ইরান ও ইসরায়েল–এই দুই দেশের সম্পর্ক বহু বছর ধরেই অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠছে। আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং নিরাপত্তা ইস্যুকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে বিরোধ ক্রমাগত বাড়ছে। অনেক মুসলিম দেশ মধ্যপ্রাচ্যের এ ভূ–রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। কেউ ইরানের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছে, আবার কেউ নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করছে। ফলে এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। সাম্রাজ্যবাদ এবং মৌলবাদ দুটোই পৃথিবী এবং মানবজাতির জন্য ভয়ংকর। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় ইসরায়েল লড়াই করছে সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে অন্যদিকে মৌলবাদের পক্ষে লড়াই করছে ইরান কিন্তু দু‘জনের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য ভিন্ন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় ইসরায়েলের সহযোগিতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে লড়াই করছে আরব বিশ্বে তাদের আধিপত্য বৃদ্ধি করার মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদ ও ইহুদিবাদ প্রতিষ্ঠা করতে, অন্যদিকে ইরান মৌলবাদী রাষ্ট্র হলেও তারা লড়াই করছে তাদের ভূমি রক্ষা করতে, যার সাথে ইসলাম এবং মুসলমানদের স্বার্থও জড়িত। ইসরায়েলের সাথে দীর্ঘস্থ্ায়ী যুদ্ধে ফিলিস্তিনের জয়লাভ যেমন সুদূরপরাহত তেমনি ইরান, ইসরায়েল –যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে ইরানের পরাজয় হয়তো সময়ের ব্যাপার। প্রকৃতঅর্থে এখানে যতটা না ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রের দোহাই দেয়া হচ্ছে তার চেয়ে বেশি কাজ করছে ইরানের তৈল সম্পদসহ তার প্রাকৃতিক সম্পদ দখল করা এবং মুসলিম বিশ্বকে মার্কিনীদের হাতের পুতুল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। কারণ ইরান একমাত্র দেশ যে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে, আঙুল তুলে নির্ভয়ে সাহসের সাথে কথা বলে, তাই ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রের কথা বলে পৃথিবীকে জুজুর ভয় দেখাচ্ছে অথচ তাদের কাছেই রয়েছে পারমাণবিক অস্ত্রের বিশাল ভাণ্ডার।
ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে হামলা করছে, নিশ্চয়ই করে সেটি কোনভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু কেন ইরান এ কাজটি করছে তারও পক্ষেও একটা যুক্তি আছে, কারণ এ আরব দেশগুলোতো প্রতিষ্ঠিত সামরিক ঘাটি থেকে যুক্তরাষ্ট্র একের পর এক ইরানে হামলা করছে, তাই নিজের অস্তিত্ব রক্ষার্থে ইরান এ কাজটি করছে বলে প্রতিয়মান। ইরানের এমন কর্মকাণ্ডের বিপরীতে আরব দেশগুলোও হয়তো সামরিক ব্যবস্থা নিবে তাদের অস্তিত্ব রক্ষায়, আর তখন ইরানের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠবে হয়তো তাতে ধ্বংস হয়ে যাবে ইরান, ধ্বংস হয়ে যাবে ইরানের মৌলবাদী শক্তি, কিন্তু তাতে জয় হবে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের তবে এ পরাজয় একা ইরানের হবে না হবে পুরো মুসলিম বিশ্বের, কারণ এরপর মুসলিম বিশ্বের আর কোনও রাষ্ট্র থাকবে না যারা ইহুদী এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারবে। ইরান যদি পরাজিত হয় তাহলে আজকে মধ্যপ্রাচ্যের যে রাষ্ট্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে সাহায্য করছে তাদের ভবিষ্যৎও ভালো হবে বলে মনে হয় না। এই যুদ্ধের প্রভাব শুধু এই দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল এবং মুসলিম বিশ্বের উপর এর গভীর ও বহুমাত্রিকভাবে প্রভাব পড়বে। মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি অনেকাংশে জ্বালানি সম্পদের উপর নির্ভরশীল। উপসাগরীয় অঞ্চলে এই সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে দীর্ঘস্থায়ী বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। তেলের দাম বেড়ে গেলে বিশ্বের অনেক দেশের অর্থনীতি সংকটে পড়বে। এই সংকটের ফলে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাও ব্যাহত হবে এবং ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে। যুদ্ধের কারণে যদি বাণিজ্য ব্যাহত হয়, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগবে। এই যুদ্ধে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানের কারণে মুসলিম বিশ্বের ঐক্য ও পারস্পরিক সহযোগিতা দুর্বল হয়ে পড়বে, রাজনৈতিক বিভাজন বাড়বে সেটি নিঃসন্দেহে বলা যায় এবং সেই আগুনে ঘি ঢালবে বিশ্বের পরাশক্তিসমূহ।
যুদ্ধ কখনোই স্থায়ী সমাধান নয়– যুদ্ধের ফলে ধ্বংস, মৃত্যু এবং অস্থিরতা ছাড়া আর কিছুই আসে না। প্রতিটি যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো মানবিক বিপর্যয়। যুদ্ধ শুরু হলে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারাতে পারে এবং আরও বহু মানুষ আহত হয়, যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশের মানুষ নিরাপত্তাজনিত কারণে তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। যারা পালাতে পারে না সেসব মানুষ নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়। যুদ্ধের কারণে আশপাশের মুসলিম দেশগুলোতে বিপুল সংখ্যক শরণার্থী প্রবেশ করতে পারে। অনেক সময় শরণার্থীর কারণে আশ্রয়দাতা দেশগুলোর অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমনকি যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুদের মানসিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হয়। তারা ভয়, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করে। এর ফলে একটি প্রজন্ম তাদের স্বাভাবিক শিক্ষা ও উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়ে বিকলাঙ্গও হতে পারে।
সাম্রাজ্যবাদ এবং আগ্রাসী পরাশক্তি সমূহ কখনোই থেমে থাকে না তাদের একটি এজেন্ডা বাস্তবায়ন হলে তারা পরবর্তী এজেন্ডা ঠিক করে। সাম্প্রতিককালে দেখা গেছে সেই সাম্রাজ্যবাদের মূল থাবা মধ্যপ্রাচ্যের এবং মুসলমান বিশ্বের উপরেই পড়েছে। তারা কোনভাবেই মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে স্থিতিশীল হতে দিচ্ছে না। এমনকি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো পরাশক্তিগুলোর হাতের পুতুল হিসেবে কাজ করছে। এই যুদ্ধে ইরান যদি পরাজিত হয় তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী টার্গেট হবে সে সমস্ত দেশ যারা ইরানের পক্ষে কথা বলেছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে অথবা সামরিক হস্তক্ষেপ করে তাদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হবে। এই যুদ্ধ শুধু ইরান নয় পুরো মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি বড় সংকট সৃষ্টি করতে পারে। মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশ কূটনৈতিক চাপের মুখে পড়তে পারে এবং তাদের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বা রাজনৈতিক চাপের কারণেও অনেক দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক ক্ষতি, মানবিক বিপর্যয়, শরণার্থী সংকট এবং সামাজিক সমস্যার মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের উন্নয়ন ব্যাহত হতে পারে। তাই এই ধরনের সংঘাত এড়িয়ে চলা এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খোঁজা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ নয়, বরং শান্তি, সহযোগিতা এবং কূটনীতির মাধ্যমেই একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব। ইরান শুধু একা পরাজিত হবেনা–পরাজিত হবে মুসলিম বিশ্বও। যেহেতু এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের সাথে সম্পৃক্ত তাই তার অগ্রভাগে নিঃশ্চয় করে থাকবে মুসলিম রাষ্ট্রগুলো।
সুতরাং এই যুদ্ধে ইরানের পরাজয় হলে তার দায়ভার মুসলিম বিশ্বকেও নিতে হবে। তাই মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর উচিত কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করা, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, আঞ্চলিক সংগঠন এবং শান্তি প্রিয় দেশগুলোরও উচিত সংঘাত নিরসনে শান্তির জন্য সক্রিয় ভূমিকা পালন করা।
লেখক: ডেপুটি রেজিষ্ট্রার, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ












