আলোকচিত্রী ও ফটোসাংবাদিক রঘুরাই সদ্য প্রয়াত হলেন। আলোকচিত্রের জগতে তাকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। ছিলেন ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী আলোকচিত্রী। তবে বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে তিনি অমর হয়ে থাকবেন মহান মুক্তিযুদ্ধের স্থিরচিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার জন্য। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের বিখ্যাত পত্রিকা ‘দ্য স্টেটসম্যান’–এর প্রধান আলোকচিত্র সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি। ঠিক বছরখানেক আগে ওয়েবজিন ‘এসকয়ার ইন্ডিয়া’র সাংবাদিক শ্রীবৎস নেভাটিয়া তাঁর একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। কিন্তু নেভাটিয়া সেই আলাপচারিতাটি ঠিক প্রশ্ন–উত্তরের আদলে না রেখে টানা গদ্যে রূপ দেন। বলা ভাল, গদ্যটি রঘু রাইয়ের জীবন, কাজ, করণকৌশল, উপলব্ধি ইত্যাদির সংক্ষিপ্ত বয়ান। সেই গদ্যটিরই ভাষান্তর করেছেন মাহমুদ আলম সৈকত
আলোকচিত্রী হওয়ার পরিকল্পনা আমার কখনোই ছিল না। আমার বড় ভাই ছিলেন একজন সৌখিন আলোকচিত্রী, কিন্তু ভীষণ আগ্রহী। একদিন, আমি ভাইয়ের সঙ্গে তার এক বন্ধুর গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছিলাম। ভাইকে বললাম, “ক্যামেরাটা দাও, আমি কয়েকটা ছবি তুলতে চাই।” সেই প্রথম আমার কাঁধে একটি ক্যামেরা ঝুলে পড়ল।
গ্রামে একটা গাধার ছোট্ট বাচ্চা চোখে পড়ল, দেখতে খুবই সুন্দর আর মজার। বাচ্চাটা দৌড়াতে শুরু করলে আমি ওটার পেছনে ধাওয়া করি, একটা সময় বাচ্চাটা ক্লান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে যায়, তখন সেই বাচ্চাটার একটি ছবি তুলি। ভাই ছবিটি দেখে মুগ্ধ হয়ে ব্রিটিশ সংবাদপত্র ‘দ্য টাইমস’–এ পাঠিয়ে দেয়। কয়েক সপ্তাহ পর তারা ছবিটি পত্রিকার শেষ পাতায় ছাপায়। সবাই এটিকে বেশ বড় একটা ঘটনা বলে মনে করেছিল তখন, কিন্তু আমার কাছে বিষয়টি খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ কিছু মনে হয় নি।
সেই ছবিটি, সবকিছু মিলিয়ে ভালো হয়ে উঠেছিল কারণ পরিস্থিতি ও মুহূর্তের প্রতি আমার এক স্বতঃস্ফূর্ত অনুভব কাজ করেছিল। যখন আপনি ছবি ও বিন্যাস একসঙ্গে খুঁজতে থাকেন, তখন আপনি আসলে সাধারণ ছবি তোলেন। কিন্তু যখন আপনার অন্তর্দৃষ্টি আপনাকে কোনো মুহূর্ত ধরে রাখতে বলে, তখন সেই জিনিসগুলো আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সেই ছবিগুলোই হয়ে ওঠে অসাধারণ।
গঠন ও বিন্যাস আসে দৈনন্দিন জীবনের উপাদানগুলো থেকেই। আপনি যদি বিন্যাসের নিয়মকানুনে আবিষ্ট না হন, তখন আসলে পরিস্থিতি অনুযায়ী আপনি নিজেই একটি কাঠামো তৈরি করে ফেলেন। আর তখন আপনার ছবিতে নিজস্ব এক শক্তি ও সতেজতা জন্ম নেয়। তাৎক্ষণিক স্বতঃস্ফূর্ততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আপনার চোখ বা দৃষ্টি যদি মন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় বা মনের কাছে বাঁধা থাকে, তখন আবেগপ্রবণতা ও অতীত–অভ্যাসের প্রভাব সেখানে প্রাধান্য পায়। কিন্তু আপনি যদি বর্তমানে, এই মুহূর্তে, অবস্থান করেন, তখন আপনার প্রতিক্রিয়া হয়ে ওঠে স্বতঃস্ফূর্ত ও তাৎক্ষণিক।
আমরা যাকে ‘মন’ নামের বিশাল কম্পিউটার বলি, সেখানে যদি নীরবতা না থাকে, তাহলে সেখানে কোনো স্বচ্ছতা প্রবেশ করতে পারে না। আমরা ক্রমাগত আমাদের মন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আমরা যখনই কিছু করতে চাই, সে বলে, “এটা ঠিক, ওটা ভুল।” সৃজনশীলতার সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হলো এই মন। এটিকে আপনি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবেন না। আপনার সামনে থাকা পরিস্থিতিকে সরাসরি উপলব্ধি করতে চাইলে আপনার দৃষ্টিকে হৃদয়ের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করতে হবে।
কাজের সময় কোনো আবেগের বশবর্তী হয়ে যাওয়া উচিত নয়। আপনি যদি আবেগের রঙে রাঙা হয়ে পড়েন, হোক সে দুঃখ, লজ্জা বা আনন্দ, সেই আবেগ আপনার কাজে প্রতিফলিত হবেই। একজন প্রতিবেদক বা আলোকচিত্রীর কাজ হলো সত্যকে ধারণ করা এবং তা প্রতিফলিত করা। একটি পরিস্থিতিতে যা সত্যিই ঘটছে, তা সে আবেগগত হোক বা রাজনৈতিক, ক্যামেরা সবসময় আপনার পাশে থাকবে, সমর্থন দেবে।
ফটোসাংবাদিক হতে পারটা আমার জীবনে বিশেষ সুযোগ এনে দিয়েছে। এটি আমাকে নানা পরিস্থিতিতে প্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছে। আমার যেমন প্রধানমন্ত্রীদের সঙ্গে দেখা হওয়ার সুযোগ হয়েছে, তেমনি বিখ্যাত সব সঙ্গীতশিল্পী, ফিল্ম ডিরেক্টর, বরেণ্য ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে দেখা হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। এসবই আমার জন্য দারুণ অভিজ্ঞতা ছিল।
জীবনে কখনো এমন ধারণা লালন করা ঠিক না, যে, আমি বা আপনি পৃথিবীকে বদলে দিতে পারব। আপনি বা আমি যা করতে পারি, তা হলো হয়তো তাকে সামান্য ঠেলে এগিয়ে দিতে পারি। আমাদের পৃথিবী এমন কোনো ত্রাতার অপেক্ষায় নেই, যে এসে তার প্রাণ সঞ্চার করবে। আমাদের চারপাশে কী ঘটছে, তার দিকে নজর রাখুন। যুদ্ধ, উন্মাদনা, উগ্রতা থেকে আমরা কী শিখেছি? পৃথিবী ক্রমশ আরও ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠছে। ট্রাম্পকে দেখুন, পুতিনকে দেখুন। তারা কী শিখেছে, এবং কোথা থেকে?
একজন চিত্রশিল্পী তার দৃশ্যপটের সঙ্গে মানিয়ে আকাশকে সবুজ রঙে আঁকতে পারেন। তিনি নিজের ইচ্ছেমতো রঙ মিশিয়ে নিতে পারেন। কিন্তু আমরা যখন রঙিন আলোকচিত্র তুলি, তখন কিছুই পরিবর্তন করতে পারি না, চাই সে রঙগুলো মিলুক বা না মিলুক। কেউ প্রশ্ন তোলে না কেন একজন শিল্পী আকাশকে সবুজ এঁকেছেন, কিন্তু আমরা আলোকচিত্রী যদি তেমন কিছু করি, তখন আমাদের বিরুদ্ধে বিকৃতির অভিযোগ ওঠে। ফলে একটা ছবিকে সাদা–কালোতে রূপান্তর করে রঙের এই কোলাহলকে দূরে সরিয়ে দিতে সাহায্য করে। তখন সুরগুলো একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়, তাতে পরিস্থিতি বা মনের অবস্থা যেমনই হোক না কেন।
ডিজিটাল প্রযুক্তির আগমন আমার জন্য ছিল এক আকস্মিক ধাক্কার মতো। প্রথমবার যখন আমি ডিজিটাল ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুললাম, সঙ্গে সঙ্গেই তা স্ক্রিনে দেখতে পেলাম। সেই অভিজ্ঞতাটি ছিল অসাধারণ! আমার মনে আছে, প্রথম ছয়–মেগাপিক্সেল ক্যামেরা কেনার কয়েক দিনের মধ্যেই আমাকে মুম্বাইয়ে ছবি তোলার একটা বড় দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেই কাজটার জন্য আমার তেমন কোন ফিল্মই ব্যবহার করতে হয়নি। যেদিন প্রথম ডিজিটাল ক্যামেরা ব্যবহার করলাম, সেদিনই যেন আমার কাছে ফিল্মের ব্যবহার ফুরিয়ে গেল।
এখন থেকে একশো বছর পরে কেউ যদি আমার কাজের ভাণ্ডারের দিকে তাকায়, আমি মনে করি তারা তখনকার ভারতের দৃশ্যমান ইতিহাস দেখতে পাবে, আমরা তখন কীভাবে জীবনযাপন করতাম। ভালো সাংবাদিকতা যদি ইতিহাসের প্রথম খসড়া হয়, তবে একটি ভালো ছবি সেই ইতিহাসের প্রথম দৃশ্যমান প্রমাণ। এটাই আমার পেশার প্রকৃত পবিত্রতা।














