যুবসমাজকে আত্মনির্ভরশীল হতে হবে

জাহাঙ্গীর মিঞা | শনিবার , ৩১ অক্টোবর, ২০২৬ at ১০:৪৬ পূর্বাহ্ণ

স্বাধীনতা কোনো জাতির জীবনে কেবল একটি অর্জন নয়; এটি আত্মমর্যাদা, অধিকার, দায়িত্ব ও সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত। দীর্ঘ সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতার প্রকৃত সার্থকতা নিহিত রয়েছে তার সুফল সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মধ্যে। আর এই লক্ষ্য অর্জনে যুবশক্তির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তরুণেরাই একটি জাতির প্রাণশক্তি, সৃজনশীলতা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান কারিগর। তাই স্বাধীনতার অর্জনকে অর্থবহ করে তুলতে যুবসমাজকে সচেতন, দায়িত্বশীল, দক্ষ ও আত্মনির্ভরশীল হতে হবে।

স্বাধীনতার সুফল পেতে হলে প্রথমেই স্বাধীনতার প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করা প্রয়োজন। স্বাধীনতা মানে কেবল নিজের অধিকার ভোগ করা নয়; অন্যের অধিকার ও মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকাও এর অপরিহার্য শর্ত। রাষ্ট্রের কাছ থেকে সুযোগ–সুবিধা প্রত্যাশা করার পাশাপাশি রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। আইন মেনে চলা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, সামাজিক সমপ্রীতি বজায় রাখা এবং জনকল্যাণমূলক কাজে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তরুণেরা দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

স্বাধীনতার সুফল অর্জনে শিক্ষার বিকল্প নেই। যুবসমাজকে সনদ অর্জনের গণ্ডি পেরিয়ে জ্ঞান, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ হতে হবে। যুক্তিবাদী চিন্তা, সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি দেশের ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি এবং স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে নিহিত আত্মত্যাগ সম্পর্কে জানতে হবে। শিক্ষাকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করে দেশ ও মানুষের কল্যাণে অবদান রাখার মানসিকতা গড়ে তোলাই হবে তাদের অন্যতম দায়িত্ব।

অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা স্বাধীনতার সুফল ভোগের অন্যতম প্রধান শর্ত। বেকারত্ব ও পরনির্ভরশীলতা কমাতে তরুণদের আধুনিক প্রযুক্তি, কারিগরি শিক্ষা ও যুগোপযোগী দক্ষতা অর্জনে মনোযোগী হতে হবে। শুধু সরকারি চাকরির প্রত্যাশায় সীমাবদ্ধ না থেকে উদ্যোক্তা হওয়া, আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নতুন কর্মক্ষেত্র অনুসন্ধানের দিকে এগিয়ে আসতে হবে। নিজেদের মেধা, শ্রম ও উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারলে ব্যক্তিগত স্বাবলম্বিতার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে।

স্বাধীনতার সুফল নিশ্চিত করতে যুবসমাজকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও নাগরিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। রাজনৈতিক সচেতনতা যেন কোনো দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং তা যেন সত্য, ন্যায়, গণতন্ত্র ও জনস্বার্থের পক্ষে অবস্থান গ্রহণে সহায়তা করে। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, বৈষম্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে আইনসম্মত ও শান্তিপূর্ণভাবে সোচ্চার হওয়া তরুণদের দায়িত্ব। পাশাপাশি ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা, সহনশীলতার চর্চা করা এবং সামাজিক সমপ্রীতি বজায় রাখার মধ্য দিয়ে তারা একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে।

স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল তখনই নিশ্চিত হয়, যখন সমাজের সব শ্রেণি ও পেশার মানুষ উন্নয়নের সুযোগ পায়। তাই যুবসমাজকে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দরিদ্র, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। নারী–পুরুষের সমান অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সব মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সচেতন ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে সততা, শৃঙ্খলা, সহমর্মিতা ও নৈতিকতার চর্চা করতে হবে। মাদক ও অপরাধ থেকে দূরে থেকে খেলাধুলা, সাহিত্যচর্চা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের শক্তি ও প্রতিভাকে গঠনমূলক পথে পরিচালিত করতে হবে।

বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলাও যুবসমাজের জন্য জরুরি। প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার, নতুন জ্ঞান অর্জন, গবেষণা ও উদ্ভাবনে মনোযোগী হওয়ার পাশাপাশি গুজব, অপপ্রচার ও বিদ্বেষ ছড়ানো থেকে বিরত থাকতে হবে। বিশ্বজনীন জ্ঞান ও আধুনিক দক্ষতা অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাষা, দেশীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। পরিবেশ সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রেও তরুণদের সক্রিয় ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন।

পরিশেষে বলা যায়, স্বাধীনতার সুফল অর্জন ও সংরক্ষণ একটি সম্মিলিত দায়িত্ব। তবে এ দায়িত্ব পালনে যুবশক্তির ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা, দক্ষতা, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা, নৈতিকতা ও দেশপ্রেমের সমন্বয়ে তরুণদের নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সচেতন অবস্থান নিয়ে ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ সমাজ প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসতে হবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও মহাপরিচালক, চট্টগ্রাম একাডেমি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধলোকসংস্কৃতি আমাদের অস্তিত্ব
পরবর্তী নিবন্ধসংরক্ষণ পদ্ধতি বিপন্ন বন্যপ্রাণিদের বাঁচতে সাহায্য করে