দেশের অন্যতম বৃহত্তম দ্বীনি সংস্থা আনজুমান–এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনায় আনজুমান ও জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা, আওলাদে রাসূল, রাহনুমায়ে শরীয়ত ও তরিক্বত, হাদীয়ে দ্বীন ও মিল্লাত, হাফেয ক্বারী সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলায়হির ৬৭ তম সালানা ওরস মোবারক গতকাল বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) জামেয়ার ময়দানে অনুষ্ঠিত হয়। দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির মাধ্যমে শুরু হয়ে বাদে মাগরিব মূল অধিবেশনে সিরিকোট দরবারে আলিয়ার সাজ্জাদানশীন আওলাদে রাসুল আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ সাবির শাহ (ম.জি.আ.) অনলাইন ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে প্রধান মেহমানের বক্তব্য দেন। তিনি মাহফিলে উপস্থিত বাংলাদেশি ভাইদের আন্তরিক মোবারকবাদ জানিয়ে বলেন, আজকে জামেয়া ময়দানে গাউসে জামান কুতুবুল আউলিয়া আল্লামা সৈয়দ আহমদ শাহ সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলাইহির যে আজিমুশশান ওরস মোবারকের আয়োজন করা হয়েছে তাতে দরবারের হজরাতে কেরাম সন্তুষ্ট। তিনি বলেন, আনজুমান ও ভাইদের অনেক পরিশ্রমের ফসল আজকের এ ওরস শরিফ। তিনি আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করে বলেন, ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত আনজুমান আজ তার অভীষ্ঠ লক্ষ্যে পৌঁছে যাচ্ছে। তিনি বলেন, সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলাইহি আনজুমানের মাধ্যমে জামেয়াসহ যেসব নিয়ামত দান করেছেন তা পরিচর্যা করার যে জিম্মাদারি দেয়া হয়েছে তা সঠিকভাবে পালন করতে হবে। তিনি গাউসিয়া কমিটির ব্যাপারে বলেন, এ সংগঠনের আধ্যাত্মিক ও মানবিক কার্যক্রম আজ বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। তিনি দায়িত্বশীলতার সাথে গাউসিয়া কমিটির কার্যক্রম আনজাম দেয়ার আহ্বান জানান। হুজুর কিবলা আনজুমান জামেয়া, গাউসিয়া কমিটি ও দাওয়াতে খায়েরের কার্যক্রমগুলো আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার সাথে পরিচালনা করার আহ্বান জানান।
তিনি দাওয়াতে খায়েরের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, বর্তমান ইসলামের কঠিন বাস্তবতায় দাওয়াতে খায়ের একটি যুগান্তকারী কর্মসূচি। এ কর্মসূচির মাধ্যমে মানুষকে ইসলামের সঠিক বিধান ও শরীয়তের আহকামগুলো শিক্ষা দেয়া হবে। সাধারণ মুসলমানদের বিভিন্ন বাতিল অপশক্তি থেকে সতর্ক করার এক মিশন। তিনি মুসলমানদের সর্বাবস্থায় ঐক্যবদ্ধ থাকার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বলেন, আজ মুসলমানদের অনৈক্যের সুযোগ নিচ্ছে ইহুদী নাসরা ও কুফরি শক্তি। তিনি গাউসিয়া কমিটির করোনাকালীন মানবিক কার্যক্রম তুলে ধরে বলেন, তরিকতের মূল কাজ মানবতার সেবা করা, মজলুম, অসুস্থ ও অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো, গাউসিয়া কমিটি যা আমাদের জন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরেছে। তিনি বলেন, সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলাইহি আমাদের আনজুমান দিয়েছেন, জামেয়া দিয়েছেন, যার মাধ্যমে কুরআন হাদিসের শিক্ষা পাচ্ছি একে আমাদের যত্ন নিতে হবে। তিনি হুজুর কেবলার ওরসের ইন্তিজামের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ ও মোবারকবাদ জানান। পরে হুজুর কেবলা দেশ জাতি ও মুসলিম মিল্লাতের কল্যাণ কামনা করে মোনাজাত করেন।
ট্রাস্টের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মনজুর আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পবিত্র ওরস মাহফিলে স্বাগত বক্তব্য রাখেন আনজুমান ট্রাস্টের সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন। এতে অতিথি ছিলেন চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম–৮ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ এরশাদ উল্লাহ, দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম.এ মালেক, পরিচালনা সম্পাদক ওয়াহিদ মালেক। এতে আরও উপস্থিত ছিলেন আনজুমান ট্রাস্টের অ্যাডিশনাল সেক্রেটারি মোহাম্মদ সামশুদ্দীন, অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি এস.এম গিয়াস উদ্দীন (সাকের), ফাইন্যান্স সেক্রেটারি মোহাম্মদ কমর উদ্দীন (সবুর), প্রেস এন্ড পাবলিকেশন
সেক্রেটারি মোহাম্মদ গোলাম মহিউদ্দীন, ক্যাবিনেট মেম্বার মোহাম্মদ হোসেন খোকন ও মাহমুদ নেওয়াজ, জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদরাসার শায়খুল হাদীস হাফেজ মুহাম্মদ সোলায়মান আনসারী, প্রধান ফকিহ আল্লামা কাজী আবদুল ওয়াজেদ, আনজুমান সদস্য শাহাজাদ ইবনে দিদার, আনোয়ারুল হক, তৈয়বুর রহমান, আবদুল হামিদ, আবদুল হাই মাসুম, প্রফেসর জসিম উদ্দীন, সাদেক হোসেন পাপ্পু, নুরুল আমিন, মাহবুবুল আলম, মাহবুব ছাফা, আর.ইউ চৌধুরী শাহীন, মুহাম্মদ ইলিয়াছ, হাফেজ মুহাম্মদ মারুফুর রহমান, মুখপাত্র অ্যাড. মোছাহেব উদ্দীন বখতিয়ার, আনজুমান এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট বোর্ডের সচিব আবু ছালেহ মুহাম্মদ নঈম উদ্দীন, জামেয়ার শিক্ষক–কর্মচারী–শিক্ষার্থীবৃন্দ, গাউসিয়া
কমিটি বাংলাদেশের বিভিন্ন স্তরের সদস্যবৃন্দ এবং হাজার হাজার পীরভাই–বোন ও অলিপ্রেমিক।
অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন আনজুমান এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট বোর্ডের পরিচালক প্রফেসর ড. নূ.ক.ম আকবর হোসেন, জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ অছিয়র রহমান, বর্তমান অধ্যক্ষ হাফেজ কাজী আবদুল আলীম রিজভী, উপাধ্যক্ষ ড. এটিএম লিয়াকত আলী, ঢাকা মোহাম্মদপুর কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া কামিল মাদরাসার উপাধ্যক্ষ মুফতি আবুল কাশেম মুহাম্মদ ফজলুল হক, হালিশহরস্থ মাদরাসা–এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়ার অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভী, জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া মহিলা কামিল মাদরাসার উপাধ্যক্ষ ড. মাওলানা মুহাম্মদ সাইফুল আলম প্রমুখ। সঞ্চালনায় ছিলেন জামেয়ার আরবি প্রভাষক মাওলানা মুহাম্মদ জয়নুল আবেদীন কাদেরী।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, আল্লামা সৈয়দ আহমদ শাহ সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলাইহি ১৯৫৪ সালে এ চট্টগ্রামে এসে ইসলামী শিক্ষার বিস্তার ও প্রসারে জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া প্রতিষ্ঠা করেন, এ মাদ্রাসা থেকে লাখো লাখো আলেম ও শিক্ষিত মনিষী বের হয়েছে তারা দেশ জাতি ও সমাজে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অবদান রেখে যাচ্ছেন। তিনি চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে শতভাগ আন্তরিকতার সাথে কাজ করা হচ্ছে বলে ঘোষণা দিয়ে বলেন, আগামী বছর থেকে আর কোনো জলাবদ্ধতা হবে না ইনশাআল্লাহ। তিনি নগরবাসীকে ধৈর্য্য ধারণ করে তাদের উপর আস্থা রাখার আহ্বান জানান। সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ বলেন, আল্লামা সৈয়দ আহমদ শাহ সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলাইহির প্রতিষ্ঠিত এ মাদ্রাসা এখন ইসলামের মৌলিক আক্বিদা প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তিনি বলেন, এ মাদ্রাসা আলেম
সৃষ্টির কারখানা সিরিকোটি রহমাতুল্লাহির পর আল্লামা তৈয়ব শাহ রাহমাতুল্লাহি আলায়হি আনজুমানের কার্যক্রমকে সমপ্রসারণ করেছেন। তিনি এ অঞ্চল থেকে তাকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত করায় ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, এ মাদ্রাসার উন্নয়নে তিনি তাঁর সাধ্যমত সবকিছু করবেন।
দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক বলেন, আবদুল খালেক ইঞ্জিনিয়ার ১৯৪৬ সালে আল্লামা সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে দাওয়াত দিয়ে চট্টগ্রামে নিয়ে আসেন এবং আমাদের আন্দরকিল্লা বাসায় অবস্থান করেন। তিনি রেঙ্গুনের বাঙালি মসজিদের শুধু পেশ ইমাম ছিলেন না; উঁচু মার্গের সুফি সাধক ছিলেন। আব্বা বিদ্যুৎ প্রকৌশলী হিসেবে
বার্মায় গিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। সেখানে তিনি হুজুরের হাতে বায়াত নেন। তিনি বলেন, হুজুরের আদর্শ কর্ম ও অবদানগুলো মর্মে ধারণ করতে হবে, বাস্তব জীবনে প্রতিফলন ঘটাতে হবে। এম এ মালেক ইসলামের শ্বাসত আহ্বান কুরআনকে মানব জীবনের একমাত্র অনুসরণীয় জীবন বিধান হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, আমাদের সত্যবাদী ও বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হতে হলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের নির্দেশিত পথ ও আউলিয়াদের রেখে যাওয়া আদর্শকে ধারণ করতে হবে। তিনি সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলাইহির মিশনের সাথে শুরু থেকে যারা যুক্ত ছিলেন তাদের শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন।
আনজুমান সেক্রেটারি জেনারেল আলহাজ্ব আনোয়ার হোসেন বলেন, আনজুমান ও জামেয়ার প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ আহমদ শাহ সিরিকোটি রহমাতুল্লাহি আলাইহির ৬৭তম সালানা জলসায় যেভাবে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ঢল নেমেছে তাতে আমরা অভিভূত। তিনি আরাকিনে আনজুমান, জামেয়ার শিক্ষক ছাত্রসহ মাহফিলে আগত পীর ভাইদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। এসময় তিনি সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন ও সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহকে ধন্যবাদ জানিয়ে জামেয়ার উন্নয়নে তাদের সহযোগিতা কামনা করেন।
আনজুমানের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আলহাজ্ব মনজুর আলম (মনজু) বলেন, আনজুমান
এ দেশের সর্ববৃহৎ আধ্যাত্মিক সংগঠন। এ সংগঠনের যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তা পূরণে বর্তমান আনজুমান আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে আনজুমানের কার্যক্রমকে গতিশীল করতে প্রয়াস চালানো হয়েছে। আমাদের বিশ্বাস অনেকগুলো দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের প্রত্যাশা অনেক সে অনুযায়ী প্রাপ্যের সীমাবদ্ধতা আছে তবে আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের সাথে মদিনাওয়ালা আছেন, আছেন আওলাদে রাসুল। সুতরাং আমরা আন্তরিকতার সাথে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করলে সফল হব ইনশাআল্লাহ। তিনি বলেন, আনজুমানের বিশাল কাজ আনজাম দিতে দক্ষ নেতৃত্ব দরকার আর সেই নেতৃত্ব আপনাদের মধ্য থেকে উঠে আসবে ইনশাআল্লাহ। তিনি দাওয়াতে খায়েরের কার্যক্রমকে বেগবান করতে আল্লামা এম এ মান্নান ও এড. মোছাহেব উদ্দিন বখতিয়ারের নেতৃত্বে যে সব কর্মসূচি চলছে তাকে সফল করার আহ্বান জানান। তিনি আনজুমান অ্যাডুকেশন বোর্ড গঠনকে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এ বোর্ড জামেয়াসহ আনজুমান পরিচালিত মাদ্রাসাসমূহকে আধুনিক ও যুগোপযোগী মাদ্রাসা হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি এ বোর্ড যা কিছু সুপারিশ করবে তা দ্রুত সময়ে বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানান। তিনি মহিলা মাদ্রাসার অবকাঠামো উন্নয়নসহ জামেয়ার উন্নয়ন ও শিক্ষার গুণগত মান উন্নত করার বিভিন্ন পরিকল্পনা তুলে
ধরেন।














