
আমাদের আলোচিত উপন্যাস এম. নাসিরুল হকের ” যুদ্ধ দিনের প্রেম”। লেখকের মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুর জীবনের সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা এই উপন্যাস। এই উপন্যাসের শুরুতে –“ঐতিহাসিক ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর থেকে বাঙালি জাতির প্রতিটি মানুষ নিজেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে পেশাজীবী, শিক্ষক, কর্মচারী, চাষি, তাঁতি, ছাত্রছাত্রীরা বুঝতে পারে বাঙালি জাতির ভাগ্যে কি ঘটতে যাচ্ছে। তাই সবাই নিজ নিজ স্থান থেকে ঠিক করে নিতে থাকে পরবর্তী সিদ্ধান্ত। ”
বাঙালি জাতির অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে প্রেক্ষাপট শুরু। সাধারণ মানুষ শহর বন্দর থেকে গ্রামের বাড়িতে পাড়ি জমায়। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী পটিয়ার হেডকোয়ার্টারে নায়ক কমল ভট্টাচার্যের বাড়ি। সে বি. এ ক্লাসের পরীক্ষার্থী এবং নায়িকা কৃষ্ণা ভট্টাচার্য আইএসসি প্রথম বর্ষের ছাত্রী। দুইজনের বাড়ি পাশাপাশি না হলেও তারা দুজন পড়ত পটিয়া হেডকোয়ার্টারে অবস্থিত দুই স্কুল এবং কলেজে। নায়িকা কৃষ্ণা সংস্কৃতিমনা ছিল এবং সে রবীন্দ্র ও নজরুল সংগীতে পুরস্কার অর্জন করত আর কমল বিতর্ক প্রতিযোগিতায় ছিল তুখোড় বক্তা। কৃষ্ণা ক্লাসে সব সময় প্রথম স্থান অধিকার করত।
মার্চ মাসের মাঝামাঝি কমল হেডকোয়ার্টারে কৃষ্ণাকে সরাসরি প্রেম নিবেদন করলো। মেধাবী কমল সে কৃষ্ণাকে দেশের তৎকালীন পরিস্থিতির বিষয়ে অবগত করলো এবং বলল ‘আমাদের একদিন পালাতে হতে পারে।’ পঁচিশে মার্চের কালরাত্রির পর ২৭ শে মার্চ সকালে বঙ্গবন্ধুর নামে মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। চট্টগ্রাম শহরের কন্ট্রোল নেওয়ার পরে সেনাবাহিনী যখন গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে তখন সেই খবর পেয়ে কমল কৃষ্ণার সাথে দেখা করতে যায় এবং এলাকা ত্যাগ করার কথা বলে। কৃষ্ণা চমকে উঠলেও পরে রাজি হয়ে যায়। চারিদিকে পাকবাহিনীর হিন্দুদের নির্যাতনের কথা ছড়িয়ে পড়লে পরদিন পটিয়া থানার কাছে জোনাকি স্টুডিও থেকে কৃষ্ণাকে নিয়ে পটিয়ার পশ্চিমে তাদের বন্ধু দীপক বড়ুয়ার বাড়ি গিয়ে আশ্রয় নেয়। তখন বড়ুয়া অধ্যুষিত বাড়িঘরগুলি নিরাপদ ছিল। দলে দলে মানুষ ভারতে বর্ডারের দিকে যেতে থাকে। এখানেও বিপদ দেখে সকলের অমতেই কমল কৃষ্ণাকে নিয়ে তার ক্লাস বন্ধু খালেদের বাড়ি বাঁশখালীর উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। এভাবে অনেক জায়গায় ঘুরে তারা ৩০/৩৫ জন মিলে রাতের অন্ধকারে ভারতের বর্ডার পার হয়ে হরিণা ক্যাম্পে পৌঁছে। তখন মে মাসের প্রথম সপ্তাহ। এখানে ছেলেদের ও মেয়েদের ক্যাম্প আলাদা। এই ক্যাম্পের পরিচালনার দায়িত্ব নেয় ভারতীয় সৈন্যরা। কমল ও কৃষ্ণার ক্যাম্প কাছাকাছি। কমল সেখানে যুদ্ধের জন্য ট্রেনিংয়ের জন্য মনোনীত হয় এবং ৫০ জনের ব্যাটেলিয়ানে যোগ দেয়। এখানেই কাহিনীর নতুন মোড় নেয়।কমল যাওয়ার সময় কৃষ্ণাকে ক্যাম্পের এক ছোট ভাই বজলুর সাথে পরিচয় করে দেয় এবং তাঁকে টিউশনের ব্যবস্থা করে দিতে বলে। কমল বাজার ক্যাম্পে গিয়ে বোমা নিক্ষেপের এবং রাইফেল চালানোর ট্রেনিং নেয়। ট্রেনিং নেওয়ার মাসখানেক পরে যুদ্ধের রণক্ষেত্রে নেমে পড়ে। কৃষ্ণাকে বাজার ক্যাম্পে সুজিত বাবুর বাসায় টিউশনি ঠিক করে দেয় বজলুর। কিন্তু সেখানে এসে সুজিত বাবুর শালা শ্রীকান্তের চোখে পড়ে কৃষ্ণা। এদিকে মে মাসের মাঝামাঝি কমলদের একটি টিমকে বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেয়া হয় পাকবাহিনীকে মোকাবেলা করার জন্য। ফটিকছড়ির আজাদী বাজারের কাছে তারা শত্রুর মোকাবেলা করে। লেখকের মতে, ‘মুক্তি বাহিনী জানতে পারে, রাউজানের গহিরা স্কুলের ক্যাম্প থেকে এসে পাকবাহিনী আজাদী বাজারে দোকান থেকে চাঁদা আদায় করছে।’ সেখানে রাজাকারেরা সহযোগিতা করছে। মুক্তিবাহিনী প্রথমেই রুহুল আমিন প্রকাশ রুহুল্লা নামের রাজাকারকে হত্যা করে। মুক্তিবাহিনী হেঁয়াকো বাজারে পাকীদের জিপে আক্রমণ চালায় এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। এই খবর বিদ্যুৎ গতিতে ছড়িয়ে পড়ে।
বিশিষ্ট সাংবাদিক এম আর আখতার মুকুলের কথিকাটি প্রচারের কথাও বর্ণনা করা হয়। যাতে মুক্তিবাহিনীর উৎসাহ দ্বিগুণ বাড়ে। এদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তাহেরপুরে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি করে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করার কথাও বলা হয়। বিপ্লবী সরকারকে সর্বপ্রথম স্বীকৃতি দান করে ভূটান। কমলদের গ্রুপ কমান্ডার ছিল তোফায়েল আহমেদ। এখানে গহিরা ক্যাম্প হয়ে সর্ব উত্তরে ইয়াসিন নগর এলাকার যুদ্ধের বর্ণনা। মুক্তিযোদ্ধারা পাকবাহিনীর গাড়িতে হামলা চালায় কিন্তু পাকিস্তানিরা পিছু হটলেও সকলে দেখতে পায় কমলের পায়ের গোড়ালিতে একটি গুলি লাগে। তাকে প্রাথমিক চিকিৎসার পরে ক্যাম্প ইনচার্জ জাকারিয়া হাসপাতালে নিয়ে যায়। এর আগে রাতের মধ্যেই বর্ডারের কাছে হরিণা ক্যাম্পে তারা পৌঁছে যায় এবং কমলকে উন্নত চিকিৎসা শেষে ক্যাম্প হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। কমলের ফিরে আসার খবর পেলে কৃষ্ণা তাকে দেখতে যায়। কৃষ্ণা আবার সুজিতবাবুর শালা শ্রীকান্তের নজরে পড়ে। কৃষ্ণা শ্রীকান্তকে পরীক্ষা করার জন্য ভারতীয় নাগরিক হয়েও বাংলাদেশের যুদ্ধে দেশ স্বাধীন করার জন্য মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে বলে। শ্রীকান্ত রাজি হয়ে যায়। শ্রীকান্তের মাধ্যমে ভিনদেশী মুক্তিযোদ্ধার ভূমিকা অমর হয়ে থাকবে। কমল সুস্থ হয়ে ওঠে কৃষ্ণাকে বিয়ে করে। শ্রীকান্তের মীরসরাই এলাকায় পাকবাহিনীর সাথে অপারেশন চলাকালীন মাথায় গুলি লাগে এবং সে শহীদ হয়। ডিসেম্বর মাসের প্রথম দিকে ভারতীয় তিন বাহিনীর সৈন্যরা মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে একযোগে হামলা চালাতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত মিত্রবাহিনীর কমান্ডারের আহবানে পাক বাহিনীর প্রায় ৯৫ হাজার সৈন্য ঢাকায় রেসকোর্সে আত্মসমর্পণ করে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ ঘটে। কমল ও কৃষ্ণা জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে চট্টগ্রাম আসে। এসে তারা দেখে কমলদের বাড়িঘরের বিধ্বস্ত অবস্থা। তারা দুইজনে আবার নতুন করে জীবনযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কমল একদিন জানতে পারে, বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করছে। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে কমলের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। ঢাকায় ট্রেনে এসে সেখানে থেকে ফ্রান্সে প্লেনযোগে যাত্রা। অত্যন্ত দক্ষতার সাথে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা বিষয়টিও তুলে ধরেছেন। কমলকে হাসপাতালে ডায়াস নামে যে মেয়েটির দেখাশুনা করতো সে কমলের প্রেমে পড়ে যায় এবং তাকে প্রস্তাব দেয়। কিন্তু কমল তা নাকচ করে। কমল আবারও হাসপাতালের বাথরুমে পড়ে গিয়ে আঘাত পায়। কিন্তু হঠাৎ করে মায়ের দেওয়া চিঠি পেয়ে কমল ডায়াসকে না জানিয়ে অন্যান্য সহযোদ্ধাদের সাথে অসমাপ্ত চিকিৎসা করে বাংলাদেশে ফিরে আসে আর আজীবন ক্ষত পা নিয়ে কাজ করে যায়। একদিকে দেশ অন্যদিকে প্রেয়সী। সব কিছুই নিটোল ভালোবাসায় মোড়ানো।
লেখক : প্রাবন্ধিক; বিভাগীয় প্রধান, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, নিজামপুর সরকারি কলেজ, চট্টগ্রাম।












