হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান অবরোধ ও অনিশ্চয়তা কাটছে না। এর মধ্যেই নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য আলোচনাকে ঘিরে। একই সময়ে ইসলামাবাদে বৈঠকের জোর প্রস্তুতি, ইরানের ‘অবরোধ না তুললে আলোচনা নয়’ অবস্থান, হরমুজে জাহাজ ফেরত পাঠানো এবং হুতিদের বাব আল–মান্দেব প্রণালি বন্ধের হুমকি–সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। যুদ্ধবিরতির সময়সীমা শেষ হওয়ার প্রেক্ষাপটে পুরো অঞ্চলে আবারও সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আজ সোমবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান আলোচনার দ্বিতীয় পর্ব অনুষ্ঠিত হতে পারে। সেখানে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পক্ষই বৈঠকের তারিখ বা স্থান নিশ্চিত করেনি, তবুও কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। তুরস্ক ও মিশরের সমর্থনে পাকিস্তান এই আলোচনা আয়োজনের চেষ্টা চালাচ্ছে। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, চুক্তি হলে তিনি নিজেও ইসলামাবাদ সফর করতে পারেন। বিবিসি উর্দুর খবরে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য বৈঠককে কেন্দ্র করে ইসলামাবাদের ম্যারিয়ট হোটেল পুরোপুরি সরকারি ব্যবহারের জন্য বুক করা হয়েছে এবং অতিথিদের আগেভাগে হোটেল ছাড়তে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে পূর্বে আলোচনার স্থান সেরেনা হোটেল ইসলামাবাদেও সাময়িকভাবে বুকিং স্থগিত রেখেছে। রাওয়ালপিন্ডি ও ইসলামাবাদে গণ ও পণ্য পরিবহনও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আলোচনায় যোগ দিতে ইসলামাবাদে যেতে পারেন বলে হোয়াইট হাউস সূত্র জানিয়েছে। তার সঙ্গে থাকার কথা ট্রাম্পের উপদেষ্টা স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে সফর নিয়ে ভিন্নমুখী বক্তব্যও এসেছে। অন্যদিকে, ইরান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনায় অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। ইরানের অবস্থান স্পষ্ট–নৌ অবরোধ বহাল থাকলে কোনো আলোচনা নয়। আইআরজিসি ঘনিষ্ঠ তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত অবরোধ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত তেহরান কোনো আলোচক দল পাঠাবে না।
পারমাণবিক ইস্যুতেও উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান প্রশ্ন তুলেছেন, ইরানের পারমাণবিক অধিকার খর্ব করার অধিকার যুক্তরাষ্ট্রকে কে দিয়েছে? তার এই বক্তব্য তেহরান–ওয়াশিংটন দ্বন্দ্বকে আরও তীব্র করেছে। একইসঙ্গে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করা যায় না এবং যেকোনো সময় আবারও যুদ্ধ শুরু হতে পারে। ইসরায়েলও সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি শেষের আশঙ্কায় তাদের বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রেখেছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। ইরানের সামরিক বাহিনী দুটি তেলবাহী ট্যাংকারকে প্রণালি অতিক্রম করতে বাধা দিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছে। নৌ অবরোধ অব্যাহত থাকায় বর্তমানে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধের মুখে। জাহাজ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অনেক জাহাজ এখন ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত উপকূলে নোঙর করে অপেক্ষা করছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর হুমকি। তারা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি উত্তপ্ত করলে বাব আল–মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে সংযুক্ত করা এই পথ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৮৮ লাখ ব্যারেল তেল এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের ১০–১২ শতাংশ পণ্য পরিবাহিত হয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ ও বাব আল–মান্দেব–এই দুই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ একসঙ্গে অচল হয়ে পড়লে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। এতে তেলের দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ শৃক্সখলে বিঘ্ন এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক কোনো সমাধানের ইঙ্গিত না থাকলেও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে যুদ্ধবিরতির অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, অবরোধ ও পাল্টা হুমকির মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য আবারও বড় ধরনের অস্থিরতার দিকে এগোচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।














