একজন পিতাকে নিয়ে পুত্রের বয়ান–শুনতে খুব ব্যক্তিগত মনে হলেও খালিদ মঈনুদ্দিনের ‘সর্বংসহ যাত্রীরা’ শেষ পর্যন্ত কেবল একটি পরিবারের গল্প হয়ে থাকে না। এটি হয়ে ওঠে একজন মানুষের জীবনসংগ্রাম, সত্য উচ্চারণের মূল্য, রাষ্ট্র ও সমাজের নানা প্রতিকূলতা এবং মৃত্যুর পরও ন্যায় ও মর্যাদা ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার গল্প।
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র হাসেম। গ্রামীণ পটভূমি থেকে জীবন শুরু করা এই মানুষটি নিজের মেধা, সততা ও কর্মগুণে সমাজে স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন। একসময় তাকে সমাজ ও রাষ্ট্রযন্ত্রের নানা ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি দাঁড় করায়। পরিণতিতে আসে মৃত্যু। তবে এখানেই গল্পের শেষ নয়। মৃত্যুর পরও তার পরিবার হাল ছাড়ে না। তারা আইনগতভাবে লড়াই করতে চায়, অন্যায়ের প্রতিকার চায় এবং মৃত পিতার হারানো সম্মান ফিরিয়ে আনতে চায়। ফলে উপন্যাসটি একই সঙ্গে হয়ে ওঠে স্মৃতি, বেদনা, প্রতিবাদ ও ন্যায়বিচারের অনুসন্ধান।
এই উপন্যাসের সবচেয়ে বড় শক্তি এর বিষয়বস্তু। কারণ গল্পটির মূল উপাদান লেখকের নিজের জীবন ও পারিবারিক অভিজ্ঞতা থেকে নেওয়া। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা যখন সাহিত্যের রূপ পায়, তখন তার আবেগ ও বিশ্বাসযোগ্যতা স্বাভাবিকভাবেই অন্য মাত্রা লাভ করে। সর্বংসহ যাত্রীরাতেও সেই ব্যক্তিগত অনুষঙ্গ পাঠককে গল্পের ভেতরে টেনে নিয়ে যায়। পিতাকে হারানোর বেদনা এখানে নিছক শোক নয়; বরং সেই বেদনা ক্রমে ন্যায়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।
লেখকের নিজের জীবনপথও এই উপন্যাসের প্রেক্ষাপট বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার পূর্বে কক্সবাজারে জন্ম নেওয়া লেখকের পিতা সে সময় কক্সবাজার শহরে হাবিব ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন। তাঁদের আদি নিবাস চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার গারাংগিয়া গ্রামে; দাদা ছিলেন স্কুলশিক্ষক। স্বাধীনতার পর লেখকের বেড়ে ওঠা চট্টগ্রাম শহরের জামালখান এলাকায়। পরবর্তী জীবনে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে পড়াশোনা করে তিনি কুমিল্লা বোর্ডের মেধাতালিকায় স্থান করে নেন এবং সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। কমিশন লাভের পর মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করেন। পরে গবেষণার লক্ষ্যে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান এবং মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এরোডাইনামিক্স বিষয়ে পিএইচডি অর্জন করেন। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপক ও গবেষক হিসেবে কর্মরত এবং ফ্যাকাল্টি ডিনের দায়িত্বও পালন করছেন। এই দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় জীবনপথের সঙ্গে সর্বংসহ যাত্রীরা–এর ব্যক্তিগত বয়ানের একটি স্বাভাবিক যোগসূত্র তৈরি হয়। লেখক প্রথমে উপন্যাসটি ফেসবুকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করেছিলেন। এবার সেটিই পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ধারাবাহিক লেখাকে বইয়ের কাঠামোয় নিয়ে আসা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। এতে বিচ্ছিন্ন পর্বগুলো একটি বৃহত্তর আখ্যানের মধ্যে নতুনভাবে পাঠ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
উপন্যাসটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো–এখানে ব্যক্তিগত শোকের সঙ্গে সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সংযোগ ঘটেছে। হাসেমের চরিত্রের মধ্য দিয়ে এমন এক মানুষের প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায়, যিনি প্রতিকূলতার কাছে নতিস্বীকার করেননি। তাঁর পরিণতি পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগায়: সত্য কথা বলার মূল্য কি এতটাই নির্মম? আর কোনো মানুষের মৃত্যুর পর তার সম্মান ও সত্য প্রতিষ্ঠার দায় কি পরিবারের ওপরই বর্তায়?
এই প্রশ্নগুলো উপন্যাসটিকে নিছক পারিবারিক স্মৃতিচারণের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর সামাজিক তাৎপর্য দিয়েছে। তবে বইটির উপস্থাপনার ক্ষেত্রে আরও কিছু যত্নের সুযোগ ছিল। বিশেষ করে প্রচ্ছদ ও বাইন্ডিং। প্রচ্ছদে মূল চরিত্রগুলির পোর্টেট না দিয়ে কাব্যিক অনুভূতিময় কিছু দেয়া যেতে পারত, যেটা দ্বিতীয় মুদ্রণ হলে বিবেচনা করা যেতে পারে।
সব মিলিয়ে ‘সর্বংসহ যাত্রীরা’ এমন একটি উপন্যাস, যার কেন্দ্রে রয়েছে পিতা–পুত্রের সম্পর্ক, কিন্তু যার বিস্তৃতি ব্যক্তিগত আবেগের চেয়ে অনেক বড়। এটি এক পিতাকে স্মরণ করার পাশাপাশি তাঁর সত্য ও সম্মানকে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা। ব্যক্তিগত ইতিহাস, পারিবারিক বেদনা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা–এই চারটি প্রবাহ মিলে উপন্যাসটির মূল সুর তৈরি করেছে। পিতাকে হারানো যায়, কিন্তু তাঁর সত্যকে হারিয়ে যেতে দেওয়া যায় না-‘সর্বংসহ যাত্রীরা’ মূলত সেই প্রত্যয়েরই সাহিত্যিক বয়ান। বইটি রকমারি থেকেও সংগ্রহ করা যাবে।
[সর্বংসহ যাত্রীরা– উপন্যাস, লেখক: খালিদ মঈনুদ্দিন, প্রকাশক: গতিধারা, বাংলা বাজার, ঢাকা, মূল্য: ৬০০ টাকা]
লেখক : অধ্যাপক, চারুকলা ইন্সটিটিউট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়












