চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনালের (এনসিটি) পর এবার চিটাগাং কন্টেনার টার্মিনাল (সিসিটি) পরিচালনার দায়িত্বও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরুর নির্দেশনাকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা–সমালোচনা চলছে। সৌদি আরবভিত্তিক রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনালকে (আরএসজিটিআই) সিসিটির অপারেটর হিসেবে নিয়োগের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে (সিপিএ) নির্দেশ দিয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। গত ২৮ সেপ্টেম্বর নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এই নির্দেশনা প্রদান করে চিঠি দিয়েছে। এর আগে ১ অক্টোবর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এনসিটি ও এর ওভারফ্লো কন্টেনার ইয়ার্ড (ওসিওয়াই) ১৫ বছরের জন্য আন্তর্জাতিক অপারেটরের মাধ্যমে পরিচালনার খসড়া কনসেশন চুক্তিতে নীতিগত অনুমোদন দেয়। এনসিটিতে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের ব্যাপারে আন্দোলন চলছে। এর মাঝে নতুন করে দুটি গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরকে দেওয়া নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। সূত্র জানিয়েছে, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ২৮ সেপ্টেম্বরের চিঠিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ‘সিসিটি ও জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি)’ এবং ‘বে পোর্ট–মাল্টিপারপাস টার্মিনাল’ প্রকল্প পিপিপি পদ্ধতিতে বাস্তবায়নে আরএসজিটিআইয়ের আগ্রহের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়ার খবরে বন্দরের শ্রমিক–কর্মচারীসহ বন্দর রক্ষা কমিটি এবং স্কপ তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে।
বর্তমানে সিসিটি পরিচালনা করছে দেশীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড। চলতি বছরের প্রথম দিকে সিসিটি পরিচালনায় বিদেশি ও দেশীয় একাধিক প্রতিষ্ঠান আগ্রহ প্রকাশ করে। এর মধ্যে দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ড ৮ এপ্রিল এবং আরএসজিটিআই ২২ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব দাখিল করে। দেশীয় শিল্পগোষ্ঠী এমজিএইচ গ্রুপও সিসিটি পরিচালনা ও আধুনিকায়নের প্রস্তাব দিয়েছিল। আরএসজিটিআই চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল (পিসিটি) পরিচালনা করছে। ফলে সিসিটির অপারেটর হিসেবেও প্রতিষ্ঠানটি নিয়োগ পেলে একই বিদেশি অপারেটরের হাতে বন্দরের দুটি গুরুত্বপূর্ণ কন্টেনার টার্মিনাল পরিচালিত হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে মোট ৩৪ লাখ ৯ হাজার ৬৯ টিইইউএস কন্টেনার হ্যান্ডলিং হয়েছে। এর মধ্যে এনসিটিতে হ্যান্ডলিং হয়েছে ১৩ লাখ ২১ হাজার টিইইউএস, জিসিবিতে ১০ লাখ ৮৩ হাজার টিইইউএস, সিসিটিতে ৪ লাখ ৮৩ হাজার টিইইউএস এবং পিসিটিতে ১ লাখ ৫৩ হাজার টিইইউএস।
জানা যায়, জিসিবি মূলত সাধারণ কার্গো বার্থ। এখানে কন্টেনারবাহী জাহাজের পাশাপাশি সাধারণ ও বাল্ক পণ্যবাহী জাহাজও হ্যান্ডলিং করা হয়। চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যমান চারটি বড় টার্মিনালের মধ্যে এনসিটি ও সিসিটি কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ের জন্য ডেডিকেটেড। পিসিটি নতুন কন্টেনার টার্মিনাল এবং জিসিবি কন্টেনার এবং বাল্ক কার্গো হ্যান্ডলিং করে।
২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কন্টেনারের এনসিটি প্রায় ৩৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং সিসিটি প্রায় ১৪ দশমিক ২ শতাংশ হ্যান্ডলিং করে। দুটি মিলে প্রায় ৫৩ শতাংশ কন্টেনার হ্যান্ডলিং করেছে। পিপিপি কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল একটি সূত্রের বরাত দিয়ে সূত্র বলেছে, সরকার–টু–সরকার (জিটুজি) ব্যবস্থায় দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটির আধুনিকায়ন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। প্রকল্পটির অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির প্রথম নীতিগত অনুমোদন হয় ২০২৩ সালের ২৩ মার্চ। প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ২০৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং চুক্তির শর্ত এবং লেনদেনের হিসেব–নিকেশ তৈরিতে আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্স কর্পোরেশন (আইএফসি) উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছে।
১ অক্টোবর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এনসিটি ও ওসিওয়াই পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক অপারেটরের সঙ্গে ১৫ বছরের কনসেশন চুক্তির খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। বর্তমানে এনসিটি পরিচালনা করছে নৌবাহিনীর মালিকানাধীন চট্টগ্রাম ড্রাইডক কোম্পানি লিমিটেড। এনসিটি ২০২৫ সালে প্রায় ১৩ লাখ ২১ হাজার টিইইউএস কন্টেনার হ্যান্ডলিং করেছে। বছরজুড়ে ড্রাইডক কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রে বেশ কিছু রেকর্ডও করেছে।
অন্যদিকে জিসিবি নিয়ে আরএসজিটিআইয়ের আগ্রহ এখনো একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে উল্লেখ করে বন্দরের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, এটি এখনো প্রস্তাবের পর্যায়ে। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে প্রতিষ্ঠানটি জিসিবি ও সিসিটি আধুনিকায়ন এবং পরিচালনার আগ্রহ প্রকাশ করে। সে সময় প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ ৬০০ মিলিয়ন ডলার। মন্ত্রণালয়ের যে চিঠি নিয়ে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে সেটিতে জিসিবি ও বে পোর্ট–মাল্টিপারপাস টার্মিনাল প্রকল্পেও আরএসজিটিআইয়ের আগ্রহের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বছর দুয়েক আগে শুরু হয়েছে উল্লেখ করে সূত্র বলেছে, সৌদি আরবের আরএসজিটিআই ২০২৪ সালে চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল (পিসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। শুরুতে তারা খুব একটা সুবিধা করতে না পারলেও কী গ্যান্ট্রি ক্রেন স্থাপনের পর কার্যক্রমে গতি তৈরি হয়েছে। এনসিটির ক্ষেত্রে ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাবিত কনসেশন চুক্তি এবং সিসিটির ক্ষেত্রে আরএসজিটিআইয়ের নিয়োগ–প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হলে বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ কন্টেনার টার্মিনালগুলো বিদেশি অপারেটরের হাতে চলে যাবে।
এদিকে এনসিটি ও সিসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার উদ্যোগের বিরোধিতা করেছে বন্দর রক্ষা কমিটি, স্কপসহ বিভিন্ন সংগঠন। গতকাল স্কপ মানববন্ধন করেছে। এর আগে শনিবার চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে বন্দর রক্ষা কমিটি এনসিটি ও ওভারফ্লো ইয়ার্ডের প্রস্তাবিত ১৫ বছরের কনসেশন চুক্তির প্রক্রিয়া বাতিল এবং সিসিটি ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ বন্ধের দাবি জানায়। দাবি মানা না হলে আজ সোমবার চট্টগ্রাম বন্দরের প্রধান গেটের সামনে দিনব্যাপী অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা দিয়েছে কমিটি। এনসিটি ও সিসিটি ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ বাতিলের বিষয়ে সুস্পষ্ট ঘোষণা না এলে অবস্থান কর্মসূচি থেকে পরবর্তী বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, চট্টগ্রাম বন্দর একটি লাভজনক এবং একইসাথে সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। গত বছরও এই বন্দর প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আয় করেছে। এমন একটি স্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালগুলো বিদেশি অপারেটরদের হাতে দিয়ে বন্দর বা দেশ কতটুকু লাভবান বা কীভাবে লাভবান হবে তা আগেভাগে স্পষ্ট করা দরকার। একদিকে এনসিটির ১৫ বছরের কনসেশন, অন্যদিকে সিসিটির জন্য আরএসজিটিআইকে নিয়োগের প্রক্রিয়া দুই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে বন্দরের প্রায় ৬০ শতাংশ কন্টেনার হ্যান্ডলিং দুই বিদেশি অপারেটরের ব্যবস্থাপনায় চলে যাবে। আর সিসিটির সঙ্গে জিসিবি ও বে পোর্ট–মাল্টিপারপাস টার্মিনালেও আরএসজিটিআইয়ের আগ্রহ বাস্তব রূপ পেলে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রায় পুরোটাই বিদেশি অপারেটরের হাতে চলে যাবে। ফলে শুধু টার্মিনাল পরিচালনার দক্ষতা বা বিনিয়োগ নয়, দীর্ঘমেয়াদি রাজস্ব, নিয়ন্ত্রণ কাঠামো, কর্মরত লোকবলের ভবিষ্যৎ, জাতীয় স্বার্থ এবং বন্দরের কৌশলগত ব্যবস্থাপনাসহ সবকিছু আগেভাগে পরিষ্কার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘদিন চট্টগ্রাম বন্দরের সাথে জড়িত, সাবেক বোর্ড সদস্য মোহাম্মদ জাফর আলম বলেন, নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনাল ১৫ বছরের জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডকে অপারেট করতে দেওয়ার সরকারের সিদ্ধান্তের পর অনেকে বলছেন, কৌশলগত বন্দর বিদেশিদের হাতে চলে গেল। আবার অনেকে বলছেন, এতে কোনো সমস্যা নেই। দুই পক্ষের কথা খতিয়ে দেখার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সার্বভৌমত্ব নিয়ে উদ্বেগ কি বাস্তবসম্মত? টার্মিনাল অপারেটর মূলত কন্টেনার ওঠানো–নামানো, ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনা ও ডেলিভারির সেবা দেয়। যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ তারাই করে, আর আয়ের একটি অংশ বন্দর কর্তৃপক্ষকে দেয়। কিন্তু কাস্টমস, নিরাপত্তা ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্তৃত্ব সরকারের হাতেই থাকে। জাহাজ কোন বার্থে ভিড়বে এবং আমদানি–রপ্তানির আইনি সিদ্ধান্ত বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সরকার নেয়। জমি, জলসীমা ও বন্দরের মালিকানা রাষ্ট্রের। মেয়াদ শেষে টার্মিনাল রাষ্ট্রের কাছে ফেরত আসে।
তিনি বলেন, ভারতের জওহরলাল নেহেরু পোর্টে (জেএনপিএ) টার্মিনালগুলো চালায় পিএসএ, এপিএম টার্মিনালস ও ডিপি ওয়ার্ল্ড। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে সেখানকার প্রায় ৮৯% কন্টেনার এসব আন্তর্জাতিক অপারেটরের টার্মিনালে হ্যান্ডল হয়েছে। চেন্নাইয়ের দুটি টার্মিনালও চালায় ডিপি ওয়ার্ল্ড ও পিএসএ। সিঙ্গাপুর, রটারডাম ও জেবেল আলীতেও আন্তর্জাতিক অপারেটররা কাজ করে। তবে যেসব প্রশ্ন করা সম্পূর্ণ ন্যায্য তা হচ্ছে, সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন না উঠলেও চুক্তির শর্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলা নাগরিকের অধিকার। দরপত্র প্রক্রিয়া কি স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক ছিল? কেন জিটুজি চুক্তির অধীনে নির্দিষ্ট অপারেটরের সাথে এই চুক্তি করা হলো? বন্দরের বিশাল বিনিয়োগ কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়? রাজস্ব ভাগাভাগি ও ট্যারিফ কাঠামো কি দেশের জন্য ন্যায্য? ১৫ বছরের মেয়াদ শেষে নবায়নের শর্ত কী? একটি কোম্পানির ওপর দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতার ঝুঁকি কীভাবে সামলানো হবে? স্থানীয় শ্রমিক–কর্মচারীদের চাকরি ও অধিকার কতটা সুরক্ষিত? কর্মদক্ষতার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে চুক্তি বাতিল বা জরিমানার ব্যবস্থা আছে কি?
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপারেটর আনা মানেই সার্বভৌমত্ব হারানো–এই বক্তব্য সঠিক নয়। কিন্তু ‘সব ঠিক আছে’ বলে প্রশ্ন থামিয়ে দেওয়াও ঠিক নয়। সরকারের উচিত চুক্তির মূল শর্তগুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করা, আর নাগরিকদের উচিত অপতথ্যের বদলে সেই তথ্য ধরে প্রশ্ন করা। স্বচ্ছতা থাকলে বিভ্রান্তি কমবে।












