শরতের সজীবতায় রাঙ্গুনিয়ার মাঠগুলো সেজেছে এক অন্যরকম রূপে। পাহাড়ের ঢাল আর নদীর তীর ঘেঁষা উর্বর জমিতে প্রকৃতি যেন বিছিয়ে দিয়েছে লাল সুতোর এক অনিন্দ্যসুন্দর কার্পেট। শীতকালীন প্রধান শাকসবজির আবাদের আগের এই ফাঁকা সময়টিতে খরিপ–২ মৌসুমে আগাম লাল শাক চাষ করে দারুণ সাফল্য পেয়েছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা। স্বল্প সময় ও খরচ, আর বর্তমান বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে লাল শাকের এই বাম্পার ফলনে কৃষকের মুখে ফুটেছে আনন্দের হাসি, বদলে যাচ্ছে তাদের ভাগ্যের চাকা।
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, রাঙ্গুনিয়ায় বর্তমানে প্রায় ১১ হেক্টর জমিতে লাল শাকের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ‘বারি লালশাক–১ (আলতাপেটি)’ এবং ‘রংধনু’ জাতের শাক বেশি চাষ করা হচ্ছে। উপজেলার সব ইউনিয়নেই কমবেশি লাল শাকের চাষ হলেও ইসলামপুর এবং রাজানগর ইউনিয়নে আবাদ সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে পাহাড়ের ঢালে ও ইছামতীর তীরবর্তী উর্বর জমিতে এই শাকের ফলন খুব ভালো হয়েছে।
সাধারণত শীতকালীন বা রবি মৌসুমে লাল শাকের আবাদ করা হলেও, রাঙ্গুনিয়ার কৃষকরা এবার খরিপ–২ মৌসুমে (শরৎকালীন) আগাম শাক চাষ করেছেন। বীজ ছিটানোর মাত্র ১৮ থেকে ২০ দিনের মধ্যেই শাক তোলার উপযোগী হয় এবং এক মাসের মধ্যে পুরো ফলন বাজারজাত করা সম্ভব হয়। লাল শাকের পাশাপাশি কৃষকরা মুলা শাক, পালং শাকসহ বিভিন্ন শাকেরও আবাদ করেছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রাঙ্গুনিয়ার মাঠে মাঠে এখন চলছে আগাম লাল শাক তোলার ব্যস্ততা। কম পুঁজি ও অল্প পরিশ্রমে অধিক লাভ হওয়ায় এই চাষাবাদ এলাকার কৃষকদের জীবনযাত্রায় এনে দিয়েছে নতুন সচ্ছলতা ও আনন্দের বার্তা। স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লাল শাক চাষে খরচ খুবই কম। মাত্র ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা খরচ করে এক বিঘা জমিতে লাল শাক চাষ করা যায়। শীতকালীন সময়ে সাধারণত প্রতি আঁটি লাল শাক ৫ থেকে ১০ টাকায় বিক্রি হলেও, অগ্রিম বা অসময়ে চাষ করায় বর্তমানে বাজারে প্রতি আঁটি শাক ২০ থেকে ৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ভালো দাম পাওয়ায় বেশ লাভবান হচ্ছেন কৃষকরা।
রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার ইছামতীর তীরবর্তী ঘাটচেক কৃষি মাঠের কৃষক জাফরুল ইসলাম এক বিঘা জমিতে লাল শাক চাষ করে প্রায় ৫০ হাজার টাকা লাভের আশা করছেন। অপর এক কৃষক রহিমা বেগম তার ১২ কাঠা জমির উৎপাদিত লাল শাক বিক্রি করেছেন প্রায় ২৫ হাজার টাকায়। বর্তমানে মাঠ থেকে দলবেঁধে শাক তুলে তা ধুয়ে পরিষ্কার করে স্থানীয় বাজারে নিয়ে বিক্রি করছেন কৃষাণ–কৃষাণীরা।
উপজেলা উদ্ভিদ সংরক্ষণ অফিসার প্রণব চন্দ্র মজুমদার জানান, লাল শাক শুধু লাভজনকই নয়, পুষ্টির দিক থেকেও অত্যন্ত সমৃদ্ধ। প্রতি ১০০ গ্রাম লাল শাকে রয়েছে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, স্নেহপদার্থ, শর্করা, অ্যামাইনো অ্যাসিড, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, পটাশিয়াম, অ্যান্টিঅঙিডেন্ট, আঁশ এবং ভিটামিন এ, বি২, সি, ই, ক্যারোটিন ও আয়রনের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
উপজেলা কৃষি অফিসার বেলাল হোসেন জানান, বর্তমানে এটি বাণিজ্যিকভাবেও চাষ করা হচ্ছে। তবে খরিপ–২ মৌসুমে বৃষ্টিপাত বেশি হলে শাক নষ্ট হওয়ার কিছুটা শঙ্কা থাকে, যা রবি মৌসুমে থাকে না। তা সত্ত্বেও সঠিক পরিচর্যা ও অগ্রিম চাষাবাদের কারণে কৃষকরা দারুণ লাভবান হচ্ছেন। বেকারত্ব দূর করতে পুরুষ কিংবা নারীরা নিজের অথবা বর্গা নেওয়া জমিতে খুব সহজেই লাল শাক চাষ করে ব্যবসা শুরু করতে পারেন। এক্ষেত্রে কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে সার্বিক সহায়তা করা হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।













