ঐতিহ্যবাহী লালদিঘি

রনজিৎ চন্দ্র নাথ | সোমবার , ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৫:২৭ পূর্বাহ্ণ

আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে যে নামটি মিশে আছে তা হলো চট্টগ্রামের অতি পরিচিত নাম ‘লালদিঘি’। লালদিঘি নাম উচ্চারিত হলেই ভেসে ওঠে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সংগ্রাম, আব্দুল জব্বারের বলি খেলা ও নাগরিক জীবনের নানা দিক। ১৭৬১ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চট্টগ্রাম দখলের পর প্রশাসনিক ভবন ‘লালকুঠি ও লালঘর’ (জেলখানা ও মেট্রোপলিটন পুলিশ অফিস) দু’টি পাহারা দেয়া বৃটিশদের লাল রঙের পাগড়ীর সাথে মিল রেখে নাম দেয়া হয় ‘লালদিঘি’। এই লালকুঠি ও লালঘরের কাছেই অবস্থিত একটি পুকুরকে পরিবর্ধন করে দিঘিতে রূপান্তর করেন বৃটিশ সরকার। দিঘির উত্তর পাড়ে একটি মঠ রয়েছে। এই মঠে ইংরেজিতে লেখা আছে ‘রায় বাহাদুর রাজকুমার ঘোষ স্কয়ার : ১৯৩৯’। রাউজান উপজেলার চিকদাইর গ্রামের জমিদার ছিলেন ‘রায় বাহাদুর’। তিনি অবসর সময় কাটানোর জন্য লালদিঘি পাড়ে ‘রায় বাহাদুর রাজকুমার ঘোষ স্কয়ার’ মঠটি তৈরি করেছিলেন। মূলত জমিদার রায় বাহাদুর ছিলেন লালদিঘির মালিক। পরবর্তী সময়ে এই লালদিঘির মালিকানা চলে আসে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের হাতে। দিঘির উত্তর পাড়ে নির্মিত শাহী জামে মসজিদের গম্বুজে খোদাই করে লেখা আছে নির্মাণ সাল ১৯৩৯। পরবর্তীতে দিঘির হেফাজতের দায় সরকারি মুসলিম হাই স্কুলের অধীনে যায়। এ তথ্য লালদিঘির সামাজিক মালিকানা ও রক্ষণাবেক্ষণের ধারাবাহিকতাকে প্রমাণ করে।

লালদিঘি নিয়ে একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে, একবার এক দিনমজুরের মেয়ে ঐ দিঘিতে স্নান করতে নেমেছিল। হঠাৎ সে বুঝতে পারে তার পায়ে শিকল বেঁধে পানির নিচে নিয়ে গেছে। সেখানে ছিল এক বাদশার দরবার। বাদশার সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছিল লাল বেগমের। বাদশা একদিন মনস্থির করল লাল বেগমকে দেখবেন। কিন্তু খবর পাওয়া গেলো লাল বেগম তার মুল্লক থেকে এক ক্রীতদাসের সাথে পালিয়েছে। এ খবর বাদশা তখনও জানতেন না। তাই স্নান করতে নামা দিনমজুরের ঐ মেয়েকে নিয়ে আসা হয় বাদশার দরবারে লাল বেগমের অভিনয় করার জন্য। অনেক কথাপ্রসঙ্গে বাদশা মেয়েটার আসল পরিচয় জেনে যায়। তখন ক্ষুব্ধ বাদশার নির্দেশ দেন যেইভাবে হোক লাল বেগমকে খুঁজে বের করতে। বাদশার নির্দেশ মতে সবাই লাল বেগমকে খুঁজতে শুরু করল। তখন জানা যায় আন্দরকিল্লার দিঘি থেকে দু’শ গজ দূরে পর্তুগীজদের কিল্লা আছে। বাদশা ঐ কিল্লায় আক্রমণ করেন। আক্রমণে অনেক খুনাখুনির ফলে লাল হয়ে যায় দিঘির পানি। বাদশা পরাজিত হন সেই যুদ্ধে। অন্যরা সবাই পালিয়ে যায়। তবুও সে দিঘির পাড়ে বাদশা থেকে গেলো লাল বেগমকে উদ্ধারের আশায়।

আরেকটি প্রবাদ প্রচলিত আছে লোকমুখে, ইংরেজ শাসনামলে এক লাল মেমসাহেবের নির্দেশে অথবা তাঁর স্মরণে এই দিঘিটি খনন করা হয়েছিল। সেই থেকে নামকরণ করা হয় ‘লালদিঘি’। আবার স্থানীয় জনশ্রুতির মতে, কখনও কখনও পানির রঙ লালচে দেখা যেত, সেই সূত্রেও নাম হতে পারে লালদিঘি।

১৯৪১ হতে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামের কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন স্যার হেনরী রিকেটস। স্যার হেনরী রিকেটসের স্মরণে চট্টগ্রামের জমিদারেরা লালদিঘির পশ্চিম পাড়ে একটি রিকেট ঘাট নির্মাণ করেন। ১৮৩১ হতে ১৮৩৯ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামের কালেক্টর ছিলেন মিঃ হার্ভে। তিনি ৩২ জন ডেপুটি কালেক্টর ও কয়েজন আমিন নিয়ে ২০ গন্ডার স্থলে ১৮ গন্ডা করে জরিপের কাজ শুরু করেন। তখন আনোয়ারার জনগণ অসন্তুষ্ট হয়ে তাকে আক্রমণ করে। সে সময় আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য সৈন্যদেরকে গুলির নির্দেশ দেন মিঃ হার্ভে। কর্তৃপক্ষ এ খবর পেয়ে মিঃ রিকেটকে প্রেরণ করেন। তিনি এসে জরিপের মাধ্যমে ১২০০ মঘীর জমি উদ্ধার করেন এবং চট্টগ্রামবাসীর শ্রদ্ধাভাজন হয়ে ওঠেন। ঊনবিংশ শতকে চট্টগ্রামের সেশন জজ টোডেল সাহেবের মৃত্যুর পর তাঁর শবদেহ রিকেট ঘাটের উত্তরপাড়ে দাহ করা হয়। টোডেল সাহেবের মৃত্যুর পড় স্মৃতির রক্ষার্থে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে নির্মিত স্তম্ভটি পরবর্তীতে ভেঙে ফেলা হয়েছিল।

বৃটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, ৬ দফা আন্দোলনসহ মুক্তিযুদ্ধের নানা গণসমাবেশের স্মৃতি বহন করে রাজনৈতিক ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রয়েছে এই লালদিঘি।

চট্টগ্রামের লোক ঐতিহ্যের উজ্জ্বল প্রতীক ‘জব্বারের বলীখেলা’ ২৫ এপ্রিল ১৯১০ সাল, বাংলা ১২ বৈশাখ তারিখ হতে প্রচলন হয় লালদিঘির মাঠে প্রতিবছর। জানা অজানা অনেক ইতিহাসের সাক্ষী চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী লালদিঘি।

লেখক : সাহিত্যকর্মী

পূর্ববর্তী নিবন্ধশিক্ষার অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জর্জরিত জাতি
পরবর্তী নিবন্ধনোবেলজয়ী স্টিভেন ওয়েইনবার্গ ও কর্তব্যের অবিস্মরণীয় শিক্ষা