বিশ্বকাপ ও বাংলাদেশের আবেগ

মিনহাজ সালাহউদ্দীন | সোমবার , ৬ জুলাই, ২০২৬ at ৫:২৬ পূর্বাহ্ণ

ফুটবল বিশ্বকাপকে আমরা সাধারণত একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখি। কিন্তু বাস্তবে এটি অনেক আগেই সেই সীমা অতিক্রম করেছে। আজকের বিশ্বকাপ একই সঙ্গে রাজনীতি,অর্থনীতি, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম এবং জাতীয় পরিচয়ের এক বিশাল মঞ্চ। নব্বই মিনিটের একটি ম্যাচে চোখ থাকে কোটি মানুষের, কিন্তু সেই চোখের আড়ালে চলে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি নির্মাণ, বহুজাতিক কোম্পানির বিপণন কৌশল, কূটনৈতিক বার্তা এবং মানুষের আবেগকে ঘিরে এক বৈশ্বিক বাণিজ্য।

বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য দেশগুলো কেন এত প্রতিযোগিতা করে? কারণ ট্রফি জেতা যেমন সম্মানের, তেমনি বিশ্বকাপ সফলভাবে আয়োজন করাও আন্তর্জাতিক মর্যাদার বিষয়। একটি দেশ যখন বিশ্বের কোটি দর্শকের সামনে নিজেদের শহর, অবকাঠামো, সংস্কৃতি এবং সক্ষমতা তুলে ধরে, তখন সেটি কেবল একটি ক্রীড়া আয়োজন থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের ‘সফট পাওয়ার’ প্রদর্শনের ক্ষেত্র।

এই কারণেই বিশ্বকাপকে ঘিরে বিতর্কও কম হয় না। মানবাধিকার, শ্রমিকের অধিকার, পরিবেশ, বিপুল ব্যয় কিংবা রাজনৈতিক অবস্থানসবকিছুই আলোচনায় চলে আসে। অর্থাৎ মাঠে যে খেলা চলছে, তার সমান্তরালে আরেকটি খেলা চলতে থাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে।

এই বৈশ্বিক ঘটনাটির অন্যতম বিস্ময়কর দর্শক বাংলাদেশ। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের কোনো দল নেই, তবু বিশ্বকাপ এলেই শহর থেকে গ্রাম, ছাদ থেকে অলিগলিসবখানেই ভিন্ন দেশের পতাকা উড়তে থাকে। এই দৃশ্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বাংলাদেশের সমর্থকদের উন্মাদনাকে বিশ্বের অন্যতম ব্যতিক্রমী ফুটবলসংস্কৃতি হিসেবে বর্ণনা করেছে The Guardian। (The Guardian) প্রশ্ন হলো, কেন?

এর সহজ উত্তর নেই। অনেকের মতে, বিশ্বমানের ফুটবল খেলতে না পারার অপূর্ণতা থেকে আমরা অন্য দেশের সাফল্যে নিজেদের আবেগ বিনিয়োগ করি। আবার বিশ্বায়নের যুগে টেলিভিশন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম দূরের দেশকে আমাদের ঘরের ভেতর নিয়ে এসেছে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গভীর।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের আর্জেন্টিনাসমর্থনের পেছনে শুধু ফুটবল নয়; রয়েছে ঔপনিবেশিক ইতিহাস, ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ এবং ডিয়েগো ম্যারাডোনার প্রতীকী অবস্থান। নতুন প্রজন্মের কাছে সেই আবেগকে আরও শক্তিশালী করেছেন লিওনেল মেসি। (The Guardian; AI Jazeera)

বাংলাদেশের মানুষ আসলে শুধু একটি দলকে সমর্থন করে না; তারা একটি গল্পকে সমর্থন করে। কেউ ইতিহাসকে, কেউ প্রতিভাকে, কেউ লড়াকু মানসিকতাকে, আবার কেউ কোনো এক কিংবদন্তি খেলোয়াড়কে। একটি দেশের জার্সি তখন আর শুধু সেই দেশের থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত বিশ্বাস, স্মৃতি কিংবা রুচির প্রতীক।

এই আবেগ কতটা গভীর, তার একটি ইঙ্গিত দিয়েছে Financial Times। পত্রিকাটি এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার সমর্থকের সংখ্যা আর্জেন্টিনার জনসংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। এটি অবশ্য সরকারি পরিসংখ্যান নয়; ক্রীড়া বিশ্লেষকদের একটি বহুল আলোচিত অনুমান। (Financial Times)

২০২২ সালের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সমর্থকদের উচ্ছ্বাস আন্তর্জাতিকভাবে এতটাই আলোচিত হয় যে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশি সমর্থকদের ধন্যবাদ জানায়। পরে জাতীয় দলের কোচও বাংলাদেশের সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন (Argentina Football Association; Prothom Alo English)। বাংলাদেশের এই আবেগকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে একটি তুলনা। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানি কিংবা ইংল্যান্ডএসব দেশের সমর্থক তো তাদের নিজেদের দেশেই থাকবে, সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশের মতো হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের একটি দেশে যখন লাখো মানুষ অন্য একটি দেশের পতাকা হাতে রাস্তায় নামে, তখন সেটি কেবল ক্রীড়া প্রীতি থাকে না; এটি সাংস্কৃতিক ঘটনায় পরিণত হয়।

এমন সমর্থন অবশ্য বিশ্বের অন্য দেশেও দেখা যায়। দক্ষিণ এশিয়ার ভারত, নেপাল কিংবা শ্রীলঙ্কায় আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের সমর্থক রয়েছে। আফ্রিকার নাইজেরিয়া, কেনিয়া বা ঘানাতেও ইউরোপীয় ও লাতিন আমেরিকার দলগুলোর জনপ্রিয়তা লক্ষ করা যায়। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশেও বিশ্বকাপের সময় বিদেশি দলের জার্সিতে স্টেডিয়াম ও ক্যাফে ভরে ওঠে। কিন্তু বাংলাদেশের ঘটনাটি আলাদা মাত্রা পেয়েছে এর ব্যাপকতা এবং প্রকাশভঙ্গির কারণে। এখানে সমর্থন কেবল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সীমাবদ্ধ থাকে না; গ্রামের বাড়ি থেকে রাজধানীর বহুতল ভবন পর্যন্ত বিশাল বিশাল পতাকা উড়তে দেখা যায়, মহল্লায় মহল্লায় খেলা দেখার আয়োজন হয়, এমনকি পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কেও সেই সমর্থনের রেশ পড়ে। এই দৃশ্যই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের আগ্রহের কারণ হয়েছে।

আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়। আর্জেন্টিনা ২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয়ের পর দেশটির সংবাদমাধ্যম ও ফুটবল কর্তৃপক্ষ বারবার বাংলাদেশের সমর্থকদের কথা উল্লেখ করেছে। আর্জেন্টিনার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানায়, দেশটির কোচ ও খেলোয়াড়রাও বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশি সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। অর্থাৎ বাংলাদেশের আবেগ একমুখী নয়; তা আর্জেন্টিনার নজরও কেড়েছে। বিশ্বকাপের মানচিত্রে বাংলাদেশ ্র্রপ্রতিদ্বন্দ্বী দল হিসেবে না থাকলেও, দর্শকসংস্কৃতির এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে নিজের একটি আলাদা পরিচয় তৈরি করতে পেরেছে।

তবে এই আবেগের একটি অস্বস্তিকর দিকও রয়েছে। আমরা হাজার মাইল দূরের দেশের জন্য রাত জাগি, পতাকা বানাই, বিতর্ক করি; অথচ নিজেদের ফুটবল অবকাঠামো, ক্লাব সংস্কৃতি কিংবা ঘরোয়া লিগ নিয়ে একই উৎসাহ খুব কমই দেখা যায়। আন্তর্জাতিক ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা অবশ্যই ইতিবাচক, কিন্তু সেই ভালোবাসা যদি নিজের ক্রীড়া সংস্কৃতিকে আড়াল করে ফেলে, তাহলে সেটি ভাবনার বিষয়।

বিশ্বকাপ আমাদের আরেকটি বিষয় শেখায়পরিচয় কখনো একমাত্রিক নয়। একজন বাংলাদেশি একই সঙ্গে নিজের দেশের নাগরিক, আবার আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের সমর্থকও হতে পারেন। এই দ্বৈত পরিচয়ের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। বরং এটি বিশ্বায়নের যুগে মানুষের বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক অবস্থানেরই প্রতিফলন।

ফুটবল বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যায় এক মাসে। ট্রফি জেতে একটি দল। কিন্তু কোটি মানুষের মনে যে আবেগের ঢেউ ওঠে, তা থেকে যায় আরও অনেক দিন। সেই আবেগের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে রাজনীতি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, পরিচয় এবং মানুষের একসঙ্গে স্বপ্ন দেখার সহজাত ক্ষমতা।

পতাকা নামবে, রাতজাগা কমে যাবে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তর্কও থেমে যাবে। কিন্তু প্রশ্নটি থেকে যাবেকেন বাংলাদেশের মানুষ এত দূরের একটি দেশের জয়পরাজয়ে নিজেদের আবেগ খুঁজে পায় ? এর উত্তর শুধু ফুটবলে নেই; আছে ইতিহাসে, গণমাধ্যমে, বিশ্বায়নে এবং মানুষের পরিচয় নির্মাণের জটিল প্রক্রিয়ায়। সেই কারণেই বিশ্বকাপ শুধু একটি খেলা নয়, এটি মানুষের স্বপ্ন, স্মৃতি ও আত্মপরিচয়েরও উৎসব। বাংলাদেশের বিশ্বকাপউন্মাদনাকে কেউ অতিরঞ্জন বলবেন, কেউ আবেগের বাড়াবাড়ি। কিন্তু এটুকু অস্বীকার করার উপায় নেইবিশ্বকাপের সময় পৃথিবীর বহু দেশ যখন নিজেদের দলকে সমর্থন করে, তখন বাংলাদেশ সমর্থন করে একটি স্বপ্নকে। আর সেই স্বপ্নই হয়তো পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশের দর্শকসংস্কৃতিকে আলাদা করে চেনায়।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনাট্যান্দোলনে একজন মনি ইমাম এবং পঞ্চাশের দশক