হরমুজের পর মালাক্কা প্রণালি নিয়ে নতুন শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ নৌপথ। দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার এই প্রণালি সরাসরি দক্ষিণ চীন সাগরের সঙ্গে যুক্ত এবং এর মধ্য দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক–তৃতীয়াংশ বাণিজ্য পরিচালিত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ যেখানে মূলত জ্বালানি পরিবহনের রুট, সেখানে মালাক্কা প্রণালি বহুমাত্রিক। জ্বালানি ছাড়াও ইলেকট্রনিকস, গাড়ি, শিল্পপণ্য ও খাদ্যশস্য পরিবহনের প্রধান করিডর এটি। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ৩২ লাখ ব্যারেল তেল এবং বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবহন হয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশ।
প্রণালিটির সবচেয়ে সরু অংশ ফিলিপস চ্যানেল এলাকায় মাত্র ২.৮ কিলোমিটার, যা এটিকে একটি কৌশলগত ‘চোকপয়েন্ট’–এ পরিণত করেছে। ফলে কোনো সামান্য বিঘ্নও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সমপ্রতি যুক্তরাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়ার আকাশসীমা ব্যবহার করে সামরিক উড়োজাহাজ চলাচলের প্রস্তাব দেওয়ায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এ নিয়ে ইন্দোনেশিয়া এখনো সিদ্ধান্ত না জানালেও বিশ্লেষকরা বলছেন, এমন পদক্ষেপ আঞ্চলিক ভূরাজনীতিকে আরও জটিল করতে পারে। এছাড়া প্রণালিটি নিরাপত্তা ঝুঁকির দিক থেকেও সংবেদনশীল। ২০২৫ সালে মালাক্কা ও সিঙ্গাপুর প্রণালিতে ১০০–এর বেশি জলদস্যুতা ও ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। পাশাপাশি সুনামি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত–এর মধ্যে সমুদ্র আধিপত্য নিয়ে প্রতিযোগিতা বাড়লে এই পথের স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে চীনের প্রায় তিন–চতুর্থাংশ তেল আমদানি এবং বড় অংশের বাণিজ্য এই রুটের ওপর নির্ভরশীল, যা ‘মালাক্কা ডিলেমা’ হিসেবে পরিচিত। তবে স্বল্পমেয়াদে বড় ধরনের বিঘ্নের আশঙ্কা কম। কারণ বৈশ্বিক অর্থনীতি সচল রাখতে সব পক্ষই এই নৌপথ খোলা রাখতে আগ্রহী। তবে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতা বাড়লে বীমা খরচ বৃদ্ধি, ঝুঁকি বাড়া এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্বের প্রায় ২৫ শতাংশ গাড়ির বাণিজ্য এই পথ দিয়ে হয়। এছাড়া শস্য ও সয়াবিনের মতো শুকনো পণ্যও পরিবহন হয় এই প্রণালির মধ্য দিয়ে। মালাক্কার গুরুত্ব শুধু অর্থনৈতিক নয় বরং ভূরাজনৈতিক দিক থেকেও সংবেদনশীল হয়ে উঠছে। চীন, যুক্তরাষ্ট্র বা ভারতের মধ্যে সমুদ্র আধিপত্য নিয়ে উত্তেজনা বাড়লে এই পথ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। চীনের জন্য এই প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমানো বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। পাইপলাইন বা অন্য কোনো করিডরের মতো বিকল্প পথ কিছুটা সহায়তা করতে পারলেও তা বৃহৎ পরিসরে মালাক্কার বিকল্প হতে পারবে না। এসব সীমাবদ্ধতার কারণে চীন এই দুর্বলতা দূর করার চেয়ে বরং তা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সেদিকেই বেশি মনোযোগ দেবে।














