শিশু ধর্ষণের অভিযোগে রণক্ষেত্র বাকলিয়া

অভিযুক্ত আটক, তাকে স্থানীয়দের হাতে তুলে দেওয়ায় দাবিতে ৭ ঘন্টা অবরুদ্ধ পুলিশ, গাড়িতে আগুন । উত্তেজিত লোকজনকে ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড, ফাঁকা গুলি, ৪ সাংবাদিকসহ আহত ৩০

আজাদী প্রতিবেদন | শুক্রবার , ২২ মে, ২০২৬ at ৫:৩৪ পূর্বাহ্ণ

নগরীর দক্ষিণ বাকলিয়ার আবু জাফর রোড চেয়ারম্যানঘাটা এলাকায় সাড়ে তিন বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে মনির হোসেন (৩৫) নামে এক ব্যক্তিকে আটক করেছে পুলিশ। থানায় নিয়ে যাওয়ার সময় বিক্ষুব্ধ জনগণ প্রায় সাত ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখে পুলিশকে। এসময় কাঁদানে গ্যাসের শেল, সাউন্ড গ্রেনেড, ফাঁকা গুলি ছুড়েও পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেও পারেনি। পরে রাত ১০টায় এলাকায় বিদ্যুৎ চলে গেলে কৌশলে ওই ব্যক্তিকে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসময় বিক্ষুব্ধ স্থানীয় জনগণ পুলিশের গাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়। পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পরবর্তীতে রাত সোয়া ১০টার দিকে উত্তেজিত জনগণ চট্টগ্রামকক্সবাজার মহাসড়কের বাকলিয়া অংশে অবরোধ করে এবং টায়ার জ্বালিয়ে আগুন লাগিয়ে দেয়। উত্তেজিত জনতা অভিযুক্ত ব্যক্তিকে তাদের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানালে পুলিশ ও জনতার মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পুলিশ বিভিন্ন ভাবে স্থানীয় জনগণকে শান্ত করার চেষ্টা করেন।

গতকাল বিকেল ৩টা থেকে রাত সোয়া ১০টা পর্যন্ত ৭ ঘণ্টা ব্যাপী স্থানীয় উত্তেজিত জনতা অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গণপিটুনি দেয়ার জন্য তাদের হাতে তুলে দেওয়ার দাবিতে বিসমিল্লাহ ম্যানশনে পুলিশ ও অভিযুক্তকে ঘেরাও করে রাখে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ দফায় দফায় বিক্ষুব্ধ জনগণকে ধাওয়া করে এবং টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে। এ সময় কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেডের আঘাতে আহত দৈনিক আজাদীর মাল্টিমিডিয়ার এবং চট্টগ্রাম প্রতিদিনের ৪ সাংবাদিকসহ ৩০ জনের মতো আহত হন। গতকাল বিকেলে বাকলিয়া থানার চেয়ারম্যান ঘাটার আবু জাফর রোড এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। রাত সোয়া ১০টা পর্যন্ত বিক্ষুব্ধ জনতা সড়কে অবস্থান নিয়ে পুলিশের গাড়ি আটকে রাখেন।

অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নিয়ে যাওয়ার পর বিক্ষুব্ধ লোকজন পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। রাত ১১ টায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত দক্ষিণ বাকলিয়ার আবু জাফর রোডের চেয়ারম্যানঘাটা এলাকা থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দুপুরের পর থেকে শিশুটিকে তার নানীনানাসহ সবাই খোঁজাখুঁজির পর বিকেলে পাশের একটি ভবনের সিঁড়িঘরে কান্নারত অবস্থায় দেখতে পান স্থানীয়রা। এসময় শিশুটির শারীরিক অবস্থা দেখে তার নানীনানাসহ সবাই ধারণা করেন, সে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। এসময় পরিবারের সদস্যরা শিশুটিকে দ্রুত চমেক হাসপাতালে নিয়ে যায়। বর্তমানে শিশুটি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ এ চিকিৎসাধীন রয়েছে বলে জানান শিশুটির চাচা মাসুম। মুহূর্তেই ঘটনাটি এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ জনতা অভিযুক্ত মনির হোসেনকে ঘটনাস্থল থেকে ধরে গণপিটুনি দিতে শুরু করলে বাকলিয়া থানা পুলিশ এসে তাকে উদ্ধার করে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে নেয়।

অভিযুক্তের স্বীকারোক্তি : অভিযুক্ত মনিরকে পুলিশ আটক করে নিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয় জনগণ চারদিকে ঘেরাও করে রাখে। এসময় রুমে ভেতরে অভিযুক্ত মনির সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাকে শয়তানে পেয়েছে। আমি কিছু করিনি। আমার দোষ, আমার ভুল হয়েছে।’

৪ সাংবাদিকসহ ৩০ জন আহত : অভিযুক্তকে আটক করে পুলিশ থানায় নিয়ে যেতে চাইলে স্থানীয় জনগণ তাদের হাতে ছেড়ে দিতে বলে। এসময় পুলিশসহ অভিযুক্তকে ঘরের ভেতরে ঘেরাও করে রেখে বাইরে শ্লোগান দিতে থাকে বিক্ষুব্ধ জনগণ। পরে অভিযুক্তকে ভবন থেকে বের করে আনার সময় বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশের গাড়ি ঘিরে ফেলে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ সদস্যরা পিছু হটে অবস্থান নেন।

স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. সালাউদ্দিন জানান, শিশুটি তার নানীর সাথে থাকেন। তার বাবা গাড়ি চালান, মা গার্মেন্টসে চাকরি করেন। অভিযুক্ত মনির পাশের একটি ডেকোরেশনে কাজ করে। ওই সময় সে ডেকোরেশনের কাপড় ধোয়ার কাজ করছিল। তখন সময় দুপুর আড়াইটার মত। এসময় শিশুটি পাশে খেলছিল। সেখান থেকে শিশুটিকে কোন কিছুর লোভ দেখিয়ে সে নিয়ে গেছে। শিশুটির নানী তাকে অনেকক্ষণ না দেখে খুঁজতেছিল। তারপর তাকে এই অবস্থায় পেয়েছে। অভিযুক্ত মনির পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে। এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় লোকজন উত্তেজিত হয়ে উঠে।

শিশুটির পরিবারের পাশের ভাড়াটিয়া স্থানীয় অটোরিকশা চালক দেলোয়ার ও মো. জামাল আজাদীকে জানান, এত ছোট একজন শিশুর সাথে এরকম জঘন্য কাজ যে করতে পারে তাকে প্রকাশ্যে গণপিটুনি দিয়ে মারা উচিত। তাকে পুলিশে নিয়ে গেলে দুইদিন পর আবার জামিন পেয়ে সে একই কাজ করবে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এ সময় কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেডের আঘাতে আহত হন দৈনিক আজাদীর মাল্টিমিডিয়ার রিপোর্টার নেজাম উদ্দিন আবীর এবং ক্যামেরাম্যান মোহাম্মদ আরশাদ এবং চট্টগ্রাম প্রতিদিনের মামুন আবদুল্লাহ ও নোবেল হাসান। এ ঘটনায় আরও ৩০ জনের মত আহত হন।

খবর পেয়ে সিএমপির উপ পুলিশ কমিশনার ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আরও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

রাত ১১ টার পর শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত দক্ষিণ বাকলিয়ার আবু জাফর রোডের চেয়ারম্যানঘাটা এলাকাথমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

এ বিষয়ে বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সোলাইমান বলেন, ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই অভিযুক্তকে আটক করা হয়েছে। তবে কিছু মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করছে। আমরা তাদের শান্ত করার চেষ্টা করছি। তিনি আরও জানান, শিশুটিকে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে চিকিৎসাধীন ভিকটিম : ঘাটনার পর ভিকটিমের চাচা মাসুমসহ স্থানীয়রা ভিকটিমকে চমেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলে হাসপাতালে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ এ ভর্তি করা হয়। বর্তমানে শিশুটি সুস্থ আছে বলে জানান পাঁচলাইশ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ জাহেদুল ইসলাম।

রাত ৯টায় চমেক হাসপাতাল ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ এ গিয়ে দেখা যায়, ভেতরে শিশুটির সাথে তার মা রয়েছেন এবং বাইরে শিশুটির চাচা মো. মাসুম দাঁড়িয়ে আছেন। ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ এর ভেতরে এবং বাইরে পাঁচলাইশ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ জাহেদুল ইসলামসহ পুলিশের একটি টিম দায়িত্ব পালন করছেন।

এসময় পাঁচলাইশ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ জাহেদুল ইসলাম জানান, শিশুটি বর্তমানে সুস্থ আছে। ওর মাও সাথে আছেন। শিশুটির চাচা মো. মাসুম আজাদীকে জানান, আমার ভাতিজি দুপুরে খাবারের পর বাসার বাইরে খেলার জন্য বের হয়। অনেকক্ষণ ধরে তাকে না পেয়ে খোঁজাখুঁজি করার পর ভবনের সিঁড়িঘরে কান্নারত অবস্থায় দেখতে পান। এসময় শিশুটির শারীরিক অবস্থা দেখে তার নানীনানাসহ সবাই ধারণা করেন, সে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। তারপর তাকে আমরা হাসপাতালে নিয়ে আসি। মাসুম জানান, তার ভাই ড্রাইভার এবং ভাবী গার্মেন্টেসে চাকরি করেন। তার ভাতিজি নানীর সাথে থাকতো। অভিযুক্ত মনির স্থানীয় একটি ডেকোরেশন দোকানে কাজ করেন।

রাত ৯টায় শিশুটির বাবার সাথে চমেক হাসপাতাল থেকে ফোনে কথা হলে তিনি জানান, আমি গাড়ি চালাচ্ছিলাম। মেয়ের দুঃসংবাদ শুনে ঢাকা থেকে আসতেছি। এই ঘটনায় তিনি অভিযুক্তের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছেন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (চমেক) পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বে থাকা সহকারী উপপরিদর্শক সোহেল রানা বলেন, শিশুটিকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। তার চিকিংসা চলছে। চিকিৎসকরা পরীক্ষানিরীক্ষা করে শিশুটির কি হয়েছে তা জানাবেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনির্যাতিত শিশুটির চিকিৎসার দায়িত্ব নিলেন মেয়র শাহাদাত
পরবর্তী নিবন্ধদেশে পাঁচ মাসে শিশু ধর্ষণের ১১৮ অভিযোগ : আসক