লোহিত সাগরসহ গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথ বন্ধের হুঁশিয়ারি ইরানের

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পথে : ট্রাম্প । যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা নিয়ে ইরানে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান । যুদ্ধের ক্ষতিপূরণে ন্যূনতম ২৭ হাজার কোটি ডলার চায় তেহরান

আজাদী ডেস্ক | বৃহস্পতিবার , ১৬ এপ্রিল, ২০২৬ at ৫:৫৩ পূর্বাহ্ণ

লোহিত সাগরসহ গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ বন্ধ করে দেওয়ার সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। তাদের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নৌ অবরোধ অব্যাহত থাকলে এ পদক্ষেপ নিবে বলে জানিয়েছে দেশটি। একই সময়ে যুদ্ধবিরতির অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, ক্ষতিপূরণ ইস্যু সামনে এনে তেহরানের চাপ বৃদ্ধি, আর পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় নতুন করে আলোচনা শুরুর চেষ্টা, সব মিলিয়ে সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতা দ্রুত ঘনীভূত হচ্ছে। ইরানের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিকে তারা যুদ্ধবিরতির সীমা লঙ্ঘনের সূচনা হিসেবে দেখছে। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ কেবল অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নয় বরং সরাসরি কৌশলগত চাপ, যা যুদ্ধেরই সমপ্রসারণ। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে দেশটির সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড সেন্টারের প্রধান আলী আবদোল্লাহি বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সশস্ত্র বাহিনী পারস্য উপসাগর, ওমান সাগর এবং লোহিত সাগর দিয়ে কোনো ধরনের আমদানিরপ্তানি কার্যক্রম চলতে দেবে না। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধকে ইরান যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের সূচনা হিসেবে বিবেচনা করছে। তার ভাষায়, এ ধরনের পরিস্থিতিতে দেশটি নিজেদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও স্বার্থ রক্ষায় চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। এ হুঁশিয়ারিকে ঘিরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রুট ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই হুমকির বাস্তব প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে হরমুজ প্রণালিতে, যেখান দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানির প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। ইতোমধ্যে প্রণালিটি কার্যত অচল হয়ে পড়ায় তেলের দাম বেড়েছে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে বাব আলমান্দেব প্রণালি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় ইউরোপএশিয়া বাণিজ্য সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

এদিকে ইরানের সঙ্গে চলমান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। আগামী ২২ এপ্রিল বর্তমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওই মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতে রাজি হয়নি। তবে একটি চুক্তিতে পৌঁছতে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

ইরান যুদ্ধ ‘শেষ হওয়ার পথে’ : তবে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ খুব শিগগিরই শেষ হতে পারে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফঙ নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এই মন্তব্য করেন। সমপ্রচারিত সাক্ষাৎকারের একটি অংশে ট্রাম্পকে বলতে শোনা যায়, আমার মনে হয়, এটি (যুদ্ধ) শেষের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে, হ্যাঁ। নিজের বক্তব্যের ওপর জোর দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, আমি মনে করি, এটি শেষ হওয়ার একদম দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।

ইরানে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির : ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা পুনরায় শুরু করা নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক করতে তেহরানে পৌঁছেছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আইআরআইবি জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বার্তা পৌঁছে দিতে এবং দ্বিতীয় দফা আলোচনা সমন্বয় করতে আসিম মুনিরের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের পাকিস্তানি প্রতিনিধিদল ইরানে এই সফর করছে। মুনির যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিশেষ বার্তা নিয়ে ইরানে গেছেন। সেখানে তিনি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির সঙ্গে বৈঠক করবেন। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রইরান দ্বিতীয় দফা আলোচনার বিষয় ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হবে। তাছাড়া, ইরানযুক্তরাষ্ট্র বৈঠক নতুন করে শুরুর উপযুক্ত সময় নির্ধারণ করা এবং যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত কিছু অমীমাংসিত বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।

ইরান যুদ্ধবিরতির মধ্যে সৌদি আরব, কাতার ও তুরস্কে যাচ্ছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। এমন এক সময়ে তার এ সফর হচ্ছে যখন যুক্তরাষ্ট্রইরান দ্বিতীয় দফা শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা বেড়েছে বলেই মনে হচ্ছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বুধবার (গতকাল) থেকে শনিবার পর্যন্ত হতে যাওয়া এ সফরের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ সৌদি আরব ও কাতারে ‘দ্বিপাক্ষিক’ নানান বিষয় নিয়ে বৈঠক করবেন। আর আনতালিয়া কূটনীতিক ফোরামের সাইডলাইনে তার সঙ্গে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়িপ এরদোয়ান ও অন্যান্য দেশের নেতাদের কথা হবে। গত মঙ্গলবার পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি এক বিবৃতিতে জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আরও আলোচনার পথ সৃষ্টিতে এবং এই বিষয়ে অন্যান্য মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে আলোচনায় আগ্রহের বিষয়টি শেহবাজ তাকে জানিয়েছেন।

ন্যূনতম ২৭ হাজার কোটি ডলার চায় ইরান : ওয়াশিংটনতেহরান সংঘাত অবসানে বিভিন্ন দেশ যখন মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তখন দৃঢ়চেতা ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় সৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞের জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে। জাতিসংঘে তেহরানের দূত গত মঙ্গলবার বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের ৫টি দেশ, যারা ইরানে হামলায় ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে তাদেরকে এ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। হরমুজ প্রণালিতে শুল্ক বসানোর মাধ্যমেও এ ক্ষতিপূরণ আদায় করা যেতে পারে, ইরান এ বিষয়টিও সামনে এনেছে বলে জানিয়েছে আল জাজিরা। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রইসরায়েলের হামলা শুরু হওয়ার পর ইরানের প্রত্যক্ষঅপ্রত্যক্ষ প্রায় ২৭ হাজার কোটি ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিক এক মূল্যায়নে ইঙ্গিত মিলেছে, রুশ বার্তা সংস্থা রিয়া নভোস্তিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমনটাই বলেছেন ইরান সরকারের মুখপাত্র ফাতেমা মোহাজেরানি। সাক্ষাৎকারটি মঙ্গলবার প্রকাশিত হয়। কোন খাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কেমন, তার বিস্তারিত জানাননি ফাতেমা। তবে বলেছেন, পাকিস্তানে চলতি সপ্তাহে হওয়া তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে আলোচনায় ক্ষতিপূরণের প্রসঙ্গটি উত্থাপিত হয়েছিল এবং সামনে যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে যে কোনো সম্ভাব্য বৈঠকেও প্রসঙ্গটি থাকবে।

লেবাননে এক সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি : গতকাল হিজবুল্লাহপন্থী গণমাধ্যম আলমায়াদিন এক ইরানি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, লেবাননে এক সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি বুধবার রাত থেকেই কার্যকর হবে। ওই কর্মকর্তার মতে, ইরানের চাপের ফলেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই যুদ্ধবিরতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির শেষ সপ্তাহের সঙ্গে মিলিয়ে কার্যকর হবে। তবে ইসরায়েলের চ্যানেল ১২ জানিয়েছে, এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি ইসরায়েল। তবে লেবানন ও ইরানে হামলা অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা অনুমোদন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইসরায়েলি মিলিটারি প্রধান জেনারেল ইয়াল জামির। লেবানন প্রসঙ্গে ইসরায়েলি সামরিক প্রধান বলেন, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত রয়েছে। আমরা গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো দখল ও পরিষ্কার করছি এবং উত্তরাঞ্চলের বসতিগুলোর জন্য হুমকি দূর করছি।

এদিকে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিতে দেওয়া চাপের কাছে তিনি নতি স্বীকার করবেন না। যুদ্ধে যুক্তরাজ্যকে টেনে নিতে ট্রাম্পের করা মন্তব্যের প্রেক্ষিতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। এর আগে, মঙ্গলবার রাতে এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে যে বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে, সেটির শর্তাবলী যেকোনো সময় ‘পরিবর্তন করা হতে পারে’। তার এমন মন্তব্যের পর গতকাল বুধবার সংসদে বক্তব্য রাখতে গিয়ে স্টারমার বলেন, এটা আমাদের যুদ্ধ নয়। ভিন্ন পথ অবলম্বনের জন্য আমার ওপর অনেক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে এবং গত রাতে যা ঘটেছে, সেটাও সেই একই ধরনের চাপের অন্তর্ভুক্ত। আমি আমার সিদ্ধান্ত বদলাব না। আমি নতি স্বীকার করব না। এই যুদ্ধে যোগ দেওয়া আমাদের জাতীয় স্বার্থের অনুকূল নয় এবং আমরা তা করব না। আমি আমার অবস্থান সম্পর্কে অবগত আছি।

এছাড়া, হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করা থেকে সরে গিয়ে আলোচনার টেবিলে ফেরার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ‘চাপ দিচ্ছে’ সৌদি আরব। দেশটির কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল তাদের এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি আরবের আশঙ্কা, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করার যে পদক্ষেপ নিয়েছেন, তাতে ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে ও জাহাজে পণ্য পরিবহনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে বা জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটতে পারে। আরব কর্মকর্তারা বলেন, সৌদি আরব সতর্ক করে বলেছে, এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরান বাব আলমান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধভাড়া নিয়ে তর্ক, চবিতে শিক্ষার্থীর ওপর হামলা
পরবর্তী নিবন্ধখালের কিনারায় পড়ে ছিল গৃহবধূর লাশ, শরীরে আঘাতের চিহ্ন