অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, বিগত সময়ে সামষ্টিক অর্থনীতি ব্যবস্থাপনায় বিএনপি সরকার সফলতা দেখিয়েছে, এবারও সেই ধারা অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, ‘আসন্ন বাজেটে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়াবে সরকার।’ গত ২৫ এপ্রিল বিকেলে সচিবালয়ে মতবিনিময়সভায় তিনি এ কথা বলেন। অর্থমন্ত্রী জানান, সরকার উচ্চমাত্রার মুদ্রা সরবরাহ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি উসকে দিতে চায় না। বরং এমন নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে, যাতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং বেসরকারি খাতের ওপর চাপ না পড়ে। এটিই বর্তমান অর্থনৈতিক নীতির অন্যতম প্রধান নির্দেশনা। তিনি অভিযোগ করেন, অতীতে পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক রাজনীতির কারণে দেশের অর্থনীতি কিছু গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছিল। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে সরকার ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ’–এর ওপর জোর দিচ্ছে, যাতে অর্থনৈতিক সুফল সমাজের সব স্তরে পৌঁছায়। এ প্রসঙ্গে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, নারীর হাতে সরাসরি অর্থ পৌঁছালে তা পরিবারে সাশ্রয় ও বিনিয়োগে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) এবং স্টার্টআপ খাতকে গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, দেশে সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এসএমই খাত। পাশাপাশি গ্রামীণ কুটিরশিল্প, কারিগর ও সৃজনশীল শিল্পকে মূলধারায় আনতে কাজ করছে সরকার। এসব পণ্যের ডিজাইন, ব্র্যান্ডিং ও বিপণনে সহায়তা দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি খেলাধুলা, সংস্কৃতি, থিয়েটার, সিনেমা ও সংগীত খাতকেও অর্থনীতির অংশ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলার অভাব, মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বেসরকারি খাত চাপে রয়েছে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রত্যাশিত কর্মক্ষমতা দেখাতে পারছে না। ব্যবসা–বাণিজ্য ভালো না হলে কর আদায়ও বাড়ে না। তবে এ লক্ষ্য অর্জনে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, দক্ষতা উন্নয়ন ও কারিগরি শিক্ষায় জোর দেওয়া হচ্ছে, যাতে কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স বাড়ে। জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়ে আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক দশকে শিক্ষায় বরাদ্দের হার যেমন কমেছে, তেমনি কমেছে বাস্তবায়নের সক্ষমতাও। শুধু উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নয়, প্রয়োজন কার্যকর পরিকল্পনা ও জবাবদিহিতা। বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষায় বাজেট জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার ঘোষণা বাস্তবে রূপ নেবে কিনা, তা নির্ভর করছে বাস্তবায়নের দক্ষতা বাড়ানোর ওপর। অর্থবছর ২০১৬–১৭ থেকে ২০২৫–২৬। এক দশকে জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতের অংশ কমেছে প্রায় ১৪ শতাংশ থেকে নেমে ১২ শতাংশের ঘরে। জিডিপির অংশ হিসেবেও ব্যয় কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৫৩ শতাংশে, যা আগে ছিলো প্রায় ২ দশমিক ৪৯ শতাংশ। অথচ ইউনেস্কো সুপারিশ করে জিডিপির অন্তত ৪ থেকে ৬ শতাংশ শিক্ষায় ব্যয় করার। তবে বরাদ্দ যা–ই থাকুক, পুরোটা খরচই হচ্ছে না। প্রতিবছরই শিক্ষা বাজেটের একটি অংশ ফেরত যাচ্ছে। গবেষণা বলছে, সামপ্রতিক বছরগুলোতে বাজেট বাস্তবায়নে সক্ষমতার হার কমে প্রায় ৯৫ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ৮৭ শতাংশে। এর মধ্যেই নতুন পরিকল্পনায় শিক্ষাখাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বিএনপি সরকার। শিক্ষাবিদদের মতে, আগে বাস্তবায়নে দক্ষতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প কমিয়ে গুরুত্ব দিতে হবে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে। শিক্ষা গবেষক অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘একটি রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। তিন বছর, দুই বছর বা চার বছরে তারা জিডিপির ৫ শতাংশে পৌঁছাবেন। ইউটিলাইজ করতে হবে বরাদ্দ, যেটি দেয়া হবে তা যেন সুন্দর ও সুষম হয়। শিক্ষকের মান উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের রিডিং ম্যাটেরিয়েলের উন্নয়ন, শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন করতে হবে, আবার একই সঙ্গে বিল্ডিংও বানাতে হবে।’ শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। তবে সেটা রাতারাতি নয়, শিক্ষাপ্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলছেন, বাজেট ফেরত, অপচয় ও দুর্নীতি এ তিনটিকেই শক্তভাবে মনিটরিং করে ধীরে ধীরে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে শিক্ষার বাজেট। বিশেষজ্ঞরা বলেন, শিক্ষাখাতে আমাদের একটি সুশৃঙ্খল নীতি দরকার। ২০১০ সালের যে শিক্ষানীতি, এটাও কিন্তু বাস্তবায়ন হলো না। যা আছে সব কাগজে–কলমে, বাস্তবে এর কোনো প্রয়োগ কিংবা ব্যবহার নেই। সংকট মোচনের সবচেয়ে বড় উপায় হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছা। শিক্ষাখাতকে বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হিসেবে স্বীকার করতে হবে রাষ্ট্রকে এবং সে অনুযায়ী কাজ করতে হবে।










