উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম জনস্বাস্থ্য সমস্যা। অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, অতিরিক্ত ওজন, খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তাকে সাধারণত উচ্চ রক্তচাপের প্রধান ঝুঁকির কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে অনেক ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, নিয়মিত ওষুধ সেবন এবং স্থূলতাজনিত সমস্যা না থাকা সত্ত্বেও রোগীদের উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এর পেছনে জিনগত পরিবর্তনের ভূমিকা থাকতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
চট্টগ্রামের একদল গবেষকের সাম্প্রতিক গবেষণায় উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ কিছু জিনগত পরিবর্তন শনাক্ত হয়েছে। গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, ফটিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং ডিজিজ বায়োলজি অ্যান্ড মলিকুলার এপিডেমিওলজি রিসার্চ গ্রুপ চট্টগ্রামের গবেষকরা। গবেষণাটি নেদারল্যান্ডসভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা এলসেভিয়ারের ‘জিন রিপোর্টস’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় চট্টগ্রাম অঞ্চলের ২২২ জন উচ্চ রক্তচাপের রোগী এবং সুস্থ মানুষের জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের প্রায় অর্ধেকের মধ্যে ইসিই ওয়ান এবং এজিটি নামের দুটি গুরুত্বপূর্ণ জিনে বিশেষ ধরনের জিনগত পরিবর্তন বা মিউটেশন রয়েছে। বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত নারীদের মধ্যে এই জিনগত পরিবর্তনের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি পাওয়া গেছে।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, নির্দিষ্ট কিছু জিনগত পরিবর্তন বহনকারী রোগীদের ক্ষেত্রে প্রচলিত চিকিৎসায় প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে একই ধরনের চিকিৎসা সব রোগীর ক্ষেত্রে সমানভাবে কার্যকর না–ও হতে পারে। গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে রোগীর জিনগত বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে চিকিৎসা নির্ধারণ বা প্রিসিশন মেডিসিন পদ্ধতি উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সুস্থ ব্যক্তিদের মধ্যেও উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু জিনগত পরিবর্তনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। অর্থাৎ বর্তমানে উচ্চ রক্তচাপ না থাকলেও এসব জিনগত বৈশিষ্ট্য বহনকারী ব্যক্তিদের ভবিষ্যতে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে। তবে শুধু জিনগত পরিবর্তনের উপস্থিতিই যে ভবিষ্যতে উচ্চ রক্তচাপ নিশ্চিত করবে, তা নয়। পরিবেশ, খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন এবং অন্যান্য জৈবিক উপাদানও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণাটিতে প্রথমবারের মতো আধুনিকতম প্রযুক্তি ডযড়ষব ঊীড়সব ঝবয়ঁবহপরহম (ডঊঝ) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের জিনোমের প্রোটিন তৈরির নির্দেশনাসম্পন্ন সবগুলো গুরুত্বপূর্ণ অংশ বিশ্লেষণ করা সম্ভব। গবেষণায় ইসিই ওয়ান, এজিটিসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জিনকে উচ্চ রক্তচাপের সম্ভাব্য জিনগত নিয়ামক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পরবর্তী বিশ্লেষণে ঊঈঊ১ ও অএঞ জিনের নির্দিষ্ট পরিবর্তনের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের সম্পর্কের বিষয়টি উঠে এসেছে।
গবেষকদের মতে, উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসায় শুধু রক্তচাপের মাত্রা পর্যবেক্ষণ বা প্রচলিত ওষুধ প্রয়োগের পাশাপাশি রোগের অন্তর্নিহিত জিনগত কারণ অনুসন্ধান করাও গুরুত্বপূর্ণ। কোন জিনগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কোন ওষুধ সবচেয়ে কার্যকর, তা নির্ধারণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীভিত্তিক গবেষণা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে এ ধরনের গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর জন্য জিনভিত্তিক চিকিৎসাপদ্ধতি বিকাশের পথ তৈরি হতে পারে।
গবেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে জিনগত গবেষণার পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে যেসব রোগীর ক্ষেত্রে প্রচলিত চিকিৎসায় প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না, তাদের ক্ষেত্রে জিনগত বৈশিষ্ট্য ও অন্যান্য সম্ভাব্য কারণ অনুসন্ধান ভবিষ্যতে চিকিৎসার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
গবেষক দলের সদস্যরা হলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের হরমোন ও ডায়াবেটিস বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডা. ফারহানা আক্তার, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এইচ এম হামিদুল্লাহ মেহেদী, ফটিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. ইমরুল কায়সার, চট্টগ্রাম রেলওয়ে হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. আবুল ফয়সাল মুহাম্মদ নুরুদ্দিন, রাঙামাটি মেডিকেল কলেজের ফার্মাকোলজি বিভাগের চিকিৎসক ডা. মাসুদ রানা, চবি জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও বায়োটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. এস এম রফিকুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. আদনান মান্নান, সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহবুব হাসান, প্রভাষক আফরোজা আক্তার তন্বী এবং গবেষণা সহকারী সাজিয়া আফরিন ও শোয়াইব ইবনে হামিদ।
গবেষণাদলের অন্যতম সদস্য ডা. আবুল ফয়সাল মুহাম্মদ নুরুদ্দিন বলেন, প্রচলিত ঝুঁকির কারণগুলো নিয়ন্ত্রণে থাকার পরও যেসব রোগীর উচ্চ রক্তচাপ অনিয়ন্ত্রিত থাকছে, তাদের ক্ষেত্রে এর পেছনে আরও কিছু অপ্রচলিত বা লুকায়িত ঝুঁকির কারণ থাকতে পারে। আমাদের গবেষণায় এমন একটি সম্ভাব্য ঝুঁকির কারণ হিসেবে জিনগত পরিবর্তন বা মিউটেশন শনাক্ত হয়েছে। এসব জিনগত পরিবর্তন রক্তচাপ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে আমাদের ধারণা।
গবেষণাদলের আরেক সদস্য ডা. মাসুদ রানা বলেন, বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশনের প্রকোপ দিন দিন বাড়ছে। এর পেছনে অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং পরিবেশগত নানা উপাদানের ভূমিকা রয়েছে। তবে এসব প্রচলিত কারণের পাশাপাশি জিনগত পরিবর্তনও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি ও প্রকোপ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। খাদ্যাভ্যাস ও পরিবেশগত পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন জৈবিক প্রক্রিয়ার প্রভাবে জিনের কার্যকারিতায় পরিবর্তন আসতে পারে। আমাদের গবেষণায় উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে সম্পর্কিত এমন কিছু জিনগত পরিবর্তনের উপস্থিতি উঠে এসেছে, যা রোগটির কারণ ও ঝুঁকি সম্পর্কে নতুন ধারণা দিচ্ছে।












