সপ্তম শতাব্দীতে সুফিদের মাধ্যমে আরব থেকে ভারতবর্ষে ইসলাম ধর্মের প্রচার–প্রসার শুরু হয়। সুফিরা এ অঞ্চলে খানকাহ্ প্রতিষ্ঠা করে পথহারা মানুষকে সত্যের দিকে ধাবিত করেছেন। শুনিয়েছেন শান্তির বাণী। সুফিরা ছিলেন উদার, কল্যাণকারী, বিনয়ী সহ বহুগুণে গুণান্বিত। সুফিদের উত্তমচরিত্রের কারণে সর্বধর্মের মানুষ সহজেই তাঁদের গ্রহণ করে নেয়। তাঁরা সহজিয়া ধারার মাধ্যমে মানুষকে নিখুঁতভাবে ইসলাম শিক্ষা দিয়েছেন। তাদের শিক্ষা আল্লাহ প্রদত্ত। কারণ তাঁরা আল্লাহর জ্ঞানে জ্ঞানী। অতএব আমরা সঠিক ইসলাম পেয়েছি তাঁদের মাধ্যমে। ইসলামের দুটি ধারা। একটি সহজিয়া, অপরটি রক্ষণশীল ধারা। সুফিদের মাধ্যমে প্রাপ্ত ধারার নাম সহজিয়া ধারা। সহজিয়া ধারার পাশাপাশি রক্ষণশীলধারার আগমন ঘটলেও এরা মানুষকে খুব একটা প্রভাবিত করতে পারেনি।
সুফিরা দিয়েছেন আল্লাহর একত্ববাদের শিক্ষা। শিখিয়েছেন কীভাবে আল্লাহর আনুগত্য করতে হয়, কীভাবে আল্লাহর প্রিয়তম হাবিব রহমতুল্লিল আলামিন হজরত আহমদ মুজতবা মোহাম্মদ মোস্তফা (দ.)কে তাজিম করতে হয়। কীভাবে তাঁর প্রতি দরুদ শরিফ পাঠ করে প্রেম–ভক্তি নিবেদন করতে হয়। দরুদ শরিফ হল –রসূলে পাক (দ.)’র প্রশংসাগীতি বর্ণনের মাধ্যমে তাঁর প্রতি ভক্তি–প্রেম নিবেদনের বহিঃপ্রকাশ)। সুফি–আউলিয়াদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে আমাদের পিতা–মাতা, মুরব্বিরা প্রতিদিন সন্ধ্যার পর ঘরের সম্মুখে বসে রসূলেপাক (দ.)’র দরুদ, মিলাদ কিয়াম পাঠ করতেন, প্রয়াত মুরব্বিদের জন্য দোয়া করতেন। জুমার নামাজের পর আল্লাহর অলিদের মাজার শরীফ জেয়ারত করে তাঁদের উসিলা নিয়ে বিশেষ প্রার্থনা এবং প্রয়াত পিতা মাতা, দাদা–দাদী, নানা–নানি সহ বাড়ির সকল মুরুব্বীদের কবর জেয়ারত করে তাঁদের আত্মার শান্তির জন্য আল্লাহর দরবারে বিশেষ মোনাজাত করতেন। এটি ছিল চিরায়ত গ্রাম বাংলার মুসলমানদের নিত্যনৈমত্তিক ব্যাপার। বংশপরম্পরায় আমরাও পালন করে এসেছি। রাতে দরুদ পড়তে বলার কারণ-(দিনেও পড়া যায়) সাধারণত মানুষ দিনে জাগতিক কর্মকাণ্ড, হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করার পর রাতে বিশ্রামে থাকে। এ সময় মন পবিত্র থাকে। পবিত্র মন নিয়ে রসূলেপাকের দরুদ পাঠে আত্মিক প্রশান্তি আসে। জাগতিক ও আধ্যাত্মিক উপকার হয়। আর যে ঘরে দরুদ পাঠ হয় সেই ঘরে অগণিত আল্লাহর রহমত বর্ষণ হয়। সুফিরা নবীর উপর বেশি দরুদ শিক্ষা দেওয়ার মূল উৎস পবিত্র কোরআন শরীফ। পবিত্র কোরআন শরীফে আছে, আল্লাহ বলেছেন– ‘নিশ্চয় আল্লাহ ও ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি দরুদ পাঠ করেন। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও বেশি করে তাঁর উপর দরুদ পড়ো’। (সূরা আহযাব, আয়াত ৫৬)। লক্ষণীয় যে আল্লাহ কখনো বান্দাদেরকে বলেনি আমি স্বয়ং রোজা রাখি তোমরাও রাখো, আমি নামাজ পড়ি তোমরাও পড়ো, আমিও যাকাত দিই, হজ করি তোমরাও কর। কিন্তু নবীর উপর দরুদ এতই গুরুত্বপূর্ণ ও সীমাহীন ফজিলতপূর্ণ এবাদত যে, আল্লাহ বলছেন–আমি স্বয়ং নবীর প্রতি দরুদ পড়ি, আমার ফেরেশতারাও পড়ে। অতএব তোমরাও দরুদ পড়। পবিত্র কুরআনের এই আয়াতের পর দরুদের ফজিলত এবং দরুদ পাঠকারীদের মর্যাদা সম্পর্কে বেশি কিছু বলার অবকাশ থাকে না। এজন্য সুফিরা বেশি দরুদ পাঠ করার শিক্ষা দিয়েছেন। সুফিদের শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সহজিয়া ধারার মুসলমানগণ মোহব্বতের সহিত দরুদ পাঠ করাকে অধিক গুরুত্ব সহকারে দেখেন। মুরুব্বী পরম্পরায় আমরাও এই শিক্ষা পেয়েছি। হজরত ইবনে মাসউদ (রা.) হতে বর্ণিত–রসূল(দ.) বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন ওই ব্যক্তি আমার বেশি নিকটবর্তী থাকবেন, যে আমার প্রতি অধিক দরুদ পড়ে’। (তিরমিজি –৪৮৪)। প্রিয়তম সাহাবী হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত–রসুলে পাক (দ.) বলেন, ‘যে আমার প্রতি একবার দরুদ পাঠ করবে, আল্লাহ তার উপর দশটি রহমত বর্ষণ করবে।’ (সুনানে তিরমিজি –৪৮৫)।
বিশেষ করে জুমার দিন দরুদ পালনে রয়েছে বিশেষ ফজিলত। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত (অর্থাৎ জুমার দিন) দরুদ শরীফ পাঠ করার জন্য নবী মোহাম্মদ (দ.) বেশি গুরুত্বারোপ করেছেন।
সুফিদের খানকাহতে তৎকাল থেকেই বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে দরুদ, মিলাদ, কিয়াম, ফাতেহার আয়োজন সহ নানা আপ্যায়নের ব্যবস্থা থাকতো। মানুষকে খাওয়ানো উত্তম ইবাদত। এ ধারা আল্লাহর ওলীদের দরবারে এখনো প্রবহমান। এজন্য রসুল প্রেমিকরা বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে অলীদের দরবারে জমায়েত হয়ে সম্মিলিতভাবে দরুদ পেশ করেন। জুমার দিন (বৃহস্পতিবার সূর্যাস্ত থেকেই জুমার দিন শুরু হয়) দরুদ শরীফ পাঠ করার রহস্য হল–রসুলে পাকের হাদিস। জুমা মহিমান্বিত ও মর্যাদাপূর্ণ একটি দিন। রসূলেপাক (দ.) বলেছেন– “নিশ্চয়ই জুমার দিন শ্রেষ্ঠদিনগুলোর মধ্যে অন্যতম। রসূলেপাক (দ.) বলেছেন, ‘দিনগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠদিন হল জুমা‘র দিন। ঐদিন হজরত আদম(আ.)কে সৃষ্টি করেছে, বিকট শব্দে কেয়ামত সংঘটিত হবে। কাজেই ঐদিন তোমরা বেশি করে আমার ওপর দরুদ পড়ো। কেননা তোমাদের পঠিত দরুদ সমূহ ঐদিন আমার নিকট পেশ করা হয়’। অন্য হাদিসে তিনি আরো বলেছেন, ‘তোমরা জুমার দিন ও রাতে আমার উপর বেশি করে দরুদ পাঠ কর। যে আমার প্রতি একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তাঁর উপর দশটি রহমত বর্ষণ করেন’ (জমিউল জামে–১২০৯)।
মুশকিলকোশা হজরত আলী (আ.) বলেন-‘যে ব্যক্তি জুমার দিন ১০০ বার দরুদ পড়বে, কেয়ামতের দিন সে এমনভাবে উঠবে তাঁর চেহারা নূরে পূর্ণ থাকবে। তাঁর চেহারা দেখে সবাই বলাবলি করবে এই ব্যক্তি এমন কী আমল করেছিল –যেজন্য চেহারায় এমন নূর’। (খানজুল উম্মাল –১৭৪)। হজরত আবু হুরায়রা(রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে– রসূল(দ.) বলেন-‘নিশ্চয় আমার প্রতি দরুদ পাঠ পুলসিরাতে আলো (নূর) হিসেবে থাকবে। এবং যে ব্যক্তি জুমার দিনে ৮০ বার দরুদ পাঠ করবে, তাঁর ৮০ বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে’। (আল ফিরদাউস বিমাসরিন খাত্তাব–৩৮১৪)। রসূল পাক(দ.) এতই দয়াবান যে উম্মতের মুক্তি এবং উম্মতগণ যাতে সহজে অধিক মর্যাদাবান হতে পারেন, সেজন্য কোন দিন দরুদ পাঠে অধিক মর্যাদাবান হওয়া যায় সেটাও স্বয়ং রসূলে পাক(দ.) শিখিয়ে দিয়েছেন। আখিরাতে মুক্তির জন্য এর চেয়ে সহজলভ্য মাধ্যম আর কী হতে পারে? যেখানে স্বয়ং আল্লাহপাক প্রিয় হাবিবের দরুদ পড়েন, বান্দাদের পড়ার তাগিদ দিয়েছেন এবং স্বয়ং রসুলেপাক কোন দিন, কীভাবে দরুদ শরীফ পাঠ করলে বেশি উপকৃত হওয়া যায় সেটাও শিখিয়ে দিয়েছেন। তাই বেশিবেশি করে দরুদ পড়ুন। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত হয়ে উঠুক ঘরে ঘরে দরুদ শরীফের রাত। সুবুদ্ধিতে দরুদ শরীফ। অর্থাৎ–সুবুদ্ধিতে রসুল(দ.)। প্রখ্যাত সুফিসাধক গাউসে ভান্ডার হজরত মওলানা মতিয়র রহমান শাহ্(ক.) ফরহাদাবাদীর সুরে বলতে হয়-‘সুবুদ্ধিতে খোদা, সুবুদ্ধিতে রসুল(দ.), সুবুদ্ধিতে কোরআন, সুবুদ্ধিতে ইসলাম, সুবুদ্ধিতে ঈমান, সুবুদ্ধিতে মানবতা’। সর্বত্রে সুবুদ্ধির জয় হোক (আমিন)।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক, সাজ্জাদানশীন, মতিভাণ্ডার দরবার শরীফ।













