মাদক প্রতিরোধে প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন

নুরুল মুহাম্মদ কাদের | মঙ্গলবার , ১৬ জুন, ২০২৬ at ৮:৩৮ পূর্বাহ্ণ

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রতিদিন নানা সমস্যায় জর্জরিত মানুষ আসে। সমপ্রতি এক দম্পতি এসে জানালেন, তাদের অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া সন্তান মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েছে। বাবা একজন ইলেকট্রিক মিস্ত্রি। মাদকের টাকা না দেওয়ায় সে বাবামাকে হত্যার হুমকি দিয়েছে। জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে তারা প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছেন। এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয় বরং সমাজে অহরহ ঘটছে।

আগে শহর ও গ্রামে গোপনে মাদক সেবন করা হতো, এখন তা প্রকাশ্যে হচ্ছে। মাদক গ্রহণের পর তারা অলিগলিতে দলবেঁধে আড্ডা দেয়, সুযোগ পেলেই টাকা জোগাড় করতে চুরিছিনতাই করে। যৌন উত্তেজনায় তারা ধর্ষণ বা ধর্ষণের চেষ্টা করে। এদের কারণে দিনের আলোতেও নগরীর অনেক এলাকায় যাতায়াত করতে ভয় হয়। পথচারীরা নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে এড়িয়ে যায়, ফলে ভুক্তভোগীরা অসহায় হয়ে পড়ে। সমপ্রতি পতেঙ্গা ও রাঙ্গুনিয়ায় মাদকবিরোধী মানববন্ধন ও সমাবেশ হয়েছে। নিঃসন্দেহে সমাজের জন্য এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ আর নেই। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সচেতন জনগোষ্ঠী অনেক সময় নির্লিপ্ত থাকে। তারা মনে করে সরকারই মাদক নির্মূল করবে। অথচ মাদক প্রতিরোধে সরকারের পাশাপাশি সমাজের প্রতিটি সচেতন নাগরিককে এগিয়ে আসতে হবে।

ধর্মীয় ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে নেশাজাতীয় দ্রব্যকে বলা হয় ‘উম্মুল খাবাইস’ বা সব পাপের জননী। কারণ, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় মানুষের বিবেক লোপ পায়। তখন সে ব্যভিচার, চুরি, ছিনতাই, শত্রুতাসহ সব ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। বুজুর্গ বা বিজ্ঞজনেরা এ রূপক ঘটনার মাধ্যমে সাবধান করেছেন যে, এক ব্যক্তিকে তিনটি অপরাধের মধ্যে একটি বেছে নিতে বলা হয়েছিল: শিশুহত্যা, ব্যভিচার অথবা মদপান। সে মদপানকে কম ক্ষতিকর ভেবে রাজি হয়। কিন্তু মদপানের পর বিবেক হারিয়ে একে একে অন্য দুটি জঘন্য অপরাধও করে ফেলে। মাদক নামক এই পাপের জননীকে সমাজ থেকে নির্মূল করতে অন্তত নিম্নলিখিত কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।

. সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা: পাড়ামহল্লা, মসজিদমন্দিরে মাদকবিরোধী ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। ২. সাপ্তাহিক উদ্যোগ: প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজের পর কিংবা অন্যান্য ধর্মীয় সমাবেশে মাদকবিরোধী প্রচারণা চালানো যেতে পারে। ৩. সচেতন নাগরিকের ভূমিকা: মাদকসেবী ও বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে সামাজিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। ৪. যুবসমাজকে সম্পৃক্ত করা: খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও ইতিবাচক বিনোদনের মাধ্যমে তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে হবে। ৫. কমিউনিটি ওয়াচ গ্রুপ: স্থানীয়ভাবে মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে নজরদারি। ৬. স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন: মাদকাসক্তদের পুনর্বাসন ও কাউন্সেলিং। ৭. কঠোর আইন: মাদক মামলায় ধারার কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করে জামিনের সুযোগ সীমিত করা এবং মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার প্রয়োগের দাবি।

মাদক শুধু ব্যক্তিকে নয়, পুরো সমাজকে ধ্বংস করে। তাই মাদকের আগ্রাসন প্রতিহত করা এখন সময়ের দাবি। সচেতন নাগরিকরা যদি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ায়, তবে মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। মনে রাখতে হবে আজ আমরা যদি নির্লিপ্ত থাকি, কাল হয়তো আমাদের পরিবারই এই আগ্রাসনের শিকার হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধআমরা ক্রমশ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছি!
পরবর্তী নিবন্ধবসবাসের জন্য টাইটান!