রাত ১টা। আইসিইউতে শুরু হয় ২১ বছরের এক তরুণীর জীবন বাঁচানোর কঠিন লড়াই। ডেঙ্গু নিয়ে কেবিনে ভর্তি রোগীর অসুস্থতার ষষ্ঠ দিন হঠাৎ শুরু হয় শ্বাসকষ্ট, কমতে থাকে রক্তচাপ। ৬ দিন মৃত্যুর সাথে লড়াইয়ের পর তাকে নতুন জীবন দিয়েছেন চিকিৎসক। সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছাড়ার আগে এক টুকরো টিস্যু পেপারে সেই তরুণী লিখে গেছে চিকিৎসকের প্রতি কৃতজ্ঞতার কথা, চেয়েছে অসংযত আচরণের জন্য ক্ষমা। যার উদ্দেশ্যে এই চিঠি লেখা–তিনি ডা. মোহাম্মদ আমিন। কর্মরত আছেন চট্টগ্রাম পার্কভিউ হাসপাতালের আইসিইউতে। খবর বাংলানিউজের।
জানা যায়, রোগী গত ১৯ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর রাত ১টার দিকে তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। ২০ সেপ্টেম্বর থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৫ দিন সেখানে ডা. মোহাম্মদ আমিনের তত্ত্বাবধানে ছিল। প্রথমদিন রাতে তার সঙ্গে ডিউটিতে ছিলেন কনসালটেন্ট ডা. শাহাদাত হোসাইন। স্বজনদের কাছ থেকে সংক্ষিপ্ত ইতিহাস নেওয়ার পর রোগীর অবস্থা মূল্যায়ন করা হলো। তখনও হয়তো কেউ বুঝতে পারেননি, সামনের কয়েকটি দিন চিকিৎসকদের জন্য কতটা কঠিন হতে যাচ্ছে। ডা. মোহাম্মদ আমিনের বর্ণনায়, ২০ সেপ্টেম্বর পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হচ্ছিল। রক্তচাপ কমছে, অক্সিজেনের চাহিদা বাড়ছে। শুধু ফ্লুইড দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছিল না। রোগীর শরীরে জমতে শুরু করলো তরল। দেখা দিল বাইলেটারাল প্ল্যুরাল ইফিউশন (ফুসফুসে পানি জমা) ও অ্যাসাইটিস (উদরস্ফীতি)। ফুসফুসের কার্যক্ষমতাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে থাকল, তৈরি হলো একিউট রেসপিরেটরি ডিসট্রেস সিনড্রোম (তীব্র শ্বাসকষ্টজনিত রোগ)। রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছিলেন কনসালটেন্ট ডা. জিতু দাশ গুপ্ত। রোগীর তখন প্রতি মিনিটে ৭০ লিটার অক্সিজেন প্রয়োজন হচ্ছিল। নন–ইনভেসিভ ভেন্টিলেশন দিয়েও রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা ৯১–৯২ শতাংশের আশপাশে থাকছিল। সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত–এবার কি ইনটিউবেশন করে লাইফ সাপোর্টে নিতে হবে?
ডা. জিতু বললেন, রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে সম্ভাব্য মেকানিক্যাল ভেন্টিলেশনের বিষয়টি বুঝিয়ে অনুমতি নিয়ে রাখতে। ডা. আমিন তাদের সঙ্গে কথা বললেন। রোগীর অবস্থা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি ব্যাখ্যা করলেন। তারা সম্মতি দিলেন। কিন্তু তখনই হাল ছাড়তে চাননি চিকিৎসকরা। নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখলেন রোগীকে। ধীরে ধীরে রোগীর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বিকল হতে শুরু করলো। রোগীর ওষুধের মাত্রা পরিবর্তন করা হলো। প্রতিটি মিনিট তখন গুরুত্বপূর্ণ। মনিটরের সংখ্যাগুলোর দিকে চোখ রেখে চলছিল পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসা।
এরই মধ্যে সামনে এল আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ–রক্তচাপ। ফ্লুইড ম্যানেজমেন্টের পরও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছিল না। একে একে নর–এপিনেফ্রিন, অ্যাড্রেনালিন ও ভ্যাসোপ্রেসিন–তিনটি শক্তিশালী রক্তনালী সক্রিয়কারী ওষুধ প্রয়োজন হলো। তবু একপর্যায়ে রক্তচাপ এতটাই নেমে গেল যে তা মাপাই সম্ভব হচ্ছিল না। অন্যদিকে, রোগীর প্লেটলেট কাউন্ট ক্রমাগত কমতে কমতে নেমে আসে প্রতি মাইক্রোলিটারে ৭ হাজারে। রক্তচাপ বাড়ানোর ওষুধ যথাযথভাবে দেওয়ার জন্য জরুরি ভিত্তিতে শিরায় ক্যাথেটার বসানো প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এত কম প্লেটলেটে প্রক্রিয়াটির সঙ্গে রক্তক্ষরণের ঝুঁকিও ছিল বেশি।
রোগীর সংকটাপন্ন অবস্থা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে সতর্কতার সঙ্গে কেন্দ্রীয় শিরায় ক্যাথেটার প্রবেশ করানোর সিদ্ধান্ত নেন ডা. মোহাম্মদ আমিন। তখন রোগীর গ্লাসগো কোমা স্কেল ছিল ১৫/১৫, সম্পূর্ণ সচেতন। প্রসিডিউরের আগে তাকে সাহস দেওয়া হলো, বোঝানো হলো। হঠাৎ ভীত কণ্ঠে রোগী বললো-‘আমি কি মারা যাব? আমার খুব ভয় করছে’।
ডা. মোহাম্মদ আমিন তাকে আশ্বস্ত করে বললেন, ‘ভয় পেয়ো না, আমরা সবাই তোমার পাশে আছি। তুমি শুধু এক থেকে পঞ্চাশ পর্যন্ত গুনতে থাকো। এর মধ্যেই তোমার সিভি লাইন হয়ে যাবে’। রোগী এক, দুই, তিন করে গুনতে শুরু করল। এসময়ে সম্পন্ন হয় জরুরি প্রক্রিয়াটি, হয়নি কোনো রক্তক্ষরণ। এরপর প্রয়োজনীয় রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণকারী তরল ওষুধের মাধ্যমে রক্তচাপ স্থিতিশীল করার চেষ্টা চললো। কিন্তু রোগীর জীবন বাঁচানোর লড়াই তখনও শেষ হয়নি।
২১ সেপ্টেম্বর রোগীর অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ কমেনি। অক্সিজেনের চাহিদা ও রক্তচাপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হচ্ছিল। তবে এদিন অক্সিজেনের চাহিদায় কিছুটা স্বস্তিদায়ক পরিবর্তন চোখে পড়ছিল চিকিৎসকদের। ২২ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টা থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টা পর্যন্ত সময়ে রোগীর অবস্থার ধীরে ধীরে উন্নতি হতে থাকে। অঙিজেনের চাহিদা কমতে থাকে, রক্তচাপও আগের তুলনায় স্থিতিশীল হতে শুরু করে। ২৩ সেপ্টেম্বর সকালে রোগীর মুখ থেকে নন ইনভেসিভ ভেন্টিলেশনের মাস্ক সরিয়ে নন–রিব্রেদার মাস্কের মাধ্যমে অক্সিজেন দেওয়া হয়। এদিনই রোগীকে আইসিইউ থেকে কেবিনে স্থানান্তর করা হয়। সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন আইসিইউ ইন–চার্জ অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ডা. সাজ্জাদ হোসেন। এ ছাড়াও বিভিন্ন শিফটে আইসিইউ কনসালটেন্ট, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় রোগী ফিরে আসে মৃত্যুর মুখ থেকে।
ডা. মোহাম্মদ আমিন জানান, আইসিইউতে প্রতিটি রাতই অনিশ্চয়তার। মনিটরের প্রতিটি পরিবর্তন, সিদ্ধান্ত আর রোগীর পাশে কাটানো দীর্ঘ সময়ের পেছনে থাকে একটি দলের সম্মিলিত চেষ্টা–একটি জীবনকে আরেকটি সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা। চিকিৎসা চলাকালীন সময়ে তরুণী রোগী কখনো অস্থির হয়ে পড়তো, আমাদের ভুল বুঝতো, এমনকি নিজের টিউব ও ক্যানুলা খুলে ফেলার চেষ্টাও করত। আমরা বারবার তাকে বুঝিয়েছি, কাউন্সেলিং করেছি, আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছি। রোগীর নিরাপত্তার স্বার্থে যথাযথ পর্যবেক্ষণের মধ্যে একপর্যায়ে সাময়িকভাবে তার হাতের নড়াচড়া সীমিত রাখারও প্রয়োজন হয়েছিল।
রোগী সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পাওয়ার পর ঘটলো আরেক ঘটনা। বাড়ি ফেরার সময় ডা. মোহাম্মদ আমিনের সঙ্গে দেখা হয়নি তার। তাই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে টিস্যু পেপারে লেখা চিঠি রেখে গেল। আইসিইউ’র নার্স জানালেন, ১১ নম্বর বেডের রোগী এই চিঠি রেখে গেছে। সে লিখেছে, ‘আমি আপনার সাথে অনেক জোরে চিল্লিয়ে কথা বলেছি নিজের অজান্তে। আপনাকে সরাসরি সরি বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পাইনি। আমি বুঝতে পেরেছি–আপনারা সবাই আমার ভালো চেয়েছিলেন। মাফ করে দিয়েন স্যার–মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে’।
ডা. মোহাম্মদ আমিন বলেন, একটি টিস্যু পেপারে হাতে লেখা কিছু শব্দ। তাতে ছিল আন্তরিক কৃতজ্ঞতা, নিজের আচরণের জন্য দুঃখ প্রকাশ এবং আমাদের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান। উপলব্ধি করলাম, চিকিৎসকের জীবনের সব প্রাপ্তি অর্থ, পদবি কিংবা পেশাগত সাফল্যে মাপা যায় না। কখনো কখনো রোগীর হৃদয় থেকে উঠে আসা কয়েকটি শব্দই রাতজাগা পরিশ্রমের সবচেয়ে সুন্দর স্বীকৃতি হয়ে ওঠে।












