বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক সহায়তা যে দিন দিন কমে যাচ্ছে, সে কথা স্বীকার করলেন গতবারের দ্বিগুণ বিদেশি ঋণ নিয়ে ঘাটতি বাজেট অর্থায়ন করতে চাওয়া অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গতকাল রোববার বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ–সিপিডি আয়োজিত এক আলোচনা অনুষ্ঠানে তিনি সরকারি ব্যয় ও অর্থায়ন কাঠামো বদলে দিতে সময় চেয়েছেন।
গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা দেন আমির খসরু। সেখানে আয়–ব্যয়ের ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। সিপিডির আলোচনায় ঘাটতি বাজেট পূরণে বিদেশি ঋণের লক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র্যাপিড) চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক। এদিকে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশের কর ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান সমস্যা নীতিমালা প্রণয়ন। এ কারণে করনীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে আমলাদের পরিবর্তে বিশেষজ্ঞ ও কর বিশেষজ্ঞদের (ট্যাক্স এক্সপার্ট) অন্তর্ভুক্ত করা হবে। সঠিক নীতিমালা প্রণয়ন করা গেলে কর ব্যবস্থার অর্ধেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। খবর বিডিনিউজ ও বাংলানিউজের।
অর্থমন্ত্রী বলেন, একটা বড় প্রশ্ন আসছে যে বাজেট ঠিক আছে, কিন্তু এটা বাস্তবায়িত হবে কি না? একদম সঠিক প্রশ্ন। সীমিত সম্পদের একটি দেশ, যেখানে কর–জিডিপি ও আন্তর্জাতিক সমর্থন এত কম এবং তা ক্রমে আরো কমছে। ড. রাজ্জাক সঠিক বলেছেন যে, ওডিএ বা সরকারি উন্নয়ন সহায়তা কমে আসছে। আর এমন একটা সময়েই কিন্তু এই বাজেটটা করতে হয়েছে আমাদের। তাই বাজেট বাস্তবায়নে আমরা কী করব? আগের পদ্ধতিতে দেশ চালাব, নাকি নতুনভাবে কিছু চিন্তা করব? এটা হচ্ছে প্রশ্ন। তবে পুরো পাবলিক ফাইন্যান্স আর্কিটেকচারকে আমরা নতুনভাবে নিচ্ছি। এর জন্য বিদেশি ঋণ ও সহায়তানির্ভর অর্থায়ন পরিকল্পনা থেকে সরে আসার আভাস দিয়ে তিনি বলেন, আমাদের বিকল্প অর্থায়নের দিকে যেতে হবে। এখন আপনারা দেখেন, একচুয়ালি মাল্টিল্যাটারাল যে ফাইন্যান্স হতো, এগুলোর খরচ কিন্তু বেড়ে যাচ্ছে। এগুলোর কিন্তু ইন্টারেস্ট অনেক বেড়ে যাচ্ছে। এই ইন্টারেস্টের সঙ্গে মার্কেট ইন্টারেস্টের তফাতও কমে আসছে। সুতরাং এটা অনেক খরচসাধ্য হয়ে উঠেছে। এজন্য আমাদের একটা বিকল্প পরিকল্পনা করতে হচ্ছে। তাই আমরা যেন বাজারভিত্তিক অর্থায়নে যেতে পারি, এজন্য আমাকে বন্ড ইস্যু করতে হবে।
তার ভাষ্য, এখন ট্রেন্ডটা আপনারা যদি লক্ষ্য করেন, ২০২৫–২৬ (অর্থবছর) এর সঙ্গে তুলনা করে ২০২৬–২৭ (অর্থবছর) এ যে আমরা বাজেট দিয়েছি, এখানে ব্যাংক থেকে ধার নেওয়া কমে আসছে। আমরা এই ট্রেন্ডটা রিভার্স করছি। কিন্তু এটা তো আমরা রাতারাতি করতে পারব না। তিন বা চার মাসে তো করতে পারব না। এক বছরও করতে পারব না। সুতরাং এটিও একটি প্রক্রিয়া। ব্যাংক ঋণ থেকে বেরিয়ে এসে বিকল্প অর্থায়ন এবং ট্যাক্স জিডিপি আমাকে বাড়াতেই হবে। আমাদের কোনো অপশন নাই।
ব্যাংক ঋণের ধারা থেকে স্বল্প সময়ে বেরিয়ে আসার সুযোগ না থাকার কথা বললেও অর্থমন্ত্রী নতুন অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার প্রস্তাব করেছেন বাজেট বক্তৃতায়। গতবারের মূল বাজেটের চেয়ে ব্যাংক থেকে ৮ হাজার কোটি টাকা বেশি ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরেছে সরকার। তবে এটি সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ৬ হাজার কোটি টাকা কম। অর্থনীতিবিদরা বলে থাকেন, ব্যাংক খাত থেকে সরকার ঋণ বেশি নিলে বেসরকারি খাতে উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা ঋণ কম পান। তাতে দেশের উৎপাদন কমে যায়।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। নতুন সরকারের নতুন বাজেটে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের যে লক্ষ্য অর্থমন্ত্রী নিয়েছেন, তা প্রশংসনীয় হলেও সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো অতি আশাবাদী বলে মন্তব্য করেন তিনি।












