প্রয়াত ইউসুফ গনি চৌধুরী–ভালোবাসা, মানবিকতা ও উদারতার এক অনন্য প্রতীক। আমি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় এক মহান মানুষকে স্মরণ করছি এবং তাঁর জন্য দোয়া করছি। সম্পর্কে তিনি আমার মামা।
১৮ জুলাই ১৯৪১ সালে চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লায় অবস্থিত গনি মঞ্জিলের সম্মানিত হাতি কোম্পানি পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন জনাব মাহবুব আহমেদ চৌধুরী এবং মাতা ছিলেন মিসেস নুরজাহান বেগম। তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন মিসেস কাওসার দিলশাদ চৌধুরীর সঙ্গে। তাঁরা একসঙ্গে তিন সন্তানের প্রতিপালন করেছেন–তাহমিনা আহমেদ চৌধুরী, তানভীর আহমেদ চৌধুরী এবং আবুল সালাউদ্দিন (আমি, তাঁর ভাগ্নে)।
তিনি চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল ও চট্টগ্রাম কমার্স কলেজে শিক্ষা গ্রহণ করেন। সারাজীবন তিনি একজন উদার সমাজকর্মী ও চট্টগ্রাম এবং বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। খেলাধুলার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ–বিশেষত ক্রিকেট, ফুটবল, টেবিল টেনিস ও ব্যাডমিন্টন–তাঁর জীবনের বড় একটি অংশজুড়ে ছিল। তিনি বিসিবি, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব, ব্যাডমিন্টন ফেডারেশন এবং বিআরটিসি ফুটবল ক্লাবসহ বিভিন্ন ক্রীড়া সংস্থার সদস্য ও নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ভারতের হায়দ্রাবাদে অনুষ্ঠিত সার্ক ব্যাডমিন্টন বাংলাদেশ জাতীয় দলের ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। খেলাধুলার বাইরে তিনি বিআরটিসির পরিচালনা বোর্ডের সদস্য ছিলেন।
তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরে অংশগ্রহণের জন্য বহু ভ্রমণ করেছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ১৯৮৭ সালের ভারতের ক্রিকেট বিশ্বকাপ এবং ১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল বিশ্বকাপ। তাঁর কারণেই আন্দরকিল্লায় আমাদের পরিবারে খেলাধুলার প্রতি গভীর ভালোবাসার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়াম ও চট্টগ্রাম স্টেডিয়ামে খেলা দেখা, ঢাকা ও চট্টগ্রামে ফুটবল লিগ ম্যাচ এবং এমনকি কলকাতার সল্টলেক স্টেডিয়ামে খেলা দেখার স্মৃতি আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতিগুলোর মধ্যে অন্যতম। বিশ্বকাপের সময়গুলো গনি মঞ্জিলে উৎসবমুখর পরিবেশে আনন্দ ও পারিবারিক একতার প্রতীক ছিল।
আমার প্রিয় মামা, আপনার অবিচল সমর্থন, দিকনির্দেশনা ও যত্ন আমার জীবনের অপরিবর্তনীয় অংশ ছিল। আপনি এমন এক বিরল গুণের অধিকারী ছিলেন–যা দিয়ে আপনি সবাইকে অনুভব করাতেন যে তারা দেখা–শোনা ও ভালোবাসা পাচ্ছে। আমি নিজেই তার প্রমাণ। আপনার স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর আজও আমার কানে প্রতিধ্বনিত হয়। আপনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন ২০০০ সালের ১২ মে। আজ থেকে ২৬ বছর আগে–মাত্র ৫৮ বছর বয়সে, যা ছিল খুবই অকাল। কিন্তু আপনি যতদিন আমাদের সঙ্গে ছিলেন, পরিপূর্ণ ও উদার জীবনই যাপন করেছেন।
১৯৭১ সালের অক্টোবরে আমার জন্মের দিন থেকেই আপনি আমাকে আপনার ছায়াতলে গ্রহণ করেছিলেন এবং নিজের সন্তানের মতো লালন–পালন করেছেন। আমার পিতা শহীদ এ.কে. শামসুদ্দিন, সিএসপি–যিনি ১৯৭১ সালে সিরাজগঞ্জের এসডিও হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে শহীদ হন–তাঁর মৃত্যুর পর আমি জন্মসূত্রে পিতৃহীন ছিলাম। কিন্তু আপনি কখনো সেই শূন্যতা অনুভব করতে দেননি–সব দিক থেকেই আপনি আমার বাবার ভূমিকা পালন করেছেন। জীবনে আমি যে সাফল্য অর্জন করেছি, বিশেষ করে গত ৩৩ বছরে যুক্তরাষ্ট্রে আমার জীবন গড়ে তোলা–সবকিছুর পেছনে আপনার এবং আমার প্রিয় মামিমা’র অবদান, যিনি আপনার ঘরে আমাকে নিজের সন্তানের মতো করে জীবনের প্রথম ২১ বছর লালন–পালন করেছেন।
আপনি সবসময় আমার জন্য সেরাটাই চেয়েছেন। সেই কারণেই ১৯৮০ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত আমাকে ঢাকার রেসিডেনশিয়াল মডেল স্কুলে পাঠান। পরে যখন আমি আমার ভাই তানভীর ভাইয়া ও বোন তাহমিনা আপাকে খুব মিস করতাম, তখন আমাকে চট্টগ্রামে ফিরিয়ে আনেন, যেখানে আমি চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল ও চট্টগ্রাম কলেজে পড়াশোনা চালিয়ে যাই। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার ক্ষেত্রেও আপনি আমাকে উৎসাহ ও পূর্ণ সমর্থন দিয়েছেন।
মামা, আপনার জীবন ছিল ভালোবাসা, দয়া ও উদারতার এক জীবন্ত উদাহরণ। আপনি যেসব মানুষের জীবনে স্পর্শ রেখেছেন এবং আমার মধ্যে যে মূল্যবোধগুলো গেঁথে দিয়েছেন–পরিবার, ক্ষমা, বন্ধুত্ব ও মানবিকতা–তার মধ্য দিয়েই আপনার উত্তরাধিকার বেঁচে আছে। আমি সেই উত্তরাধিকার বহন করে চলেছি এবং আজীবন আপনার কাছে ঋণী থাকব।
আজ আমি এই শ্রদ্ধাঞ্জলি লিখছি যেন পৃথিবী জানতে পারে–আপনি ছিলেন সত্যিই বিশ্বের সেরা মামা। আপনার হাসি, গল্প, স্বতন্ত্র অভ্যাস এবং নিরন্তর সমর্থন আমি গভীরভাবে লালন করি। আপনার বিদায় আমার জীবনে এক গভীর শূন্যতা তৈরি করেছে, তবে আপনার আত্মা আজও আমাকে পথ দেখায়।
আপনি জন্ম থেকেই আমাকে ভালোবেসেছেন, আমার খোঁজখবর নিয়েছেন এবং গর্বের সঙ্গে আমাকে একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। আজও শব্দ আমাকে ছাড়িয়ে যায়। প্রতিদিনই আমি আপনার আশ্বস্ত কণ্ঠস্বরকে খুব মিস করি–একটি প্রাণ, যা ছিল শক্তি, উষ্ণতা ও সহমর্মিতায় ভরপুর।
মামা, আমার জীবনে সর্বদা পাশে থাকার জন্য, আমাকে আগলে রাখার জন্য এবং সব পরিস্থিতিতে আমার সঙ্গে থাকার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার ভালোবাসা আমার কাছে অমূল্য এবং আমি তা আজীবন আগলে রাখব।
আমি এই জেনে সান্ত্বনা পাই যে আপনার আত্মা শান্তিতে আছে। আপনার স্মৃতি আমাদের সবার জন্য চিরন্তন আশীর্বাদ হয়ে থাকুক। শান্তিতে ঘুমান, প্রিয় মামা। আপনাকে আমরা গভীরভাবে মিস করি এবং আপনার ভালোবাসা কখনো ভোলা যাবে না। আপনি একজন রাজা ছিলেন এবং চিরকাল রাজাই থাকবেন। আমি আপনাকে ভালোবাসি।
লেখক: প্রয়াত ইউসুফ গনি চৌধুরীর ভাগ্নে। সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট, সিটিব্যাংক, এন.এ, রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ডাটা অপারেশনস অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং রাদারফোর্ড, নিউ জার্সি, যুক্তরাষ্ট্র













