১৪ বছরে সর্বনিম্ন পাসের হার, নেপথ্যে ইংরেজি ও আইসিটি

চট্টগ্রাম বোর্ডে এইচএসসিতে পাস ৫২ দশমিক ০৭ শতাংশ । তিন পার্বত্য জেলায় কম পাস করাও ফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ । জিপিএ-৫ পেয়েছে পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম ২ হাজার ৯২৯ জন । পাসের হার বিজ্ঞান বিভাগে বেশি, মানবিকে কম, এগিয়ে মেয়েরা

মোরশেদ তালুকদার | রবিবার , ১ নভেম্বর, ২০২৬ at ৬:১৪ পূর্বাহ্ণ

পাসের হার ও জিপিএ–৫; দুটোয় কমেছে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষায়। এবার পাসের হার ৫২ দশমিক ০৭ শতাংশ, যা গত ১৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এছাড়া সর্বশেষ পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম ২ হাজার ৯২৯ জন পরীক্ষার্থী জিপিএ–৫ পেয়েছে এবার। ইংরেজি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে অকৃতকার্যের হার বৃদ্ধি এবং তিন পার্বত্য জেলায় পাসের কম হওয়ায় চট্টগ্রাম বোর্ডের সামগ্রিক ফলাফল বিপর্যয়ে অন্যতম কারণ। এর বাইরে দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেয়া ও রুবিক্স পদ্ধতিতে মূল্যায়ন, পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা নেয়া এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পরীক্ষার মাঝখানে বিরতিও প্রভাব ফেলেছে।

চলতি বছর এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হয় গত ২ জুলাই। গতকাল শনিবার সকাল ১১টায় বোর্ড মিলনায়তনে বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. মো. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী ফলাফল ঘোষণা করেন। একইদিন দেশের আরো ৮টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডেরও ফলাফল ঘোষণা করা হয়। মোট ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে পাসের হারে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে চট্টগ্রাম। পাসের হার ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ–এ সবচেয়ে এগিয়ে আছে ঢাকা বোর্ড।

গতকাল প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বোর্ডে এবার ২৮৩ কলেজের মোট পরীক্ষার্থী ছিল ৯৯ হাজার ৮৭৯ জন। এর মধ্যে উর্ত্তীণ হয় ৫০ হাজার ১৬৬ জন। অর্থাৎ পাসের হার ৫২ দশমিক ০৭ শতাংশ। যা গতবার ছিল ৫২ দশমিক ৫৭ শতাংশ। এবার ২২ হাজার ১১৪ পরীক্ষার্থী এক বিষয়ে ফেল করেছে।

এবার ৩ হাজার ৫৪৪ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল। বহিষ্কার করা হয় একজনকে। পরীক্ষা কেন্দ্র ছিল ১১৪ টি। তিনটি কলেজের কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি। ৬টি কলেজের সব পরীক্ষার্থী পাস করেছে।

এবার উত্তীর্ণদের মধ্যে ৪৭ দশমিক ৬২ শতাংশ ছাত্র ও ৫৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ ছাত্রী। এছাড়া ১ হাজার ৫৯৬ জন ছাত্রী ও ১ হাজার ৩৩৩ জন ছাত্র জিপিএ–৫ পেয়েছে। অর্থাৎ পাসের হার ও জিপিএ–৫ পাওয়ার ক্ষেত্রে ছেলেদের চেয়ে এগিয়ে আছে মেয়েরা। এবার মোট জিপিএ–৫ পেয়েছে ২ হাজার ৯২৯ জন। গতবার (২০২৫) পেয়েছে ৬ হাজার ৯৭ জন।

যে কারণে ফলাফল বিপর্যয় : সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইংরেজি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে অকৃতকার্যের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ইংরেজিতে ৩৪ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে ২৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ পরীক্ষার্থী ফেল করেছে। যা বোর্ডের গড় ফলাফল কমে যাওয়ার জন্য দায়ি।

ইংরেজি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আবশ্যিক সাবজেক্ট। ২৬ হাজার ৫৯৭ জন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে এবং ৩৪ হাজার ১৭৭ জন পরীক্ষার্থী ইংরেজিতে ফেল করেছে।

ইংরেজি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে বেশি ফেল করা প্রসঙ্গে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. মো. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ে ফেলের হার একটু বেশি হয়েছে। অনেক কলেজে আইসিটি বিষয়ে কোনো শিক্ষক নেই। শিক্ষার্থীরা নিজেরাই যতটুকু পারে পড়াশোনা করে পরীক্ষা দিচ্ছে। এটা একটা বড় সমস্যা। অনেক কলেজে আইসিটিতে খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে পড়াশোনা করাচ্ছে। আর ইংরেজিতে ১২ বছর পড়াশোনা করার পরও আমরা এখনো অনেক দুর্বল। ইংরেজিতে পারদর্শিতার অভাব আছে।

এদিকে বোর্ডের আওতাধীন খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলায় পাসের হার গতবারের চেয়ে উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে এবার। সেটাও সামগ্রিক ফলাফল বিপর্যয়ে প্রভাব ফেলেছে। রাঙামাটি জেলায় এবার পাসের হার হচ্ছে ৩৩ দশমিক ২৪ শতাংশ, যা গতবার ছিল ৪১ দশমিক ২৪ শতাংশ। খাগড়াছড়িতে পাসের হার ২৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ, যা গতবার ছিল ৩৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ। বান্দবারবানে পাসের হার হার হচ্ছে ৪১ দশমিক ৪২ শতাংশ। তিন পার্বত্য জেলার বাইরে চট্টগ্রাম মহানগরে পাসের হার ৬৬ দশমিক ২০ শতাংশ এবং মহানগর বাদে জেলায় পাশের পার হচ্ছে ৪৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ।

এদিকে এবার সব বোর্ডের প্রশ্নপত্র ছিল অভিন্ন। তাই ফলাফলে সমতা নিশ্চিতে খাতার মূল্যায়ন করা হয়েছে ‘রুবিঙ’ পদ্ধতিতে। এ পদ্ধতিতে পূর্বের মত ঢালাওভাবে বা বাড়তি নম্বর দেয়ার সুযোগ ছিল না। অবশ্য কোন প্রশ্নে কতটুকু লিখলে কত নম্বর দেয়া যাবে তা পূর্ব নির্ধারণ করা ছিল। এক্ষেত্রে জ্ঞানমূলক, অনুধবানমূলক, প্রয়োগ ও উচ্চতর দক্ষতা; চারটি ধাপে প্রশ্নের উত্তর লেখার সময় শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হয়। ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে না পারলে কমে যায় নম্বর। চট্টগ্রামসহ সারা দেশে ফল বির্পযের জন্য এটাও একটা কারণ।

এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এবার পরীক্ষার মাঝখানে দীর্ঘ বিরতি ছিল। এতে পড়ার প্রতি মনোযোগ কিছুটা নষ্ট হয়েছে পরীক্ষার্থীদের। বিরতির পর আবারো পড়ার টেবিলমুখি হতে শিক্ষার্থীদের কিছুটা সময় লেগেছে। পরীক্ষায় আশানুরুপ ফলাফল না হওয়ার জন্য এটাও একটা ক্ষুদ্র কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাছাড়া ২০১৯ সালের পর এবার পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা নেয়া হয়েছে, এর কিছুটা প্রভাব পড়েছে পরীক্ষার্থীদের উপর।

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. মো. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, আমাদের পাসের হার গতবারের কাছাকাছি। এবার অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হয়েছে এবং অভিন্ন পদ্ধতিতে মূল্যায়ন হয়েছে। তাই মূল্যায়ন যথাযথ হয়েছে। সেকারণে হয় এ বছর জিপিএ–৫ অনেক কমেছে। এছাড়া প্রতিটি কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা ছিল। তাই শুরুর দুয়েকটি পরীক্ষায় পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ভয়ভীতি কাজ করতে পারে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কিছুদিন বন্ধ ছিল পরীক্ষা। হয়ত পড়ার টেবিলে ফিরতে একটু সময় লেগেছে। এটাও একটা কারণ হতে পারে।

বোর্ড সচিব অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন বলেন, ২০২০ সালে নতুন সিলেবাস ঘোষণার পর এবার প্রথম পূর্ণ সিলেবাসে পড়ে পরীক্ষা দিয়েছে। করোনাসহ নানা কারণে নতুন কারিকুলাম পাঠদান সম্পন্ন করল। এই পরীক্ষার্থীরা বিশাল চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করেছে। জিপিএ–৫ কেন অনেক কমল এটা গবেষণার বিষয়। বোর্ড থেকে প্রকৃত কারণ দ্রুত বের করব। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অনেক পরীক্ষা পরে নিতে হয়েছে। কী ঘটেছে সেটা গবেষণার দাবি রাখে।

বিজ্ঞানে এগিয়ে, মানবিকে পিছিয়ে : চট্টগ্রাম বোর্ডে সবচেয়ে বেশি বিজ্ঞান বিভাগের ৭৪ দশমিক ৪২ শতাংশ পরীক্ষার্থী পাস করেছে। সবচেয়ে কম ৩৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ পরীক্ষা পাস করেছে মানবিক বিভাগ থেকে। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের ৫৪ দশমিক ১৪ শতাংশ পরীক্ষার্থী পাস করেছে। ১১ হাজার ২৬৭ জন ছাত্র ও ১২ হাজার ৬৬২ জন ছাত্রী বিজ্ঞান বিভাগের পরীক্ষার্থী ছিল। মানবিক বিভাগের ১৬ হাজার ৪০১ জন ছাত্র ও ২৭ হাজার ৯৩৬ জন ছাত্রী ছিল পরীক্ষার্থী। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ১৫ হাজার ৬৩৬ জন ছাত্র ও ১৫ হাজার ৯৭৭ জন ছাত্রী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধএইচএসসিতে এক-দুই বিষয়ে অকৃতকার্যদের এক মাসের মধ্যে পুনঃপরীক্ষা : শিক্ষামন্ত্রী
পরবর্তী নিবন্ধকৌতুক কণিকা