আমাদের আশপাশে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত অনেক মানুষকেই পাওয়া যাবে। শিক্ষা ও মানবিকতার সমন্বয়ে চারপাশের পৃথিবীকে আলোকিত করতে পারে এমন মানুষ খুব কম। এমন–ই এক আলোকিত ও ক্ষনজন্মা মানুষের নাম ডাক্তার ফজল আহমদ। তিনি রাউজানের চিকদাইর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯২৯ সালের এপ্রিল মাসে জন্মগ্রহণ করেন। বার্মার প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী বাবার সন্তান হিসাবে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষার সূচনা হয় ডাবুয়া রাম সেবক এম ই (মিডল ইংলিশ স্কুল) স্কুল থেকে। স্কুলটি এ অঞ্চলের প্রাচীনতম স্কুলের একটি। বিশিষ্ট ভাষা বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এনামুল হক সুদূর ফটিকছড়ি থেকে এসে এই স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। মেধাবী ছাত্র হিসাবে ডাক্তার ফজল আহমদ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল শেষে রাউজান আর আর এ সি মডেল হাইস্কুলে ভর্তি হন। অনেক দূর দূরান্ত থেকে মেধাবী ছাত্র–ছাত্রীরা রাউজান স্কুলে ভর্তি হতেন। প্রচন্ড প্রতিযোগিতা হতো শিক্ষার্থীদের মধ্যে। এখানেই তিনি সহপাঠী হিসেবে পেয়েছিলেন অমলেন্দু বিশ্বাসকে। ডাক্তার ফজল আহমদ ও অমলেন্দু বিশ্বাস পর্যায়ক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানে থাকতেন। কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে দুই বন্ধু প্রথম বিভাগে কৃতিত্বের সাথে এন্ট্রান্স পাশ করে চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হন। ৪৭ সালের ঐতিহাসিক স্বাধীনতা/দেশভাগের কারণে অমলেন্দু বাবুর পরিবার ভারতে চলে যান। তিনি ভারতে জেনারেল পর্যন্ত হয়েছিলেন। ডাক্তার ফজল আহমদ চট্টগ্রাম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে চট্টগ্রাম মেডিকেল স্কুলে ভর্তি হন এবং কৃতিত্বের সাথে এল এম এফ পাশ করেন।
সমাজসেবা ও রাজনৈতিক সচেতনতা তাঁর রক্তে ছিল। আশপাশের মানুষদের পাশে থেকে ভালো থাকার ব্রত নিয়ে তিনি সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র থাকাকালীন সামাজিক ও জনহিতকর কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েন। গ্রামের সম্মানিত বয়োজ্যেষ্ঠ, সম্পর্কের বড়ভাই, মাওলানা মোহসেন সাহেব ছিলেন তাঁর অনুপ্রেরণা ও শিক্ষাগুরু। গ্রামের প্রান্তিক মানুষদের চিকিৎসা সেবা দেয়ার পাশাপাশি তাঁদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নেও তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। সমন্বিত ইরিগেশন প্রজেক্টের মাধ্যমে তিনি এলাকার কৃষকদের উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতির সাথে পরিচয় করান। তাঁর ইরিগেশন প্রজেক্টের ম্যানেজার ছিলেন সৈয়দ আহমদ সাহেব, যিনি পরবর্তীতে ম্যানেজার সৈয়দ আহমদ সাহেব নামে পরিচিত ছিলেন। রাউজানের গহিরায় অবস্থিত সমবায় প্রতিষ্ঠান শান্তির দ্বীপ কো–অপারেটিভ সোসাইটির দীর্ঘদিন ধরে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে তিনি মানুষের জন্য কাজ করতেন। সপ্তাহের পাঁচ দিন শহরে রোগী দেখে শনিবার ও রোববার তিনি বিনামূল্যে গ্রামের মানুষদের চিকিৎসা সেবা দিতেন। তাঁর গ্রামের বাড়িতে মানুষ দীর্ঘ লাইন দিয়ে ডাক্তার সাহেব আসার অপেক্ষা করতেন। চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য আগত বন্ধু, আত্মীয় স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের আনাগোনায় তাঁর গ্রামের বাড়ি মুখরিত থাকতো। আগত দর্শনার্থী অতিথিদের নিয়মিত আপ্যায়ন ছিল তাঁর আনন্দের অনুসঙ্গ। বিভিন্ন বয়সী মানুষকে সাথে নিয়ে গ্রামের উন্নয়ন ছিল তাঁর ব্রত। নিজ এলাকার আলিমুদ্দীন সওদাগর জামে মসজিদ পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন ১৯৫৬ সাল থেকে জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত।
শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে জীবনের মধ্যাহ্নে তিনি নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন চিকদাইর শাহাদাত–ফজল যুব উচ্চ বিদ্যালয়। এলাকার শিক্ষা বিস্তারে এই স্কুল অগ্রণী ভুমিকা পালন করে চলেছে। এই স্কুলটি ছিল তাঁর স্বপ্নের বাস্তবায়ন। মুক্তিযুদ্ধ ও মানব কল্যাণ ছিল তাঁর হৃদয়ের গভীরে। তিনি তাঁর স্কুলের মুক্তিযুদ্ধ কর্ণারের জন্য হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত পনের খন্ডের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বইটি নুতন ও আগামী প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করে গেছেন। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদানের কথা রাউজানের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বইটির ৬৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে। চিকিৎসা সেবা, সমাজসেবা, কৃষি উন্নয়ন, সামাজিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, শিক্ষা বিস্তার, সমবায় আন্দোলন… কোথায় তাঁর ছোঁয়া লাগেনি? ইচ্ছে করলেই নগরের স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন পাড়ি দিতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি বেঁছে নিয়েছিলেন শেকড়ের কাছাকাছি থাকার। তাঁর এলাকার মানুষ তাঁর মানবিক কর্মকাণ্ডের জন্য তাঁকে সম্মান দিয়ে, ভালবেসে হৃদয়ের গভীরে স্থান দিয়েছেন। নশ্বর পৃথিবী থেকে সকলকেই বিদায় নিতে হয়, ডাক্তার ফজল আহমদ ১৯৯৭ সালের সেপ্টেম্বরের ২০ তারিখ এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরলোক গমন করেন। রেখে যান মৃত্যহীন বর্ণাঢ্য এক জীবনালেখ্য।












