মাতারবাড়িতে হচ্ছে বিলিয়ন ডলারের গ্রিন ডকইয়ার্ড

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদন সরকারি জমি রেখে পিপিপি মডেলে বাস্তবায়ন বাড়বে ব্লু-ইকোনমির সক্ষমতা

হাসান আকবর | মঙ্গলবার , ১৪ জুলাই, ২০২৬ at ৫:৫৬ পূর্বাহ্ণ

মাতারবাড়িতে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে পরিবেশবান্ধব ‘মাতারবাড়ি গ্রিন ডকইয়ার্ড অ্যান্ড শিপ বিল্ডিং ফ্যাসিলিটি’ নির্মাণে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। সরকারি জমির মালিকানা অক্ষুণ্ন রেখে পাবলিকপ্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) এবং ‘ল্যান্ডলর্ড মডেল’ এর আওতায় বাস্তবায়ন হতে যাওয়া এ প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে প্রস্তাবটি ইতোমধ্যে পিপিপি কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। গতকাল সোমবার বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

সূত্র জানায়, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের কার্যকারিতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক মানের জাহাজ মেরামত সুবিধা গড়ে তোলা, ব্লুইকোনমির বিকাশ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি দীর্ঘদিন প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে থাকলেও গত ৭ জুন অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় শিল্প মন্ত্রণালয় অনাপত্তি (এনওসি) দেওয়ার পর এর বাস্তবায়নের পথ সুগম হয়। যদিও রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী, ডকইয়ার্ড শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত। তবুও প্রকল্পটির কৌশলগত গুরুত্ব এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা বিবেচনায় এটি এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। প্রকল্পে প্রধান বিনিয়োগকারী হিসেবে রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিষ্ঠান এআইএস মেরিন ইনভেস্টমেন্ট পিটিওয়াই লিমিটেড।

পিপিপির ল্যান্ডলর্ড মডেলে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পে নির্ধারিত প্রায় ২০০ একর জমির মালিকানা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই থাকবে। চুক্তির মেয়াদ শেষে নির্মিত সব অবকাঠামো রাষ্ট্রীয় মালিকানায় হস্তান্তর করা হবে। প্রকল্পের আওতায় ৬০০ মিটার দীর্ঘ এবং ৯৫ মিটার প্রশস্থ একটি আধুনিক ড্রাই ডক নির্মাণ করা হবে, যেখানে বঙ্গোপসাগর ও মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরে চলাচলকারী বড় আকারের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ মেরামতের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বর্তমানে এ ধরনের ভারী মেরামতের জন্য জাহাজগুলোকে সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত কিংবা চীনের বন্দরে যেতে হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডকইয়ার্ডটি চালু হলে বন্দরের চ্যানেলে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ দ্রুত মেরামত করা সম্ভব হবে। ফলে বন্দরের কার্যক্রম সচল থাকবে, অপারেশনাল নিরাপত্তা বাড়বে এবং জাহাজ মালিক ও অপারেটরদের সময় ও ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।

এটি দেশের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ‘গ্রিন ডকইয়ার্ড’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) পরিবেশবান্ধব নির্দেশনা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে এতে স্বল্পনিঃসরণ শক্তি ব্যবস্থা, ক্লোজডলুপ বর্জ্য পানি শোধন প্রযুক্তি এবং আধুনিক বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংযোজন করা হবে।

প্রকল্পটি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নেও ভূমিকা রাখবে বলে দাবি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ জন প্রকৌশলী ও দক্ষ কারিগরের সরাসরি এবং আরও প্রায় ২ হাজার ৬০০ জনের পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

এছাড়া মহেশখালীমাতারবাড়ি এলাকায় গড়ে ওঠা শিল্প, জ্বালানি, বন্দর ও লজিস্টিকস হাবকে সহায়তা করবে এই ডকইয়ার্ড। স্থানীয় প্রকৌশল শিল্প, ইস্পাত, লজিস্টিকস এবং সামুদ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থারও প্রসার ঘটবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড এবং দেশিবিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ দেশের মাটিতেই আন্তর্জাতিক মানের মেরামত সুবিধা পাবে।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদনের পর এখন প্রকল্পটির কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়নের কাজ পিপিপি কর্তৃপক্ষের অধীনে এগিয়ে চলছে। সরকারি ঋণের ঝুঁকি ছাড়াই সম্পূর্ণ বেসরকারি বিনিয়োগে বাস্তবায়িত এই প্রকল্প দেশের ব্লুইকোনমি, সামুদ্রিক শিল্প এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও বন্দর সচিব জানিয়েছেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামে আরও ১৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত
পরবর্তী নিবন্ধকাপ্তাই বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ছাড়াল ২০০ মেগাওয়াট