মানুষের মূল্যায়ন হোক পরিশ্রম ও ত্যাগের ভিত্তিতে

শাহেদ সরওয়ার | রবিবার , ১ নভেম্বর, ২০২৬ at ১০:৩৭ পূর্বাহ্ণ

সমাজ কি সত্যিই মানুষকে তার প্রাপ্য মর্যাদা দিতে জানে? আজকের সমাজে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য চোখে পড়ে। কেউ অল্প সময়ে বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে সম্মান ও প্রভাবের কেন্দ্রে চলে আসেন। আবার কেউ বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম, আত্মত্যাগ ও প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করেও যথাযথ মূল্যায়ন পান না। প্রশ্ন হলো, মানুষের মর্যাদার মাপকাঠি কি কেবল সম্পদ, নাকি সেই সম্পদ অর্জনের পেছনে থাকা শ্রম, সততা ও সংগ্রামের ইতিহাস?

ধন–সম্পদ অর্জন অপরাধ নয়; বরং সৎ উপায়ে আর্থিকভাবে সফল হওয়া অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু সম্পদের উৎস ও অর্জনের নৈতিকতা উপেক্ষা করে কেবল অর্থের ভিত্তিতে কাউকে বড় করে দেখা সুস্থ সমাজের পরিচয় হতে পারে না। একজন মানুষ কীভাবে তাঁর অবস্থান তৈরি করেছেন, কতটা সততা বজায় রেখেছেন এবং অন্যের প্রতি কেমন আচরণ করেছেন এসব বিবেচনাই তাঁর প্রকৃত মূল্যায়নের ভিত্তি হওয়া উচিত।

অন্যদিকে, কঠোর পরিশ্রম ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে জীবন গড়ে তোলা মানুষের গল্প অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়। তাঁদের সাফল্যের পেছনে থাকে অসংখ্য ব্যর্থতা, ব্যক্তিগত ইচ্ছার বিসর্জন, পরিবারের দায়িত্ব এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রাম। তাঁরা হয়তো বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন না কিংবা নিজেদের অর্জনের প্রচার করতে জানেন না। কিন্তু তাঁদের শ্রম, সততা ও দায়িত্ববোধের মূল্য কোনো অংশেই কম নয়।

দুঃখজনকভাবে, আমাদের সমাজে অনেক সময় মানুষের যোগ্যতার চেয়ে তাঁর অর্থ, গাড়ি, বাড়ি, পোশাক ও সামাজিক প্রভাব বেশি গুরুত্ব পায়। সম্পদশালীর কথায় গুরুত্ব বাড়ে, অথচ নীরবে দায়িত্ব পালন করে যাওয়া মানুষের অবদান সহজেই বিস্মৃত হয়। এভাবে সম্পদের জৌলুস মানুষের প্রকৃত পরিচয়কে আড়াল করে দেয়।

মনে রাখতে হবে, সম্পদ মানুষের আর্থিক সামর্থ্যের পরিচয় দিতে পারে, কিন্তু সব সময় চরিত্রের নয়। সামাজিক প্রভাব পরিচিতি বাড়াতে পারে, কিন্তু মানুষের মহত্ত্ব নির্ধারণ করতে পারে না। একজন মানুষ কত দ্রুত ধনী হয়েছেন, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনি কীভাবে সেই অবস্থানে পৌঁছেছেন। অন্যদিকে, দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে সামান্য সম্পদ গড়ে তোলা মানুষটির অর্জনও সমানভাবে সম্মানের দাবিদার, যদি তার ভিত্তি হয় সততা, ধৈর্য ও দায়িত্বশীলতা।

সমাজের উচিত বাহ্যিক চাকচিক্যের মোহ কাটিয়ে মানুষের প্রকৃত অবদানকে মূল্যায়ন করা। একজন সৎ শ্রমিক, নিষ্ঠাবান কর্মী– প্রত্যেকেই সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখেন। তাঁদের যথাযথ সম্মান জানানো পরবর্তী প্রজন্মকে সৎ পথে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জোগায়। জীবনের সাফল্য সব সময় সম্পদের অঙ্কে লেখা থাকে না। কখনো তা প্রকাশ পায় একজন বাবার আত্মত্যাগে, একজন মায়ের নিরলস পরিশ্রমে। তাই আসুন, মানুষকে তাঁর সম্পদের উচ্চতা দিয়ে নয়, চরিত্রের গভীরতা দিয়ে মূল্যায়ন করি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবিপণি বিতান এলাকায় ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য
পরবর্তী নিবন্ধযুবশক্তির জয় হোক