যুদ্ধ অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া সর্বশেষ প্রস্তাবের জবাব দিয়েছে তেহরান। একই সময়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জানিয়েছেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিজেদের তত্ত্বাবধানে সংরক্ষণ করতে প্রস্তুত মস্কো। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুদ্ধজাহাজ পাঠাচ্ছে যুক্তরাজ্য। এর মধ্যেই ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) হুঁশিয়ারি দিয়েছে, ইরানি ট্যাংকারে হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি ও জাহাজে ‘ভারী হামলা’ চালানো হবে। গতকাল রোববার ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা জানায়, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবের জবাব পাঠিয়েছে তেহরান। জবাবে ইরান বলেছে, তারা যুদ্ধ বন্ধ এবং পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে এ বিষয়ে যেকোনো আলোচনার আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে পূর্ণ নিশ্চয়তা চেয়েছে তেহরান। রয়টার্সকে দুই পক্ষের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সর্বশেষ কূটনৈতিক প্রচেষ্টার লক্ষ্য হচ্ছে একটি অস্থায়ী সমঝোতা স্মারকে পৌঁছানো, যাতে পূর্ণাঙ্গ চুক্তির আলোচনা চলাকালে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা যায়। পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো জটিল বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে জানা গেছে। ইরান দাবি করেছে, আলোচনা চলাকালেই তারা দুই দফা হামলার শিকার হয়েছে। ফলে যুদ্ধ কীভাবে স্থায়ীভাবে বন্ধ করা যায় এবং ভবিষ্যতে যেন আর সংঘাত না হয়, সে বিষয়ে আঞ্চলিক দেশ ও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের গ্যারান্টি চায় তেহরান।
সেন্টার ফর মিডল ইস্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো আব্বাস আসলানি আল–জাজিরাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে ইরান সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলেনি; বরং নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে। তার মতে, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েই সবচেয়ে বড় মতবিরোধ রয়ে গেছে। ইরান আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তদারকি ও স্বচ্ছতার বিষয়ে নমনীয় থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র যদি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তর এবং দীর্ঘমেয়াদে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধের দাবিতে অনড় থাকে, তাহলে চুক্তি হওয়া কঠিন হবে।
এদিকে মস্কোয় এক সংবাদ সম্মেলনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পরিবহন ও সংরক্ষণ করতে প্রস্তুত রয়েছে রাশিয়া। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০১৫ সালেও রাশিয়া ইরানের ইউরেনিয়াম স্থানান্তরে ভূমিকা রেখেছিল এবং সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি সম্ভব। পুতিন বলেন, শুরুতে যুদ্ধ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিদেশে স্থানান্তরের বিষয়ে প্রাথমিকভাবে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু পরে যুক্তরাষ্ট্র দাবি তোলে যে ইউরেনিয়াম কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই পাঠাতে হবে। এরপরই তেহরান কঠোর অবস্থানে চলে যায়। তিনি আরও জানান, মস্কো ওয়াশিংটন ও তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখবে এবং যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে বলে তিনি আশা করছেন।
অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করতে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাজ্য। ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ ‘এইচএমএস ড্রাগন’কে এ অঞ্চলে মোতায়েন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। এর আগে ফ্রান্সও লোহিত সাগরে বিমানবাহী রণতরী ও যুদ্ধজাহাজের বহর পাঠায়। মূলত যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স যৌথভাবে একটি বহুজাতিক নিরাপত্তা জোট গঠনের পরিকল্পনা করছে, যার লক্ষ্য হবে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে আস্থা ফিরিয়ে আনা। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, এইচএমএস ড্রাগনকে আগাম মোতায়েন করা হয়েছে, যাতে পরিস্থিতি অনুকূলে এলে যুক্তরাজ্য–ফ্রান্স যৌথ নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক অভিযানে দ্রুত অংশ নেওয়া যায়। জানা গেছে, কয়েক সপ্তাহ ধরেই ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য একটি নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। তবে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে ইরানের সঙ্গে সমন্বয় প্রয়োজন হবে। প্রস্তুতিমূলক বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক দেশও অভিযানে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলার পর শুরু হওয়া সংঘাতে প্রথমদিকে ইউরোপীয় দেশগুলো সরাসরি জড়াতে চায়নি। কিন্তু হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচল বিঘ্নিত হওয়া এবং তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে।
এর মধ্যেই নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে ওমান উপসাগরে ইরানি ট্যাংকারে হামলার ঘটনায়। গত শনিবার আইআরজিসি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ইরানের ট্যাংকার ও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি ও জাহাজে ভারী আঘাত হানা হবে। ইরানি গণমাধ্যমের দাবি, শুক্রবার ওমান উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি যুদ্ধবিমান ইরানি পতাকাবাহী দুটি ট্যাংকারে হামলা চালিয়ে সেগুলো অচল করে দেয়। ওয়াশিংটনের অভিযোগ ছিল, জাহাজ দুটি ইরানের ওপর আরোপিত অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করছিল। গতকাল যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সেন্টার (ইউকেএমটিও) জানায়, কাতারের উপকূলের কাছে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে অজ্ঞাত উৎস থেকে নিক্ষিপ্ত বস্তু আঘাত হানার পর আগুন ধরে যায়। পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপে তিনি বলেন, পারস্য উপসাগরে মার্কিন বাহিনীর সামপ্রতিক তৎপরতা এবং যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো কূটনৈতিক সমাধানের বিষয়ে ওয়াশিংটনের আন্তরিকতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করছে।
এদিকে স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপের কাছে বড় আকারের তেলের স্তর ছড়িয়ে পড়েছে। গ্লোবাল মনিটরিং প্রতিষ্ঠান অরবিটাল ইওএস জানায়, প্রায় ২০ বর্গমাইল এলাকায় তেলের স্তর বিস্তৃত ছিল। যদিও এর কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।












