‘বারে বারে ঘুরে ফিরে ঈদ আসে, ঈদ চলে যায়, ঈদ হাসতে শেখায়, ভালোবাসতে শেখায়।’ ঈদ শুধু ধনীর জন্য নয়, সবার জন্য। সবার মুখে হাসি ফোটানোই হলো ঈদের মাহাত্ম্য। পবিত্র ঈদুল আজহা মুসলমানদের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উৎসব। ‘ঈদ এসেছে ঈদ এসেছে ঈদ মোবারক, ঐ আকাশে চাঁদ উঠেছে দেখরে তোরা দেখ/ ধনী গরীব সবার ঘরে আজ, এলো ঈদের খুশি/ ফুটলো আবার দুঃখি জনের মলিন মুখে হাসি।’
বাংলাদেশের জাতীয় কবি পবিত্র ঈদুল আজহা নিয়ে অনেক কবিতা রচনা করেছেন। তাঁকে প্রেম ও দ্রোহের কবিও বলা হয়ে থাকে। পবিত্র কোরআনে যে কোরবানির আদেশ দেওয়া হয়েছে, নজরুল সে কোরবানির কথাই বলেছেন ছন্দে ছন্দে– ‘ইবরাহিমের কাহিনি শুনেছ? ইসমাইলের ত্যাগ?/আল্লারে পাবে মনে কর কোরবানি দিয়ে গরু–ছাগ?/আল্লার নামে ধর্মের নামে, মানবজাতির লাগি/পুত্রেরে কোরবানি দিতে পারে, আছে কেউ হেন ত্যাগী?/সেই মুসলিম থাকে যদি কেউ, তসলিম কর তারে,/ঈদগাহে গিয়া তারি সার্থক হয় ডাকা আল্লারে।/অন্তরে ভোগী বাইরে সে যোগী, মুসলমান সে নয়/চোগা চাপকানে ঢাকা পড়িবে না সত্য সে পরিচয়।’ পশু কোরবানি দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়া সম্ভব নয়। এটি এক অবাস্তব কল্পনা। এটি নজরুলের মনগড়া কথা নয়। কোরআনে বলা আল্লাহর ফরমান। সুরা হজের ৩৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমাদের জবাই করা পশুর রক্ত–মাংসের দিকে আল্লাহ ফিরেও তাকান না, তিনি দেখেন তোমাদের মনের তাকওয়া।’
কোরবানির শিক্ষা হলো, মনের পশুকে জবেহ করে নিজেকে খোদায়ি রঙে সাজিয়ে তোলা। সব ধরনের অন্যায়, অবিচার, মিথ্যা ও অধর্মের বিরুদ্ধে সাহসের সঙ্গে গর্জে ওঠা। এমন মুসলমানদেরই কোরআনে জীবন্ত শহীদ বলা হয়েছে। নজরুল বলেছেন, মুসলমানের দায়িত্ব হলো বিদ্বেষমুক্ত প্রেমের পৃথিবী গড়ে তোলা। যতদিন পর্যন্ত মুসলমানরা স্বার্থপরতা ত্যাগ করতে না পারবে, ততদিন পর্যন্ত সাম্যের পৃথিবী গড়ে উঠবে না। স্বার্থপরের জন্য জান্নাত হারাম। নজরুল বলেছেন, ‘শুধু আপনারে বাঁচায় যে/মুসলিম নহে ভণ্ড সে/ইসলাম বলে বাঁচ সবাই/দাও কোরবানি জান ও মাল/বেহেশত তোমার কর হালাল/স্বার্থপরের বেহেশত নেই।’ কোরবানী’ কবিতায় নজরুল বলেছেন–
‘ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যগ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন/দুর্বল ভীরু চুপ রহো ওহো খামখা ক্ষুব্ধ মন/ধ্বনি ওঠে রণি দুরবানীর/আজিকার এ খুন কোরবানীর/ দুম্বাশির–রুমবাসীর
শহীদের শির সেরা আজি।’ এভাবে নজরুল কোরবানি বা ত্যাগের মর্মকে উপলব্ধি করেছেন এবং মুসলিম বীরদেরকে জাতীয় জাগরণের প্রতীক ও প্রেরণা হিসেবে তুলে ধরেছেন। মহান বীরদের ও তাঁদের কোরবানি ও প্রচেষ্টাসমূহকে স্মরণ করেছেন যে প্রচেষ্টার মধ্যে দিয়েই জুলুম–জালিম উৎখাত হবে। সত্য–মিথ্যার দ্বন্দ্ব, জালিম–মজলুমের সংঘাত, শোষক–শোষিতের লড়াই, নিপীড়ক–নিপীড়িতের যুদ্ধ, ধর্ম–অধর্মের জিহাদ হচ্ছে মানব জাতির ইতিহাস। সত্যের সুরে অসুরকে বিদূরিত করতে আলোর গানে অন্ধকারকে বিদূরিত করতে জমায়েত হতে হবে শহীদের ঈদগাহে। উৎসর্গ করতে হবে আল্লার রাহে অর্থাৎ ন্যায়ের পথে সংগ্রামে জীবনের সবচেয়ে প্রিয় বস্তুকে।
হযরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর অতি প্রিয় পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ.) কে আল্লাহপাকের আদিষ্ট হয়ে কোরবানি দিতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। আল্লাহপাক হযরত ইব্রাহিম (আ.) পরীক্ষা করে দেখলেন। পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হলেন। সে জায়গায় দেখা গেল একটা দুম্বা কোরবানি হয়েছে। হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও হযরত ইসমাঈল (আ.) এর অতুলনীয় আত্মত্যাগ ও আল্লাহর নির্দেশের প্রতি অবিচল আনুগত্যের ঘটনাটি বিশ্বসাহিত্যের উপর বিশাল প্রভাব বিস্তার করে।
নজরুল তাঁর সংগ্রামী চেতনার ভেতরেই ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদের তাৎপর্য খুঁজে পেয়েছেন। সেটাই তিনি তাঁর ‘বকরীদ’ কবিতায় বলতে চেয়েছেন। ‘শহীদানদের ঈদ এলো বকরীদ/অন্তরে চির নৌ–জোয়ান যে তারি তরে এই ঈদ/আল্লার রাহে দিতে পারে যারা আপনারে কোরবান/নির্লোভ নিরহংকার যারা যাহারা নিরভিমান/দানব দৈত্যে কতল করিতে আসে তলোয়ার লয়ে/ফিরদাউস হতে এসেছে যাহারা ধরায় মানুষ হয়ে/অসুন্দর ও অত্যাচারীরে বিনাস করিতে যারা/জন্ম লয়েছে চির–নির্ভীক, যৌবন মাতোয়ারা/তাহাদেরি শুধু আছে অধিকার ঈদগাহে ময়দানে/তাহারাই শুধু বকরীদ করে জান–মাল কোরবানে।’ ঈদুল আজহা আত্মত্যাগে ডুবে যাওয়ার দিন। আজহা মানে প্রভাতের ঝিলিমিলি আলো, যা অন্ধকার দূর করে দেয়। রাতের অন্ধকার ভেঙে নতুন ভোর নিয়ে আসে।
আল্লাহর প্রতি পরম আনুগত্য, কঠোরতম ত্যাগ–তিতিক্ষা আর আত্মোৎসর্গের অকপট প্রেরণায় উজ্জীবিত পবিত্র ঈদুল আজহা। নজরুল আহ্বান জানিয়ে বলেছেন -‘এলো স্মরণ করিয়ে দিতে উদজ্জোহার এই সে চাঁদ/ তোরা ভোগের পাত্র ফেললে ছুড়ে ত্যাগের তরে হৃদয় বাঁধ।’
ঈদ মানবসমাজের ধনী–গরিব ব্যবধান ভুলিয়ে দেয়ার একটি দিন। ঈদের দিনে সবাই সমান। ঈদের দুই রাকাত নামাজ আদায় হলো এক মহাসম্মিলন। ঈদগাঁহে ধনী–গরিব সবাই এক কাতারে, এক সমান। ঈদুল আজহা সাধারণত কোরবানের ঈদ হিসেবে পরিচিত। কোরবানির পশুর মাংস গরিব–দুখীদের মাঝে বিলিয়ে দেয়ার বিধান রয়েছ। সঠিক বণ্টনের মাধ্যমে সবার মাঝে হাসি ফুটবে।







