কয়েকটি তারকা মানের হোটেলসহ অসংখ্য হোটেল, রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। তবে যোগাযোগ সমস্যার কারণে এই সম্ভাবনার পুরোপুরি বিকাশ ঘটেনি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। মেরিন ড্রাইভ হোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, বেইলী হ্যাচারি পয়েন্টে ভাঙনের কারণে দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক দিয়ে চলাচল বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে কলাতলী মোড় থেকে মেরিন ড্রাইভের দিকে যাওয়া অভ্যন্তরীণ সড়কটি তুলনামূলক সরু এবং বিপুল যানবাহনের চাপ সামাল দেওয়ার মতো নয়। তিনি বলেন, সুগন্ধা থেকে নির্মিতব্য নতুন সড়কটি মেরিন ড্রাইভের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করা গেলে কক্সবাজারের পর্যটনের চিত্র বদলে যেতে পারে। বিস্তৃত মেরিন ড্রাইভ এলাকা নতুন করে পর্যটকদের কাছে সহজলভ্য হবে এবং শহরের মূল পর্যটন জোনের বাইরেও পর্যটনের বিস্তার ঘটবে।
এই সড়কে সম্ভাবনা তুলে ধরে কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবদুস শুক্কুর সিআইপি বলেন, সময়ের প্রয়োজনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কক্সবাজারের পর্যটন অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। ফলে পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনার একটি অংশ এখনও কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। তার মতে, নতুন সড়কটি নির্মিত হলে যোগাযোগ অবকাঠামোর একটি বড় ঘাটতি পূরণ হবে। পর্যটকদের চলাচল সহজ হওয়ার পাশাপাশি নতুন এলাকায় পর্যটন ও ব্যবসার সুযোগ তৈরি হবে।
এদিকে নতুন সড়ক নির্মাণকে ঘিরে আপত্তি তুলেছেন পরিবেশবাদীদের একটি অংশ। তাদের দাবি, উপকূলীয় বালিয়াড়ি শুধু বালুর স্তূপ নয়; এটি একটি স্বতন্ত্র প্রতিবেশ ব্যবস্থার অংশ। সড়ক নির্মাণের কারণে বালিয়াড়ির স্বাভাবিক গঠন, উদ্ভিদ ও সেখানে থাকা বিভিন্ন প্রাণীর আবাস ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাদের দাবি, প্রকল্পের কারণে উপকূলীয় প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে কিনা, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
তবে পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের একটি অংশ এই বিরোধিতার সঙ্গে একমত নন। কক্সবাজার জেলা রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাবেদ ইকবাল বলেন, রেল লাইন হয়েছে, কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প হয়েছে, বিস্তীর্ণ পাহাড় ধ্বংস করে রোহিঙ্গাদের আবাসন হয়েছে, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বাণিজ্যিক আবাসন প্রকল্প হয়েছে, পাহাড় ধ্বংস করে শত শত পাহাড় কেটে বসতি হয়েছে, নৌবাহিনীর জেটি, বালিয়াড়ির উপরে বহুতল অট্টালিকা হয়েছে। কিন্তু এসবে জীববৈচিত্র ধংস হয়নি! একটি সড়ক করতে গেলেই কথিত পরিবেশবাদীরা ধ্বংস দেখছেন। মূলত তারা চাঁদাবাজি করার জন্য এই বিরোধিতা করছেন।
সড়কটির বিরোধিতায় যেসব তথ্য প্রচার করা হচ্ছে, তার অনেকটাই বিভ্রান্তিকর বলে দাবি কক্সবাজার পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি মুহাম্মদ নূরুল ইসলামের। তিনি বলেন, যে বা যারা এই সড়কের বিরোধিতা করছে তারা ব্যক্তিগত স্বার্থচিন্তা থেকে তা করছেন। কতিপয় পরিবেশবাদী মিলে গণমাধ্যমকর্মীদের বিভ্রান্ত করে অপপ্রচার করছে।
এ বিষয়ে কক্সবাজার পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রোমেল বড়ুয়া বলেন, এই এলাকায় ইসিএ আইন অমান্য করে বহু ধরনের স্থাপনা হয়েছে। কিন্তু শহর উন্নয়নের লক্ষ্যে তৈরি করা একটি সড়ক নির্মাণে পরিবেশের দোহাই তুলেছেন। তিনি বলেন, যেহেতু প্রকল্পটি একনেকের মাধ্যমে পাশ হয়েছে, তাতে আইনগত কোনো ঘাটতি নেই। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রসহ সব ধরনের কাগজপত্র রয়েছে।
পর্যটনসংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, সুগন্ধা থেকে বেইলী হ্যাচারি পর্যন্ত পুরো সড়কটি বাস্তবায়িত হলে কক্সবাজারের পর্যটন যোগাযোগব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। কলাতলী সড়কের ওপর চাপ কমবে, মেরিন ড্রাইভ ও শহরের পর্যটন অঞ্চলগুলোর মধ্যে যোগাযোগ সহজ হবে এবং পর্যটকদের চলাচলের অভিজ্ঞতাও উন্নত হবে।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, কক্সবাজারের সবচেয়ে বড় শক্তি তার প্রকৃতি, সৈকত, বালিয়াড়ি ও উপকূলীয় পরিবেশ। কক্সবাজারের যানজট কমিয়ে আধুনিক একটি পর্যটন শহর গড়া যেমন জরুরি, তেমনি যে প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে এই পর্যটন শিল্পের বিকাশ, সেই প্রকৃতিকেও অক্ষত রাখার দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই।












