আরো শতাধিক জনবল চায় ক্যান্সার ওয়ার্ড

রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম

আজাদী প্রতিবেদন | সোমবার , ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২২ at ৫:৫৩ পূর্বাহ্ণ

ক্রমবর্ধমান রোগীর চাপে দফায়-দফায় শয্যা ও সেবা বাড়লেও জনবলের পদ আর বাড়েনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ক্যান্সার ওয়ার্ডে। সীমিত জনবলে রোগীর এই চাপ সামলাতে যেন ত্রাহি অবস্থায় ওয়ার্ডের চিকিৎসক ও সংশ্ল্লিষ্টরা। এমন পরিস্থিতিতে ডাক্তার-নার্সসহ নতুন করে আরো শতাধিক জনবলের প্রস্তাবনা দিয়েছে ওয়ার্ডটি। হাসপাতাল প্রশাসনকে এ প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন ক্যান্সার ওয়ার্ডের প্রধান অধ্যাপক ডা. সাজ্জাদ মোহাম্মদ ইউসুফ। ডাক্তার-নার্স ও অন্যান্য স্টাফসহ সবমিলিয়ে নতুন করে শতাধিক জনবলের প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ওয়ার্ড সূত্রে জানা গেছে, ক্যান্সার চিকিৎসায় দীর্ঘ ৩ বছরেরও বেশি সময় রেডিওথেরাপি সেবা বন্ধ ছিল হাসপাতালের ক্যান্সার ওয়ার্ডে। যার ফলে এই রেডিওথেরাপি সেবা নিতে রাজধানী ঢাকা যাওয়া ছাড়া গত্যন্তর ছিল না বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিশাল সংখ্যক ক্যান্সার রোগীর। তবে ২০১৮ সালের ১৩ নভেম্বর বহু প্রতীক্ষিত নতুন রেডিওথেরাপি মেশিনের আনুষ্ঠানিক সেবা চালু হয় চমেক হাসপাতালের এই ক্যান্সার ওয়ার্ডে। মেশিনটির আনুষ্ঠানিক সেবা চালুর মাধ্যমে পুনরায় রেডিওথেরাপি সেবা পেয়ে আসছে চট্টগ্রামের ক্যান্সার রোগীরা।
অন্যদিকে, নারীদের জরায়ু ক্যান্সারের চিকিৎসায় প্রায় ৬ কোটি টাকা মূল্যের নতুন একটি ব্র্যাকি থেরাপি মেশিন পায় হাসপাতালের ক্যান্সার ওয়ার্ড। ২০১৫ সালের শেষ দিকে মেশিনটি ক্যান্সার (রেডিওথেরাপি) ওয়ার্ডে পৌঁছলেও নানা জটিলতায় সেটি চালু করা যায়নি। সব জটিলতা কাটিয়ে ২০১৯ সালের ২৩ এপ্রিল পরীক্ষামূলক ভাবে মেশিনটির সেবা চালু করা হয়। পরীক্ষামূলক সেবা চালুর কিছুদিনের মধ্যে মেশিনটির আনুষ্ঠানিক সেবা চালু হয়।
পুনরায় রেডিওথেরাপি সেবা এবং সম্পূর্ণ নতুন ব্রাকিথেরাপি সেবা চালুর পর থেকে রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে ক্যান্সার ওয়ার্ডে। বাড়তি রোগীর চাপ সামলাতে যেন ত্রাহি অবস্থায় ওয়ার্ডের চিকিৎসক ও সংশ্ল্লিষ্টরা। ওয়ার্ডের চিকিৎসকরা বলছেন, আগে ওয়ার্ডের আউটডোরে (বর্হিবিভাগে) দৈনিক ৫০/৬০ জন রোগী সেবা নিতেন। তবে নতুন রেডিওথেরাপি সেবা চালুর পর থেকে রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বেড়ে গেছে। দৈনিক কম হলেও ৮০ জন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী রেডিওথেরাপি সেবা পাচ্ছেন ওয়ার্ডে। আর মহিলাদের ব্র্যাকিথেরাপি সেবা দেয়া হয় সপ্তাহে দুদিন। এছাড়া সপ্তাহে ৬ দিন দেয়া হচ্ছে কেমোথেরাপি। ৭০ জনেরও বেশি রোগী প্রতিদিন আউটডোরে কেমোথেরাপি সেবা নেন। সবমিলিয়ে ওয়ার্ডের বর্হিবিভাগে বর্তমানে দৈনিক প্রায় দেড়শ রোগী সেবা গ্রহণ করেন বলে জানান ওয়ার্ডের চিকিৎসকরা। কেবল বর্হিবিভাগেই নয়, রোগীর চাপ বেড়েছে ইনডোরেও (আন্তঃবিভাগে)। চাপ সামলাতে ওয়ার্ডের

আন্তঃবিভাগে (ইনডোরে) আরো কিছু সংখ্যক শয্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় হাসপাতাল প্রশাসন ও ওয়ার্ড সংশ্ল্লিষ্টরা। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ওয়ার্ডটিতে নতুন ১১টি শয্যা যুক্ত করা হয়। এর আগ পর্যন্ত মোট ২৪টি শয্যা ছিল ওয়ার্ডের আন্তঃবিভাগে। নতুন ১১টিসহ ওয়ার্ডের শয্যা সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৫টিতে। তবে শয্যা সংখ্যা বাড়লেও সংকট রয়েই যায়। যার কারণে শয্যা না পেয়ে প্রতিদিনই অনেক রোগীকে ওয়ার্ড থেকে ফিরে যেতে হয়। এ নিয়ে দূর-দূরান্তের রোগীদের দুর্ভোগ- ভোগান্তিতে পড়তে হয় বেশি। রোগীদের দুর্ভোগ লাগবে চলতি বছর ওয়ার্ড থেকে আউটডোর সেবা সরিয়ে সেখানে নতুন করে দশটি শয্যা স্থাপন করা হয়েছে। নতুন দশ শয্যায় পুরুষ ও মহিলা রোগীর জন্য সমান সংখ্যক (৫টি করে) শয্যা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। নতুন দশ শয্যা যুক্ত হওয়ার পর ওয়ার্ডের মোট শয্যা সংখ্যা বর্তমানে ৪৫টিতে উন্নীত হয়েছে। মোট শয্যার মধ্যে ২৩ শয্যায় পুরুষ এবং ২২ শয্যায় মহিলা রোগী ভর্তি থেকে চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছেন।
ক্যান্সার ওয়ার্ডের সহকারী অধ্যাপক ডা. আলী আসগর চৌধুরী বলছেন, মানুষের জীবন-যাপনের অভ্যাস বা লাইফস্টাইলের কারণে ক্যান্সারের ঝুঁকি দিনদিন বাড়ছে। ইনডোর তো আছেই, আউটডোরেও রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। এই ব্যাধি থেকে বাঁচতে হলে এখনই সচেতন হতে হবে। অবশ্য, আগের তুলনায় মানুষের মাঝে সচেতনতা অনেক বেড়েছে জানিয়ে ডা. আলী আসগর বলেন, মানুষ সচেতন হওয়ার কারণেই হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে। আগে অনেকেই ঝাড়-ফুঁক কিংবা বৈদ্য-তাবিজ করে সময় ক্ষেপন করতেন। আর ডাক্তারের কাছে আসতেন শেষ পর্যায়ে। এখন পরিস্থিতি অনেকটা বদলেছে। আগে দৈনিক ৫০ থেকে ৬০ জন রোগী আউটডোরে চিকিৎসা সেবা নিলেও এখন প্রতিদিন প্রায় দেড়শ রোগী সেবা নেন। তবে ক্যান্সার নিয়ে মানুষকে আরো সচেতন হতে হবে বলেও মন্তব্য করেন এ চিকিৎসক।
বাড়েনি জনবল : রোগী, শয্যা, সেবা, সবকিছু বাড়লেও সেবাদানের মূল হাতিয়ার জনবল আর বাড়েনি ক্যান্সার ওয়ার্ডে। যদিও কয়েক বছর আগে নতুন অর্গানোগ্রাম (জনবল কাঠামো) তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও এ বিষয়ে ইতিবাচক কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ওয়ার্ড সূত্রে জানা গেছে, ১৮টি শয্যা দিয়ে ক্যান্সার ওয়ার্ডের সেবা চালু হয়। শুরুকালীন সময়ে ওয়ার্ডে মোট ৯টি পদ ছিল চিকিৎসকের। আর রেডিওথেরাপি মেশিন পরিচালনায় রেডিয়েশন টেকনিশিয়ানের পদ ছিল চারটি। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে শয্যা সংখ্যা বাড়িয়ে ২৪টি করা হয়। ২০১৯ সালের শেষ দিকে আরো ১১টি যুক্ত করে মোট শয্যা সংখ্যা ৩৫টি করা হয়। আর চলতি বছর (২০২২ সালে) আরো দশটি যুক্ত করে শয্যা সংখ্যা ৪৫টিতে উন্নীত করা হয়েছে।
রোগীর ক্রমবর্ধমান চাপে এভাবে দফায়-দফায় শয্যা সর্বোপরি সেবা বাড়লেও জনবলের পদ আর বাড়েনি। মূল পদের ৯ জনের বাইরে আরো কয়েকজন সংযুক্তসহ (অ্যাটাচমেন্ট) ১০ থেকে ১২ জন চিকিৎসক কর্মরত রয়েছেন ওয়ার্ডে। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসকের এ সংখ্যা খুবই অপ্রতুল বলে জানান বিভাগের প্রধান ডা. সাজ্জাদ মো. ইউসুফ। সূচারু রুপে চিকিৎসা সেবা প্রদানে ওয়ার্ডে অন্তত অর্ধশত চিকিৎসক প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
টেকনোলজিস্ট সংকটে থেরাপি সেবায় হিমশিম : চিকিৎসা সেবা চিকিৎসকরা দিলেও ক্যান্সারের রেডিওথেরাপি সেবা দিয়ে থাকেন রেডিয়েশন টেকনোলজিস্টরা। তাই চিকিৎসকের পাশাপাশি রেডিয়েশন টেকনোলজিস্টের এই পদ কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু ওয়ার্ডের শুরু থেকে রেডিয়েশন টেকনোলজিস্টের চারটি পদ এখনো অপরিবর্তিত।
ওয়ার্ডের তথ্য মতে, ক্যান্সারের থেরাপি প্রদানে দুটি মেশিন রয়েছে ক্যান্সার ওয়ার্ডে। একটি রেডিওথেরাপি (টেলিথেরাপি) এবং অপরটি মহিলাদের জরায়ু ক্যান্সারে ব্র্যাকিথেরাপি মেশিন। এই দুটি মেশিন পরিচালনায় রেডিয়েশন টেকনোলজিস্টের চারটি পদ থাকলেও সরকারি পর্যায়ে মাত্র একজন টেকনোলজিস্ট আছেন বলে জানান ক্যান্সার ওয়ার্ডের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. নাসির উদ্দিন শুভ। বাকি ৩টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। অবশ্য, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি উদ্যোগের পাশাপাশি আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগের মাধ্যমে বর্তমানে কয়েকজন টেকনোলজিস্ট কর্মরত আছেন। রেডিয়েশন টেকনোলজিস্ট সংকটকে ওয়ার্ডের সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন বিভাগের প্রধান ডা. সাজ্জাদ মো. ইউসুফ। তিনি বলেন, টেকনোলজিস্ট না থাকলে মেশিন চালানো সম্ভব নয়। আর মেশিন চালানো না গেলে এ অঞ্চলের বিশাল সংখ্যক ক্যান্সার রোগী এই থেরাপি সেবা থেকে বঞ্চিত হবেন। যাদের বেশির ভাগই গরীব ও অসহায়।
ওয়ার্ড সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সংকটের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সমাজ সেবা কার্যালয়ের সহায়তা ও ব্যক্তি সহায়তায় দুজন টেকনোলজিস্ট রাখা হয়েছে। এর মধ্যে হাসপাতাল সমাজসেবা কার্যালয় থেকে একজনের বেতন দেয়া হয়। দীর্ঘ দিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সাজ্জাদ মোহাম্মদ ইউসুফ নিজেও একজনের বেতন দিয়ে এসেছেন। এখন রেডিওথেরাপি এসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে একজনের বেতন পরিশোধ করা হয়। এর বাইরে হাসপাতাল প্রশাসনের পক্ষ থেকে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে দুজন টেকনোলজিস্ট নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সবমিলিয়ে সরকারি পর্যায়ে একজনসহ ৫ জন টেকনোলজিস্ট কর্মরত আছেন ওয়ার্ডে। যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল বলে জানান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. আলী আসগর চৌধুরী। ওয়ার্ডে অন্তত ৮ জন টেকনোলজিস্ট প্রয়োজন জানিয়ে ওয়ার্ড সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে ব্র্যাকিথেরাপি মেশিনটি অকেজো অবস্থায় রয়েছে। ব্র্যাকিথেরাপিও চালু হলে টেকনোলজিস্ট সংকট প্রকট হিসেবে দেখা দেবে।
নতুন প্রস্তাবনা : ক্যান্সার ওয়ার্ডের পক্ষ থেকে প্রদত্ত প্রস্তাবনায় দেখা যায়, চিকিৎসকদের বিদ্যমান ৯টি পদের বিপরীতে ৬২টি পদ সৃজনের কথা বলা হয়েছে। চিকিৎসকের প্রস্তাবিত পদগুলোর মধ্যে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক, আবাসিক সার্জন, রেজিস্ট্রার, সহকারী রেজিস্ট্রার, রেডিওথেরাপিস্ট, ইনডোর মেডিকেল অফিসার ও আউটডোর মেডিকেল অফিসারের পদ রাখা হয়েছে। বিদ্যমান ১০ জন নার্সের স্থলে ৩০ জন চাওয়া হয়েছে প্রস্তাবনায়। রেডিয়েশন টেকনোলজিস্টের বিদ্যমান ৪টি পদের স্থলে আরো ৪টি যুক্ত করে মোট ৮টি পদের প্রস্তাব করা হয়েছে। আগে না থাকলেও ওয়ার্ডে নতুন করে ফিজিস্টের ৬টি পদ প্রস্তাবনায় রাখা হয়েছে। এছাড়া কর্মচারী (এমএলএসএস ও সুইপার) পদে বিদ্যমান ৩টির স্থলে ৪০টি পদের প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে। সবমিলিয়ে ১৪৬টি পদ সৃজনের কথা বলা হয়েছে প্রস্তাবনায়।
হাসপাতাল প্রশাসনের বক্তব্য : টেকনোলজিস্ট সংকটের বিষয়ে হাসপাতাল প্রশাসন বলছে, কর্মচারি-টেকনোলজিস্ট নিয়োগের লক্ষ্যে মন্ত্রণালয় ২০১৮ সালে একটি নিয়োগ বিধি প্রণয়ন করেছে। ওই নিয়োগ বিধিতে ভুলে রেডিওথেরাপি বিভাগের টেকনোলজিস্টের বিষয়টি বাদ পড়ে গেছে। যার কারণে চাইলেও সরকারি পর্যায়ে ওখানে (রেডিওথেরাপি বিভাগে) টেকনোলজিস্ট নিয়োগ দেয়া যাচ্ছে না। যদিও বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে এবং মন্ত্রণালয় নিয়োগ বিধি সংশোধনে কাজ করছে। অবশ্য জনবল সংকটের কথা স্বীকার করে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শামীম আহসান আজাদীকে বলেন, অবশ্যই সংকট রয়েছে। তবে নিজেদের উদ্যোগে ম্যানেজ করে সেবা চালু রাখা হয়েছে। হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা সম্প্রতি ১৩১৩ থেকে ২২’শ শয্যায় উন্নীত হয়েছে জানিয়ে হাসপাতাল পরিচালক বলেন, শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষিতে আমরা ওয়ার্ডের জনবলেরও নতুন কাঠামো প্রস্তুত করছি। এর অংশ হিসেবে ওয়ার্ড থেকে নতুন প্রস্তাবনা পাঠানো হচ্ছে। নতুন জনবল কাঠামো প্রস্তুতের কাজ শেষ হলে সেটি আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে পাঠাবো।