যেখানে স্থাপত্যশৈলীর সাথে প্রকৃতির কোনো বিরোধ নেই

কাজী রুনু বিলকিস | সোমবার , ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ১০:৩৫ পূর্বাহ্ণ

পূর্ব প্রকাশিতের পর

টিনামেন স্কোয়ার হলো বিশ্বের বৃহত্তম শহুরে চত্বরগুলোর একটি। টিনামেন স্কোয়ার এর অর্থ হলো চির শান্তির তোরণ। এখানে মাওসেতুং এর স্মৃতিসৌধ ও জাতীয় যাদুঘর রয়েছে। ১৯৪৯ সালে এখানে দাঁড়িয়ে মাওসেতুং গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্টার ঘোষণা দেন। গুটি গুটি বৃষ্টিতে ঘুরাঘুরি শেষে ঢুকে পড়লাম একটা ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁয়। পরিচিত খাওয়ার ও ঘ্রাণ পেয়ে খিদে যেন বেপরোয়া হয়ে উঠলো। গ্রুপের সবাই খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে ফের ঘুরাঘুরিতে বেরিয়ে পড়লাম।এবার আমাদের নেওয়া হলো একটা চা শপে। ভিতরে ঢুকার পর দেখলাম সুন্দর সুন্দর জারে করে রাখা গ্রীন টি। কোনটা ফুল, কোনটা কলি, কোনটা বীজ, কোনটা পাতা। সুন্দরী চীনা নারী খুব সুন্দর করে বুঝানোর চেষ্টা করলো কোনটাতে কি উপকার পাওয়া যাবে। এর মধ্যে শিলা ভাবী একটা জার থেকে দুই একটা বীজ মুখে দিয়ে টেস্ট করে দেখে বারবার তুলে মুখে দিচ্ছিলেন এবং মনোযোগ দিয়ে তাদের কথা শুনছিলেন। এটা দেখে আমরা সবাই মিলে পুরো জারটাই খালি করে দিলাম।

টক মিষ্টি খেতে ভালোই লাগছিল! ওরা আমাদের ছোট ছোট কাপে বিভিন্ন ফ্লেভারের চা টেস্ট করতে দিলো। আমরা যে যার পছন্দ মতো গ্রীন টি কিনে নিলাম। কাউন্টারে দেখলাম আমাদের গাইডের সাথে কিছু একটা বুঝাপড়া চলছে। পরের দিন সকাল দশটায় আমাদের বাস ছুটে চললো বিশ্বের দীর্ঘতম মানব নির্মিত প্রাচীর এবং পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্থাপত্য বিশ্বখ্যাত চায়নার গ্রেট ওয়ালে। এই প্রাচীরের উচ্চতা প্রায় ৫ থেকে ৮ মিটার, দৈর্ঘ্য ২১,১৯৬ কিলোমিটার। এটা বিভিন্ন রাজবংশের আমলে নির্মিত এবং সংযুক্ত প্রাচীর সমষ্টি। এটা ও বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ।

আমাদের বাস থামলো Mutianyu Great wall of Chinai অংশে। বাদালিং অংশের তুলনায় এদিকে তুলনামূলক ভীড় কম। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও শান্ত পরিবেশের কারণে অনেক পর্যটক এই অংশটিকে বেছে নেন। যদি ও এই অংশে কেবল কারের ব্যবস্থা নেই। পায়ে হেঁটে যতদূর যাওয়া যায়। বাস থেকে নেমেই সবাই ছবি তোলার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তারপর শুরু হলো সেই অভিযাত্রা!সিড়ির ধাপগুলি মোটামুটি উঁচু। তারপরেও সামছুল আলম ভাই, পাপড়ি ভাবী, আহমেদ ভাই, করিম ভাই তরতরিয়ে উঠে গেলেন। আমরা একটু উঠে বসে পড়লাম। প্রচণ্ড গরমে হাসফাস অবস্থা। নীচে নেমে আমরা আইসক্রিম খেতে খেতে গল্প করছি। ঘন্টাখানেকের মধ্যে দেখি আমাদের বিজয়ী বীরেরা মেডেল নিয়ে হািিজর! তাদের হাতে সোনালী মেডেল! মেডেলের বুকে তাদের নাম জ্বলজ্বল করছে! যে ভাবীরা আমাদের সাথে বসে ছিলেন তাদের ও নাম খচিত মেডেল নিয়ে এসেছেন উনাদের পতিদেবেরা!!ব্যাপারটা রহস্যজনক।সুক্ষ্ম কারচুপি হলে ও হতে পারে! সন্দেহ জনক বা রহস্যজনক যেটাই হোক উনারা কিন্তু ভিক্টরি সাইন দেখিয়ে বিজয়ের হাসি হেসে ছবি তুলে নিলেন। সবই কপাল আর কি! আরেকটু উঠলে আমরা ও হয়তো নাম খচিত মেডেলের মালিক হতাম!

আসার আগে খাওয়ার নিয়ে বেশ টেনশনে ছিলাম। কিন্তু এখানে আসার পর একেবারেই সমস্যা মনে হয়নি।এখানে হালাল বা মুসলিম দোকান একটু খুঁজলেই পাওয়া যায়। একটাই সমস্যা গুগল কাজ করেনা। তবে VPNসহ অন্য অল্টারনেট অপশন আছে। চীনারা আমাদের মতো ঘরে, হাটে মাঠে, ঘাটে সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে পড়ে থাকে না। শিশুদের জন্য নিষিদ্ধ সরকারিভাবে।

দুপুরের খাবার শেষে আমরা পুনরায় চীনাদের ঐতিহ্যবাহী শ্বাসরুদ্বকর শারীরিক কসরৎ প্রদর্শনী (এক্রোবেট) দেখে হোটেলে ফিরে আসলে কিছুটা ফ্রী টাইম পাওয়া গেল। সন্ধ্যায় শপিং মলে কিছু কেনাকাটা এবং খাওয়া দাওয়া শেষে হোটেলে ফিরে আসলাম।আগামীকাল সকালে সাংহাই যাবো বুলেট ট্রেনে। ব্যাগ গুছিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। এবারের গন্তব্য বুলেট ট্রেনে সাংহাই। অবারিত সবুজের হাতছানি! চোখ জুড়ানো গ্রামের দৃশ্য চোখের পলকে বদলে যাচ্ছে। কোথাও নদী, কোথা ও পাহাড় কোথায় ও বাড়িঘর,খামার। ট্রেনের গতি ঘন্টায় ৩৯৯মাইল। ট্রেনে ও হালাল খাবার পরিবেশন করা হলো। আমাদের ট্রেনে ওঠার সময় খাবারের ব্যবস্থা করে রেখেছিলো বি ফ্রেস। খুব দ্রুত এবং হেসেল ফ্রি জার্নি। স্টেশনে আমাদের জন্য অপেক্ষায় ছিল প্লেকার্ড হাতে সাংহাইয়ের গাইড। মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। আমরা পৌঁছালাম বিশ্বের ব্যস্ততম বানিজ্যিক শহর ও সমুদ্র বন্দর সাংহাইয়ে। এছাড়া বর্তমানে উচ্চ শিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্রেও এটি চীনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। আমরা সাংহাইয়ে উঠেছি রেডিসন ব্লুতে। প্রথম দিন ঘুরলাম পুরনো সাংহাই এবং নতুন সাংহাইতে। নতুন সাংহাই এ উঁচু উঁচু টাওয়ার। দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা, পরিবেশ বান্ধব নকশা,সবুজ প্রযুক্তি ও তাদের আধুনিক প্রকৌশল ব্যবস্থা বিশ্ব ব্যাপী গুরুত্বের দাবি রাখে। একটা ১২৮তলার টাওয়ারের ৮৫ তলায় উঠেছি মাত্র ২২ সেকেন্ডে! সাংহাই শহর সত্যি মনোমুগ্ধকর! অপূর্ব স্থাপত্যে শিল্প, নদী ও সমুদ্রবেষ্টিত রাতের সাংহাই যেন এক কল্পপুরী! পৃথিবীর কত শহর ঘুরেছি তবুও কেন জানি মনে হলো সাংহাই এর আলাদা একটা ব্যাপার আছে।প্রাচ্যের প্যারিস বলা হয় সাংহাইকে। মুগ্ধতায় কেটে গেল সাংহাইয়ের আরও একটি দিন। পরের দিন মার্কেটে কিছু কেনাকাটা করলাম।কিন্তু দিশেহারা অবস্থা। প্রচুর দাম বলে আবার ক্যালকুলেটর এগিয়ে দিয়ে বলে, আমি কত দিতে চাই সেটা লিখতে! দুই হাজারের জিনিস ৫০০শত ইয়ান দিয়েও কিনেছি! প্রচুর দামাদামি করতে হয়।কেউ কারো ভাষা বুঝি না এটাও একটা সমস্যা। তারা ইংরেজী বুঝেনা। একবার কোন দোকানে ঢুকলে সহজে ছাড়তে ও চায়না! তাতে সময় ও নষ্ট হয়। পরে গাইডকে বলেছি আমাদের ফিক্সড প্রাইজ মার্কেটে নেওয়ার জন্য। এরপর সাংহাইকে বিদায় জানিয়ে আমরা অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে গোয়াংজু আসলাম।এখানে ও আমাদের জন্য অপেক্ষায় ছিল গাইড ও টুরিস্ট বাস। যথারীতি বাসে গান, গল্প কবিতা, স্মৃতিচারণ, কৌতুকে চাঙা সবাই হোটেলে এসে পৌঁছালাম। গ্রুপে বেড়ানোর মজাই আলাদা। ক্লান্তিটা খুব বেশি অনুভব করা যায়না। খুলশী ক্লাব থেকে আমরা এর আগে ও দেশে ও দেশের বাইরে ট্যুর করেছি। নেপাল ভ্রমণটা ছিল মনে রাখার মতো। গুয়াংজু জনবহুল শহর। মাঝে মাঝে উঁকি দিচ্ছিলো বাংলায় লেখা হোটেলের নাম। এক ভাবী তো মোটামুটি চিৎকার দিয়ে বলছিলেন ঐ যে বাংলা লেখা! আমরাও কই কই বলে উনাকে অনুসরণ করলাম। তাই তো! এ যে আমাদের প্রাণের ভাষা! আপন কাউকে খুঁজে পাওয়ার মতো সবাই কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলাম।

হালাল হোটেল আর খোঁজাখুঁজির প্রয়োজন নেই! বাংলা হোটেলই সই! পরের দিন সকালে আমাদের যাত্রা শুরু হলো গুলং জর্জ স্কাই ওয়াক গ্লাস ব্রীজ ও ওয়াটার ফ্থলের উদ্দেশ্যে। এটা দেখার জন্য কত উপরে যে উঠতে হয়েছে তা বলে বুঝানো যাবে না। সবচেয়ে কষ্টকর জার্নি ছিল এটা। এক একবার মনে হচ্ছিলো আমরা বুঝি চাঁদের দেশে রওনা দিয়েছি। বিরামহীন সিড়ি ভাঙা! এতটাই গরম ছিল যেন শরীর দিয়ে আগুন বের হচ্ছে। যদিও মাঝে মাঝে জলপ্রপাতের শীতল হাওয়া একটুখানি শান্তির পরশ ছড়িয়ে দিচ্ছিলো। গোয়াংজু শহর থেকে প্রায় সত্তর কিলোমিটার দূরে এই গুলং ক্যানিয়ান ব্রিজ। এটি বিশ্বের দীর্ঘতম কাচের ঝুলন্ত ব্রিজ। এই ব্রিজের বৈশিষ্ট্য হলো 5D glass effect ও UFO কাচের প্লাটফর্ম। এটা সুউচ্চ পাহাড়ের উপর নির্মিত। কত শত সিড়ি ভেঙে এখানে পৌঁছাতে হয়েছে! পাহাড়ের পাশ দিয়ে যেতে ঝোপঝাড় থেকে ড্রাগন মাথা বের করে হুংকার ছাড়ে! ইমরান ও আওয়াজ দেয়, ভুয়া ভুয়া! অবশেষে সেই স্বচ্ছ কাচের ব্রিজ! প্রথম পা রাখতে গিয়ে মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো! নীচে তাকাতেই মনে হচ্ছে পড়ে যাব!এতোটাই স্বচ্ছ, গ্লাস আছে বলেই মনে হচ্ছে না! গাইড পিছনে থেকে দৌড়ে এসে আমার হাত ধরে বললো, Look at the Hill! তারপর সাহস করে হাটতে শুরু করলাম। যেন শূন্যের উপর হেটে চলেছি!

পরের দিন গুয়াংজুতে আমাদের হোটেল থেকে ২৫মিনিট দূরত্বে একজন সাহাবীর মাজার আছে। আমরা সবাই মিলে সকালবেলা গিয়ে জিয়ারত করে আসলাম। এর আগের দিন গুয়াংজুর পাশের প্রদেশ সেনজানের কেন্দ্রীয় মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেছি। চায়নায় পাবলিক প্লেসে কোনরকম ধর্মকর্ম পালন করার সুযোগ নেই। এটা এখানে সরকারিভাবে নিষিদ্ধ। প্রতিটি শহর খুব সুন্দর গোছানো, পরিচ্ছন্ন ও পরিকল্পিত। স্থাপত্যশৈলীর সাথে প্রকৃতির কোনো বিরোধ নেই। মিলেমিশে আরও দৃষ্টিনন্দন করে তুলেছে। আমরা গুয়াংজু থেকেই মোটামুটি প্রয়োজনীয় কেনাকাটা সেরে নিলাম। বর্তমান পৃথিবীতে চীন একটি বড় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, আমেরিকার প্রতিদ্বন্ধী হিসেবে, ভারতের চ্যালেঞ্জ হিসেবে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিনিয়োগকারী হিসেবে। তাছাড়া চীন আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র। বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে পরীক্ষিত বন্ধু। চীন ভ্রমণ আমাদের অভিজ্ঞতার ঝুলিতে নতুন অনেক কিছুই অর্জিত ও সঞ্চিত হলো। ২৭শে জুলাই আমরা দেশে ফিরে আসলাম।

লেখক : প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদৈনিক আজাদী, আমাদের আজাদী
পরবর্তী নিবন্ধকার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে ফিজিওথেরাপি