নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা শুরু করতে বাংলাদেশে এসেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতিনিধি দল। ১২ সদস্যের এ মিশনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন আইএমএফের মুদ্রা ও পুঁজিবাজার বিভাগের ডেপুটি ডিভিশনের প্রধান ইভো ক্রজনার। গতকবাল রোববার সকালে তারা বাংলাদেশ ব্যাংকে গিয়ে ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান ও কবির আহাম্মদের সঙ্গে বৈঠকের মধ্য দিয়ে আলোচনার সূচনা করেন। সেখানে অধা ঘণ্টার মতো বৈঠক করে আইএমএফ প্রতিনিধি দল অর্থ মন্ত্রণালয়ে যায়। সেখানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে তাদের বৈঠক হয়। পরে বেলা দেড়টায় ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমানের সঙ্গে তারা বাংলাদেশ ব্যাংকে ফিরে আসেন। খবর বিডিনিউজের।
আইএমএফ প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকের পর অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘জনস্বার্থ ও দেশের অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করে আইএমএফের সাথে নতুন প্রোগ্রাম হবে। দেশের মানুষের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে আইএমএফের কোনো কর্মসূচিতে সরকার অংশ নেবে না।’ সরকারের এক তথ্য বিবরণীতে মন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, পূর্ববর্তী সরকারের নেওয়া আইএমএফ–এর আগের প্রোগ্রামটি ছিল সম্পূর্ণ জনস্বার্থবিরোধী। একটি নির্বাচিত সরকার হিসেবে বাংলাদেশের মানুষের এবং দেশের অর্থনীতির স্বার্থ সুরক্ষিত রাখাই আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘আজ (গতকাল) সকালে শুধু পরিচিতিমূলক সভা করেছে আইএমএফ। পরে বিভাগভিত্তিক মিটিং করবে তারা।’ এবারের সফরে অর্থ বিভাগ ছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংক, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে বৈঠক করবে আইএমএফের প্রতিনিধিদল। আর্থিক খাতের সংস্কার প্রসঙ্গ ছাড়াও এবারের আলোচনায় থাকবে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট। করছাড়ের যৌক্তিকতা, রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের কৌশল, নতুন সংস্কারের রূপরেখা ও কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামোর বিষয়টিও আলোচ্যসূচিতে থাকবে।
ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের নেওয়া ঋণ কর্মসূচি থেকে বের হয়ে এসে নতুন কর্মসূচির আওতায় ঋণ চেয়ে গত জুন মাসে আবেদন করে বাংলাদেশ। সরকার নতুন কর্মসূচির আওতায় তিন বছরের জন্য ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ পাওয়ার আশা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থমন্ত্রী একাধিকবার বলেছিলেন, আগের ঋণ কর্মসূচি নেওয়ার সময়ের অর্থনৈতিক ও নীতিগত বাস্তবতা বদলে গেছে।
রাজনৈতিক পালাবদল, অর্থনীতির নীতিগত কাঠামো পরিবর্তন, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও নতুন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কারণে কিছু সংস্কার নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি, যা নতুন করে বাস্তবায়নের কথা ভাবছে সরকার। ঢাকা সফর শেষে প্রতিনিধি দল ওয়াশিংটনে তাদের মূল্যায়ন প্রতিবেদন জমা দেবে। প্রতিবেদন ইতিবাচক হলে আগামী অক্টোবরের বার্ষিক সভার পর চূড়ান্ত আলোচনার জন্য আরেকটি দল আসবে এবং সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে এই নতুন ঋণ ছাড় শুরু হতে পারে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আর্থিক সংকট সামাল দিতে কয়েক দফা আলোচনা শেষে ২০২৩ সালের প্রথম দিকে আইএমএফের সঙ্গে ৪৭০ কোটি (৪.৭০ বিলিয়ন) ডলারের ঋণ চুক্তি করে বাংলাদেশ। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের জুনে ঋণের অর্থ ৮০ কোটি ডলার বাড়িয়ে নিলে মোট ঋণের আকার ৫৫০ কোটি (৫.৫০ বিলিয়ন) ডলার হয়। এর মধ্যে পাঁচ কিস্তিতে ৩৬৪ কোটি ডলার হাতে পেয়েছে বাংলাদেশ। বাকি আছে ১৮৬ কোটি ডলার। ষষ্ঠ কিস্তি ও অবশিষ্ট অর্থ ছাড়ের সময় ছিল গত বছরের ডিসেম্বর। তখন আইএমএফ জানায়, ঋণের অবশিষ্ট অর্থ ছাড় করা হবে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে। সেই অর্থ ছাড়ের আগে এখন ঋণের শর্ত বাস্তবায়নে অগ্রগতি দেখতে চায় আইএমএফ। তবে রাজস্ব আদায়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তা বাস্তবায়ন হয়নি।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় আইএমএফের কাছ থেকে নতুন করে ২ বিলিয়ন ডলার চাওয়ার পরিকল্পনা করে। কিন্তু আইএমএফের শর্ত মেনে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সংস্কারের যেসব উদ্যোগে ছিল, সেখান থেকে সরকার খানিকটা সরে আসে। এ পরিস্থিতিতে চলমান ঋণ চুক্তির বাকি অর্থ ছাড়ে আইএমএফের অনাগ্রহের খবর আসে। অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদল যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফের সর্বশেষ বার্ষিক সভায় অংশ নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা করলেও সাফল্য মেলেনি। তবে গেল ১৮ এপ্রিল অর্থমন্ত্রী দাবি করেন, ঋণ কর্মসূচি চালিয়ে নিতে আইএমএফের ‘ইতিবাচক’ মনোভাব রয়েছে।
গত ১১ মে অর্থমন্ত্রী প্রকাশ্যেই বলেন, আইএমএফ ঋণ চুক্তির আওতায় যেসব শর্ত জুড়ে দিচ্ছে, তা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ‘উপযুক্ত’ নয়। তার ভাষ্য ছিল, জনগণের প্রতি ‘দায়বদ্ধতা’ থেকে সরকার আইএমএফের সব কথা মানতে পারবে না। ওই বক্তব্যের দুই সপ্তাহ পর গত ২৫ মে অর্থ মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত ২১ মে আইএমএফের উপ–ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্কের সঙ্গে এক ভার্চুয়াল বৈঠকে নতুন ঋণ–কর্মসূচি শুরুর আগ্রহ প্রকাশ করলে আইএমএফ কর্মকর্তা সে উদ্যোগকে স্বাগত জানান।












