এক মহাকাব্যের সমাপ্তি

জাতীয় দলকে বিদায় জানালেন রোনালদো ২৩ বছর, ২৩৪ ম্যাচ, ১৪৬ গোল

আজাদী ডেস্ক | শুক্রবার , ৬ নভেম্বর, ২০২৬ at ৫:২৬ পূর্বাহ্ণ

জাতীয় দলের কোচ জর্জে জেজুসের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন, দলের ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ায় সৃষ্ট বিতর্ক এবং এর জেরে পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের থেকে পাওয়া নিষেধাজ্ঞার মাঝেই আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ারের ইতি টেনে দিলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। সামাজিক মাধ্যমে গতকাল বৃহস্পতিবার দেওয়া বিবৃতিতে বিদায় জানান এই মহাতারকা।

২০০৩ সালে অভিষেকের পর থেকে জাতীয় দলের হয়ে ২৩৪ ম্যাচ খেলে ১৪৬টি গোল করে অবসরে গেলেন রোনালদো। আন্তর্জাতিক ফুটবলে এই ম্যাচ ও গোল সংখ্যা দুটিই রেকর্ড। পর্তুগালের হয়ে ৪৫টি অ্যাসিস্টও করেছেন ৪১ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড। কেবল ওই ম্যাচ ও গোলের রেকর্ডই নয়, দেশের ফুটবলে আরও অনেক কীর্তি গড়েছেন রোনালদো। তার হাত ধরেই ২০১৬ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জয় করে পর্তুগাল। এছাড়া দেশটি দুটি উয়েফা নেশন্স লিগ জয়েও নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। জাতীয় দলের হয়ে রোনালদোর বড় এক অপ্রাপ্তিও আছে, বিশ্বকাপ জিততে না পারার কষ্ট। সোনালি ট্রফিটিতে চুমু আঁকতে না পারলেও, সেখানেও আছে তার রেকর্ড; যৌথভাবে সর্বোচ্চ ছয় আসরে খেলার কীর্তি। এছাড়া ছয় বিশ্বকাপে গোল করার অনন্য রেকর্ডও তার। এত এত অর্জনের ভিড়ে যেন বিশাল বড় এক শূন্যতা আর অতৃপ্তি নিয়েই দেশের হয়ে আর না খেলার সিদ্ধান্ত নিলেন রোনালদো। খবর বিডিনিউজের।

গত জুন–জুলাইয়ের বিশ্বকাপে শেষ ষোলো থেকে ছিটকে পড়ার পরই নাকি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন রোনালদো। কিন্তু ফেডারেশনের অনুরোধে ও নতুন কোচ জেজুসের পরিকল্পনা নিয়ে সিদ্ধান্ত বদলান তিনি। পরে সেটাই যেন ‘বড় এক ভুল’ হয়ে রইল এই গ্রেটের ক্যারিয়ারে।

সেপ্টেম্বর–অক্টোবরের সবশেষ আন্তর্জাতিক বিরতিতে উয়েফা নেশন্স লিগের চারটি ম্যাচ খেলে পর্তুগাল। এর প্রথমটিতে ওয়েলসের বিপক্ষে প্রত্যাশিতভাবেই শুরুর একাদশে মাঠে নামেন রোনালদো। সেদিন অবশ্য তার পারফরম্যান্স মোটেও ভালো ছিল না, ১–০ গোলে জয়ের ম্যাচটিতে একাধিক সুবর্ণ সুযোগ নষ্ট করেন তিনি। নরওয়ের বিপক্ষে পরের ম্যাচে তাকে বেঞ্চে রেখে একাদশ সাজান জেজুস এবং ওখান থেকেই যত সমস্যার শুরু। ম্যাচের শেষদিকে তাকে মাঠে নামানোর সিদ্ধান্ত নেন কোচ, কিন্তু পরে আর নামাননি, যা ভালোভাবে নেননি রোনালদো।

ডেনমার্কের বিপক্ষে পরের ম্যাচের আগে দলের ক্যাম্প ছেড়ে চলে যান তিনি এবং পরে কোচের বিরুদ্ধে ‘প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের’ অভিযোগ আনেন। ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার ওই ঘটনায় গত ২০ অক্টোবর, তাকে এক মাসের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়। কোচের বিরুদ্ধে ওয়াদা ভঙ্গে অভিযোগ আনার বিশাল বিবৃতিতে অবশ্য শাস্তি ভোগ করে আবার দেশের হয়ে মাঠে নামার ইচ্ছার কথা জানান রোনালদো। কিন্তু আচমকাই সিদ্ধান্ত বদলে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন পাঁচবারের বর্ষসেরা ফুটবলার। তাই ওয়েলসের বিপক্ষে ওই ম্যাচটাই পর্তুগালের জার্সিতে সিআর সেভেনের শেষ ম্যাচ হয়ে থাকল।

ফুটবলার রোনালদোর পথচলা অবশ্য এখনই থামছে না। হাজার গোলের লক্ষ্যে ছুটে চলা এই গ্রেট ক্লাব আল নাস্‌রের হয়ে সবশেষ মাঠে নেমেই করেন হ্যাটট্রিক। সৌদি প্রো লিগে আল খোলুদ ক্লাবের বিপক্ষে ৫–৩ গোলে জয়ের ম্যাচে ১৫ মিনিটে তিনটি গোল করেন তিনি। রোনালদোর ক্যারিয়ার গোল সংখ্যা এখন ৯৮৫।

পর্তুগালের জন্য রোনালদোর ভালোবাসা : ‘৭ নম্বর জার্সিটি ফিরিয়ে দেওয়ার সময় হয়েছে’, দেশের মানুষের উদ্দেশ্যে দেওয়া বিদায়ী বার্তায় এভাবেই শুরু করলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। পাঁচ মিনিটের একটি ভিডিও বার্তায় পর্তুগালের মানুষের জন্য হৃদয় দুয়ার খুলে দেন এই মহাতারকা।

পর্তুগালের জনগণের উদ্দেশ্যে রোনালদোর বিবৃতি : পর্তুগালের মানুষরা, আমাদের জাতীয় দলের ৭ নম্বর জার্সিটি ফিরিয়ে দেওয়ার দিনটি চলে এসেছে। আমি কখনও মনে করিনি যে এটি শুধুই আমার। তবে দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন স্টেডিয়ামে এই জার্সি পরা, এটাকে রক্ষা করা এবং নিজের সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ আমার হয়েছিল। আজ সময় এসেছে জার্সিটি ভবিষ্যতের জন্য ছেড়ে দেওয়ার। সিদ্ধান্তটি সহজ ছিল না, কারণ কিছু সিদ্ধান্ত শুধু মাথা দিয়ে নেওয়া যায় না, সেগুলো হৃদয় থেকে নিতে হয়।

আমি এমন একটি যাত্রার সমাপ্তি টানছি, যা ২০০৩ সালের আগস্টে শুরু হয়েছিল এবং আমার জীবনকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল। আমি যখন পেছনে ফিরে তাকাই এবং জাতীয় দলের সাথে কাটানো আমার সব অভিজ্ঞতার কথা ভাবি, তখন আমি কেবল ম্যাচ, গোল, রেকর্ড বা ট্রফি দেখি না। আমি মানুষকে দেখি।

আমি সেইসব অভিবাসীদের দেখি যারা ৯০ মিনিটের জন্য পর্তুগালকে একটু বেশি কাছে অনুভব করেছিলেন। আমি লাখো পর্তুগিজকে দেখি যাদের সঙ্গে আমার কখনও ব্যক্তিগতভাবে দেখা হয়নি, কিন্তু তারা আমার জীবনের অংশ ছিলেন। কারণ দিনশেষে ফুটবল কেবল একটি খেলার চেয়েও অনেক বড় কিছু। ফুটবল মানেই মানুষ।

আমার সতীর্থদের উদ্দেশ্যে আমি একটি বিশেষ কথা বলতে চাই। প্রতিটি দৌড়, প্রতিটি আলিঙ্গন, প্রতিটি আলোচনা এবং মাঠে নামার আগের প্রতিটি মুহূর্তের নীরবতার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ। আমরা একসাথে যে সব জয় উদযাপন করেছি এবং প্রতিটি পরাজয় যা আমাদের আরও শক্তিশালী করেছে, তার জন্য ধন্যবাদ। অধিনায়ক হওয়ার সুযোগ আমি পেয়েছিলাম, কিন্তু কোনো অধিনায়কই একা পথ চলতে পারে না। আর সব সতীর্থ আমার গল্পের অংশ।

সব কোচ, ম্যানেজার, চিকিৎসক, ফিজিও, কিট ম্যান, স্টাফ এবং এই দীর্ঘ সময়ে যারা আমার সঙ্গে কাজ করেছেন, তাদের সবাইকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ। আজ জাতীয় দলের হয়ে মাঠের ভেতর আমার যাত্রা শেষ হলো। আমি মাথা উঁচু করে বিদায় নিচ্ছি, আমি যে পথ চলেছি তা নিয়ে আমি গর্বিত এবং আমার এই আত্মতৃপ্তি আছে যে আমি পর্তুগালের জন্য আমার সবকিছু উজাড় করে দিয়েছি। কিন্তু আমি কখনও আপনাদের থেকে আলাদা হব না। আমি পর্তুগালের প্রতিটি জয়ের জন্য দূর থেকেই পুরো হৃদয় দিয়ে রোমাঞ্চিত হব, উদযাপন করব, (হারে) কষ্ট পাব।

এই ২৩ বছরের জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। আমার ওপর বিশ্বাস রাখার জন্য ধন্যবাদ। মাদেইরার এক সাধারণ ছেলে হিসেবে বলের পেছনে ছুটে চলা থেকে শুরু হওয়া একটা স্বপ্নকে সত্যি করতে দেওয়ার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। ৭ নম্বর জার্সিটি আমার কাছেই থাকবে; এটি পরার গর্ব চিরকাল আমারই থাকবে। পর্তুগাল সবসময় আমার একটি অংশ হয়ে থাকবে।

‘ধন্যবাদ অধিনায়ক, ১০০০ গোলের জন্য এগিয়ে চলো’ : প্রায় দুই যুগ ধরে জাতীয় দলকে টেনে নিয়ে যাওয়া ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর অবদান মনে রেখেছে পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশন। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায় নেওয়া অধিনায়ককে ধন্যবাদ জানিয়ে, তার হাজার গোলের ঐতিহাসিক অভিযানে সাফল্য কামনা করেছে তারা। এক বিবৃতিতে রোনালদোর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশন।

পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন তাদের চিরন্তন অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর প্রতি আন্তরিক ও চিরস্থায়ী কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে। ‘তিনি আজ জাতীয় দল থেকে তার চূড়ান্ত অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। গভীর কৃতজ্ঞতা ও অপরিসীম প্রশংসার অনুভূতি নিয়েই পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন দেশের সেবায় অসাধারণ ক্যারিয়ারের জন্য ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছে এবং ধন্যবাদ দিচ্ছে। সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ, অধিনায়ক! চলুন, ১০০০ গোলের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাই!!!’

‘চিরকাল এক নম্বর’ : আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেওয়া ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন ফুটবল তারকারা। পর্তুগালের ইতিহাসের সেরা ফুটবলারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ভিনিসিউস জুনিয়র, নেইমার, পেপেরা। ব্রাজিলের তারকা ফরোয়ার্ড নেইমার, যিনি উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের পরপরই জাতীয় দলকে বিদায় বলে দেন, একটি হাততালির ইমোজি দিয়ে রোনালদোর ভিডিওতে লেখেন, ‘কিংবদন্তি।’

২০১৮ সালে রোনালদো রেয়াল মাদ্রিদ ছেড়ে যাওয়ার পর স্প্যানিশ ক্লাবটিতে যোগ দেন ভিনিসিউস জুনিয়র। রেয়ালে রোনালদোর ৭ নম্বর জার্সি পরে এখন খেলছেন ব্রাজিলিয়ান তারকা উইঙ্গার। নিজের আদর্শ রোনালদোকে নিয়ে ভিনিসিউস লিখেছেন, ‘চিরকাল এক নম্বর।’

রোনালদোর ভিডিওতে সাবেক সতীর্থকে নিয়ে নিজের অনুভূতির সামান্য তুলে ধরেন পেপে। রোনালদোর সঙ্গে রেয়াল মাদ্রিদ ও পর্তুগাল দলের হয়ে খেলেছেন এই ডিফেন্ডার। ‘এটা ফুটবলের চেয়েও বেশি কিছু ছিল। সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ, ক্রিস।’ ক্যারিয়ার দুই মেয়াদে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে খেলেছেন রোনালদো। প্রথম মেয়াদে ক্লাবটিতে বেশ সফল ছিলেন তিনি। জিতেছেন অনেক শিরোপা। কিন্তু পরের মেয়াদে বেশিদিন ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে টিকতে পারেননি তিনি। ক্লাবের সাবেক ফুটবলারের অবসরের দিন তাকে অভিনন্দন জানাতে ভোলেনি ইউনাইটেড, ‘অসাধারণ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের জন্য অভিনন্দন।’ রোনালদোকে নিয়ে ইউভেন্তুস লিখেছে, পর্তুগালের হয়ে চমৎকার একটি পথচলার জন্য অভিনন্দন ক্রিশ্চিয়ানো।

রোনালদোর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে ফিফাও। বিশ্বকাপের অফিশিয়াল অ্যাকাউন্টে পর্তুগালের জার্সিতে ক্যারিয়ারের শুরুর সময় ও বর্তমান সময়ের রোনালদোর একটি ছবি পোস্ট করেছে। সেখানে ক্যাপশনে লিখেছে, ‘ধন্যবাদ, ক্রিশ্চিয়ানো।’

২৩ বছর, ২৩৪ ম্যাচ, ১৪৬ গোলের মহাকাব্যের সমাপ্তি : শুরুটা হয়েছিল ২০০৩ সালের ২০ আগস্ট। কাজাখস্তানের বিপক্ষে বদলি নেমেছিলেন সেই সময়ের ১৮ বছর বয়সী উইঙ্গার রোনালদো। এরপর কত পথ পাড়ি দিয়ে তিনি উঠে আসেন চূড়ায়। ২০০৪ ইউরোতে গ্রিসের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বে প্রথম আন্তর্জাতিক গোলের দেখা পান তিনি। ২৩ বছর দীর্ঘ ক্যারিয়ার শেষ করলেন তিনি ২৩৪ ম্যাচ ১৪৬ গোল নিয়ে। তার ধারে কাছে নেই কেউ। ম্যাচ ও গোল– দুটোই পর্তুগালের সর্বোচ্চ তো বটেই, বিশ্ব রেকর্ডও। পর্তুগালের হয়ে ৪৫টি অ্যাসিস্টও করেছেন তিনি। দেশের প্রথম বড় শিরোপা– ২০১৬ ইউরো জয়ে অধিনায়ক ছিলেন রোনালদো। পরে দুটি নেশন্স লিগ জয়েও দেশকে নেতৃত্ব দেন।

সৌদি আরবের ক্লাব আল নাস্‌রের হয়ে খেলা চালিয়ে যাবেন রোনালদো। তার সামনে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে হাজার গোলের মাইলফলক স্পর্শের হাতছানি। ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে এখন পর্যন্ত করেছেন ৯৮৫ গোল।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসেন্টমার্টিনে জাহাজ চলাচল শুরু
পরবর্তী নিবন্ধআমিরাতে বাংলাদেশিদের ভিসা সংকট সমাধানের আশ্বাস প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রীর