সিইপিজেড থেকে পণ্য পাচারে পুরনো চক্র ফের সক্রিয়

গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক রিপোর্ট, তবুও চক্রটি অধরা কাপড় বিক্রি হয় নগরীর টেরীবাজার ও ঢাকার ইসলামপুরে

হাসান আকবর | রবিবার , ১৭ মে, ২০২৬ at ৫:৫৮ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল (সিইপিজেড) থেকে পণ্য পাচারে পুরনো চক্র ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে। শত শত কোটি টাকার পণ্য পাচার হচ্ছে। দেশের সবচেয়ে বড় এই রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চলের দেশিবিদেশি অনেক কারখানা থেকে নিয়মিত পণ্য পাচার হচ্ছে। শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা কাপড় থেকে শুরু করে নানা পণ্য প্রায় সময় বের হচ্ছে ইপিজেড থেকে। সংঘবদ্ধ এবং প্রভাবশালী চক্রটি বেশ কিছুদিন চুপচাপ থাকলেও আবার মাঠে নেমেছে। সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা একাধিক রিপোর্ট প্রদান করলেও অসাধু চক্রটি সবসময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে কাপড়সহ পণ্য পাচার বৃদ্ধি পেয়েছে উল্লেখ করে সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রামের টেরীবাজার এবং ঢাকার ইসলামপুরে এসব কাপড় বিক্রি করা হয়। অন্যান্য পণ্যেরও নির্দিষ্ট স্থানে পাচারকারী চক্রের সহযোগিতা ক্রেতা রয়েছে।

জানা যায়, সিইপিজেড দেশের প্রথম রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল। ১৯৮০ সালে এটির যাত্রা শুরু হয়েছিল। নগরীর দক্ষিণ হালিশহরের ৪৫৩ একর ভূমির উপর গড়ে তোলা সিইপিজেডে প্রায় ৫শ শিল্প প্লট রয়েছে। ১৯৮৩ সাল থেকে চীন, জাপান, তাইওয়ান, কোরিয়া, আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীদের প্রায় দেড়শ কারখানা রয়েছে। সিইপিজেডে বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। দেশি, দেশিবিদেশি যৌথ এবং এককভাবে বিদেশি বিনিয়োগে গড়ে ওঠা শতাধিক কারখানায় তৈরি পোশাক, কাপড়, সুতা, জিন্স প্যান্ট, জুতা, তাঁবু, খেলনাসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদিত হয়। দেড় লাখের বেশি শ্রমিক সিইপিজেডের নানা কারখানায় কাজ করেন। এসব কারখানায় ব্যাক টু ব্যাক এলসির আওতায় আমদানিকৃত কাঁচামাল ব্যবহার করে পণ্য উৎপাদন করে এবং এর পুরোটাই বিদেশে রপ্তানি করার কথা। শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি এবং ইপিজেডকেন্দ্রিক বিশেষ কিছু সুযোগসুবিধার কারণে এখানে উৎপাদিত পণ্যের দাম তুলনামূলকভাবে কম হয়। প্রচলিত শুল্কহারের পুরোটাই পরিশোধসহ বিশেষ কিছু শর্তে ইপিজেডে উৎপাদিত পণ্যের খুব সামান্য একটি শতাংশ স্থানীয় বাজারে বিক্রি করার সুযোগ রয়েছে। শুল্ক পরিশোধ ব্যতীত ইপিজেড থেকে কোনো পণ্য বাইরে আসার সুযোগ নেই। কিন্তু বিদ্যমান আইনের তোয়াক্কা না করে সংঘবদ্ধ একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে সিইপিজেড থেকে কোটি কোটি টাকার পণ্য বাইরে পাচার করে আসছে। নানা পথে নানা পন্থায় এসব পণ্য চট্টগ্রাম এবং ঢাকার বড় বড় দোকানে বিক্রি হচ্ছে। চট্টগ্রাম নগরীর টেরীবাজার এবং ঢাকার ইসলামপুরে সিইপিজেডের পাচারকৃত কাপড় কেনার বড় ধরনের চক্র রয়েছে। নগরীর আগ্রাবাদ এবং জিইসি মোড়ের ফুটপাতের জুতার বাজার ছাড়াও নগরীর অভিজাত বিপণী বিতানগুলোতে শোভা পায় সিইপিজেডের জুতাসহ নানা পণ্য। দীর্ঘদিন ধরে সিইপিজেড থেকে কোটি কোটি টাকার কাপড়সহ নানা পণ্য বেরিয়ে এলেও ধরা পড়ার পরিসংখ্যান নগণ্য।

সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা বিভিন্ন সময় সিইপিজেড থেকে কাপড় পাচারের বিস্তারিত তথ্যউপাত্ত উল্লেখ করে একাধিক রিপোর্ট প্রেরণ করেছে। এতে সিইপিজেডের পণ্য কী করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি হচ্ছে তা বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। এতে বিভিন্ন কারখানার মালিক এবং সংঘবদ্ধ জুট ব্যবসায়ী চক্রকে দায়ী করা হয়েছে।

সিইপিজেড থেকে প্রতিদিন ঝুট বের করা হয়। কোনো না কোনো কারখানার ঝুটের চালান বের করে বাইরে আনা হয়। কারখানা থেকে ঝুট এবং ময়লা বের করার কথা বলে ভেতরে পণ্য ঢুকিয়ে পাচার করা হয়। বাইরে ওয়াশিংয়ে নেওয়ার কথা বলেও পাচার হয় পণ্য। প্রতিদিন কাভার্ড ভ্যান ভর্তি করে কাপড় নিয়ে আসা হয়। অভিযোগ আছে, এসব দেখেও দেখেন না সংশ্লিষ্টরা। বিভিন্ন সময় বিচ্ছিন্নভাবে দুয়েকটি চালান ধরা পড়লেও অধিকাংশ চালান গন্তব্যে পৌঁছে যায়। ছোট কাভার্ড ভ্যান বা বড় কাভার্ড ভ্যানের জন্য রেট নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্ধারিত হারে টাকা পরিশোধ করে সিইপিজেড থেকে পণ্য পাচার চলছে বলে গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানিয়েছে। ঝুটের আড়ালে বের করে আনা কাপড় নামসর্বস্ব কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমেও ঢাকায় পাচার করা হয়। বিভিন্ন যানবাহন চেক করা হলেও কুরিয়ারের গাড়িগুলো নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে যায়। সিইপিজেড থেকে অবৈধ পথে পণ্য পাচারকারী চক্রের মূল হোতা হিসেবে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় পণ্য পাচারসহ নানা কারণে থানায় মামলা হয়েছে। কিন্তু চক্রটি সবকিছু ম্যানেজ করে পাচার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে বলে সূত্র জানিয়েছে। এই চক্র প্রভাবশালী। এই চক্রের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়া কঠিন। তাই ইচ্ছে থাকলেও অনেক কর্মকর্তা এদের নাগাল পাচ্ছেন না।

এ বিষয়ে বেপজার একাধিক কর্মকর্তা বলেন, টুকটাক পণ্য বাইরে যেতে পারে। এখান থেকে নানা পণ্য বাইরে যায়। এর কোনো কোনোটি পাচার হতে পারে। বেপজার এসব দেখার মতো লোকবল নেই। বিষয়টি কাস্টমস দেখে।

ইপিজেড কাস্টমসের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যেভাবে বলছেন ওভাবে কিছু হয় না। আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করি। তবে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু ঘটনা ঘটতে পারে।

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, কোনো ধরনের পাচারের তথ্য পেলেই আমরা তা আটক করি। বিষয়টি সম্পর্কে আমরা সচেতন। এ বিষয়ে নজরদারি রয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধএক ঘণ্টায় কোটি হিট, টিকিট বিক্রিও শেষ
পরবর্তী নিবন্ধজলাবদ্ধতা প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিয়ে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে