কোনো শহর একদিনে নোংরা হয় না। আবার একদিনে সুন্দরও হয় না। একটি শহর প্রতিদিন গড়ে ওঠে তার নাগরিকদের অভ্যাস, তাদের সিদ্ধান্ত, তাদের নেতৃত্ব এবং জনসম্পদের প্রতি তাদের দায়িত্ববোধের মাধ্যমে। উন্নত নগর শুধু উন্নত অবকাঠামোর ফল নয়; এটি উন্নত নাগরিক সংস্কৃতিরও প্রতিফলন। চট্টগ্রাম আমার জন্মভূমি, কর্মভূমি এবং হৃদয়ের শহর। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী, প্রধান সমুদ্রবন্দর এবং জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের সিংহভাগ, শিল্পকারখানার কাঁচামাল, আমদানি–রপ্তানি, ব্যাংকিং, লজিস্টিকস এবং বিনিয়োগের একটি বড় অংশ এই শহরকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হয়। তাই চট্টগ্রামের প্রতিটি সড়ক, প্রতিটি খাল, প্রতিটি ফুটপাত এবং প্রতিটি নাগরিকের আচরণ শুধু একটি নগরের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ।
দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ব্যাংকিং পেশায় কাজ করতে গিয়ে আমি একটি বিষয় গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি, সময়ও একটি অর্থনৈতিক সম্পদ। একটি ট্রাক কয়েক ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকলে শুধু জ্বালানি অপচয় হয় না; উৎপাদন ব্যাহত হয়, সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হয়, ব্যবসার ব্যয় বৃদ্ধি পায়। একটি ব্যাংকিং লেনদেনে বিলম্ব, একটি রপ্তানি চালান বন্দরে সময়মতো পৌঁছাতে না পারা কিংবা একজন উদ্যোক্তার কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া – এসবের প্রতিটিরই একটি অর্থনৈতিক মূল্য রয়েছে। সেই কারণেই একজন ব্যাংকার হিসেবে আমি যখন জলাবদ্ধতায় ডুবে থাকা চট্টগ্রাম দেখি, তখন শুধু নাগরিক দুর্ভোগ দেখি না; দেখি জাতীয় অর্থনীতির নীরব ক্ষয়।
বর্ষা এলেই আমরা একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি দেখি। সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীর বহু গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পানির নিচে চলে যায়। অফিস–আদালত, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যাংক এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, উৎপাদনশীলতা কমে যায়, মানুষের দুর্ভোগ বাড়ে। আমরা স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন সংস্থার দিকে তাকাই এবং তাদের দায়বদ্ধতার প্রশ্ন তুলি। সেই প্রশ্ন অবশ্যই যৌক্তিক। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের নিজেদেরও একটি প্রশ্ন করা প্রয়োজন–আমি কি আমার শহরের প্রতি আমার দায়িত্ব পালন করছি?
জলাবদ্ধতার জন্য শুধু অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাই দায়ী নয়; আমাদের দৈনন্দিন আচরণও এর একটি বড় কারণ। প্লাস্টিক, পলিথিন, বোতল, খাবারের প্যাকেট, নির্মাণসামগ্রীর উচ্ছিষ্ট কিংবা গৃহস্থালির বর্জ্য – আমরাই ড্রেন, নালা ও খালে ফেলে দিই। পরে সেই পথ বন্ধ হয়ে গেলে বৃষ্টির পানি আর বের হতে পারে না। যে পানি যাওয়ার কথা ছিল সমুদ্রে, সেই পানিই ফিরে আসে আমাদের ঘর, দোকান, অফিস এবং রাস্তায়।
খাল, নালা ও ড্রেন কোনো শহরের আবর্জনার ভাগাড় নয়; এগুলো একটি নগরের জীবনরেখা। মানুষের শরীরে যেমন রক্তনালি বন্ধ হয়ে গেলে পুরো শরীর বিপর্যস্ত হয়, তেমনি একটি শহরের পানি চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হলে নগরজীবনও অচল হয়ে পড়ে। এখানেই নাগরিক দায়িত্ববোধের প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নগরবাসীর মধ্যে বিনামূল্যে হাজার হাজার ডাস্টবিন বিতরণ করেছে। এটি একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু একটি ডাস্টবিন তখনই কার্যকর, যখন সেটি ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। বাস্তবে আমরা প্রায়ই দেখি, ডাস্টবিন খালি পড়ে আছে, অথচ তার পাশেই জমে আছে ময়লার স্তূপ। এর অর্থ একটাই– সমস্যা শুধু অবকাঠামোর নয়; সমস্যার বড় অংশ আমাদের মানসিকতায়।
আমাদের ভাবনার পরিবর্তন প্রয়োজন। ‘আমার বাড়ির বাইরে ফেললেই দায়িত্ব শেষ’– এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে উপলব্ধি করতে হবে, শহরও আমার বাড়িরই সমপ্রসারিত অংশ। নিজের ড্রয়িংরুম যেমন নোংরা করি না, তেমনি নিজের শহরকেও নোংরা করার কোনো নৈতিক অধিকার আমাদের নেই।
একটি পরিচ্ছন্ন শহর কখনো পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের একার হাতে গড়ে ওঠে না। সেটি গড়ে ওঠে কোটি মানুষের প্রতিদিনের ছোট ছোট দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে। আর সেই আচরণের পরিবর্তনই হতে পারে একটি নতুন, পরিচ্ছন্ন, বাসযোগ্য ও বিশ্বমানের চট্টগ্রাম গড়ার প্রথম পদক্ষেপ।
একটি পরিচ্ছন্ন শহরের পরিচয় শুধু পরিচ্ছন্ন সড়কে নয়; তার পরিচয় লুকিয়ে থাকে সবুজে। একটি শহর কতটা উন্নত, তা শুধু তার বহুতল ভবন বা ফ্লাইওভারের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না; বিচার করা যায় তার পার্ক, খাল, গাছপালা, উন্মুক্ত স্থান এবং পরিবেশগত ভারসাম্য দিয়ে।
বেশ কয়েক বছর আগে থাইল্যান্ডের চিয়াংমাই শহর ভ্রমণের সময় একটি দৃশ্য আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। আমাদের চট্টগ্রামের দেওয়ানহাট ওভারব্রিজের মতো একটি ওভারব্রিজের দুই পাশের রেলিংজুড়ে ছিল সারি সারি ফুলের গাছ। একটি সাধারণ কংক্রিটের স্থাপনাও কীভাবে নান্দনিকতার প্রতীক হতে পারে, তা সেখানে না গেলে হয়তো উপলব্ধি করা কঠিন। আরও বিস্মিত হয়েছিলাম, যখন ভোরবেলা দেখলাম নগর কর্তৃপক্ষ নিয়মিত সাবান মিশ্রিত পানি দিয়ে রাস্তা ধুয়ে পরিষ্কার করছে। শুধু রাস্তা নয়, ধুলাবালিতে মলিন হয়ে যাওয়া গাছের পাতাও পানি দিয়ে ধুয়ে দেওয়া হচ্ছে। তখন উপলব্ধি করেছিলাম, পরিচ্ছন্নতা সেখানে কোনো বিশেষ দিবসের কর্মসূচি নয়; এটি একটি দৈনন্দিন সংস্কৃতি। শহরকে তারা নিজের ঘরের মতোই যত্ন করে।
চট্টগ্রামেও কি আমরা এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারি না? আমার বিশ্বাস, অবশ্যই পারি। আমাদের ফ্লাইওভার, ওভারব্রিজ, সড়কের মিডিয়ান, খালপাড়, পার্ক এবং উন্মুক্ত স্থানগুলো পরিকল্পিত সবুজায়নের আওতায় আনা যেতে পারে। এতে শুধু শহরের সৌন্দর্যই বাড়বে না; তাপমাত্রা কমবে, বায়ুর মান উন্নত হবে, জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে এবং নাগরিকদের মানসিক স্বস্তিও বৃদ্ধি পাবে। তবে একটি বিষয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। সবুজায়ন মানে শুধু গাছ লাগানো নয়; গাছকে বড় করে তোলা।
আমাদের দেশে প্রায়ই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি হয়। হাজার হাজার চারা রোপণ করা হয়, ছবি তোলা হয়, সংবাদ প্রকাশিত হয়। কিন্তু কয়েক মাস পর সেই চারাগুলোর কতটি বেঁচে থাকে, কতটি পরিচর্যা পায় কিংবা কতটি পূর্ণাঙ্গ বৃক্ষে পরিণত হয়– তার হিসাব খুব কমই রাখা হয়। আমি মনে করি, বৃক্ষরোপণের চেয়ে বৃক্ষরক্ষণ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আজ আমরা যে চারাটি রোপণ করছি, সেটি যদি আগামী বিশ বছর পরে একটি বিশাল বৃক্ষে পরিণত হয়, তাহলেই সেই উদ্যোগ সফল। কারণ সেই গাছই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নির্মল বাতাস দেবে, ছায়া দেবে, পাখির আবাস হবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় সহায়তা করবে। চট্টগ্রামের সবুজায়নকে তাই একটি চলমান অঙ্গীকারে পরিণত করতে হবে। শুধু একটি দিবস নয়, বছরের প্রতিটি দিন হতে হবে পরিচর্যার দিন। এখানে করপোরেট খাতের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR)-এর আওতায় অনেক প্রতিষ্ঠান বৃক্ষরোপণ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সবুজ কারখানা নির্মাণে বিনিয়োগ করছে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক। তবে সময় এসেছে CSR–কে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। আমার মতে, এখন প্রয়োজন Corporate Citizenship–এর ধারণা– অর্থাৎ একটি প্রতিষ্ঠান শুধু ব্যবসা করবে না; যে শহরে ব্যবসা করছে, সেই শহরের উন্নয়নেও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার হবে। শুধু উদ্বোধন নয়, পাঁচ বা দশ বছরের রক্ষণাবেক্ষণের অঙ্গীকারই হোক CSR–এর নতুন মানদণ্ড। একটি গাছ লাগিয়ে ছবি তোলা সহজ। একটি গাছকে বিশ বছর বাঁচিয়ে রাখা কঠিন। কিন্তু একটি সভ্য সমাজ কঠিন কাজটিই বেছে নেয়।
শহরের পরিচ্ছন্নতা ও সবুজায়নের পাশাপাশি আরেকটি বিষয় আমাকে দীর্ঘদিন ধরে ভাবায় – সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনার অভাব। চট্টগ্রাম কি সেই শহরই রয়ে যাবে, যেখানে প্রতিটি সংস্থা নিজেদের প্রকল্প আলাদাভাবে বাস্তবায়ন করবে, আর তার মূল্য পরিশোধ করবে সাধারণ মানুষ? আমরা প্রায়ই দেখি, একটি সংস্থা নতুন রাস্তা নির্মাণ করল। কিছুদিন পর আরেকটি সংস্থা পানি সরবরাহের পাইপ বসানোর জন্য সেই রাস্তা কেটে ফেলল। এরপর গ্যাস, বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ কিংবা অন্য কোনো ইউটিলিটি সংস্থা আবার একই রাস্তা খুঁড়ল। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সড়ক অল্প সময়েই ক্ষতিগ্রস্ত হলো, জনদুর্ভোগ বাড়ল, যানজট সৃষ্টি হলো, ব্যবসা–বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হলো। এভাবে উন্নয়ন কখনো টেকসই হতে পারে না। একজন ব্যাংকার হিসেবে আমি সব সময় একটি বিষয় বিবেচনা করি, সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার (Optimal Use of Resources)। একটি বিনিয়োগ যদি একই কাজের জন্য বারবার ব্যয় করতে হয়, তবে সেটি দক্ষ বিনিয়োগ নয়। নগর উন্নয়নেও একই নীতি প্রযোজ্য। সরকারি অর্থও জনগণের অর্থ। তাই প্রতিটি প্রকল্পে সমন্বয়, সময়োপযোগী পরিকল্পনা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। আমরা কবে এমন একটি চট্টগ্রাম দেখব, যেখানে মাটির নিচের সব অবকাঠামো – পানি, পয়োনিষ্কাশন, ড্রেনেজ, বিদ্যুৎ, গ্যাস, টেলিযোগাযোগ এবং অন্যান্য ইউটিলিটি– একটি সমন্বিত Underground Utility Master Plan–এর আওতায় নির্মিত হবে? যেখানে একটি রাস্তা একবারই খোঁড়া হবে, প্রয়োজনীয় সব কাজ একই সঙ্গে সম্পন্ন হবে এবং বহু বছর সেটিকে আর খুঁড়তে হবে না। এটি কোনো কল্পনা নয়; বিশ্বের উন্নত শহরগুলোতে এটি বহু বছর ধরে প্রচলিত একটি পরিকল্পনা। চট্টগ্রামও সেই সক্ষমতা রাখে। প্রয়োজন শুধু একটি অভিন্ন নগর–দর্শন, যেখানে বিভিন্ন সংস্থা নিজেদের আলাদা প্রকল্প নয়, বরং একই শহরের অংশ হিসেবে কাজ করবে। একটি সফল বন্দরনগরীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো দক্ষ নগর ব্যবস্থাপনা।
(বাকি অংশ আগামীকাল)
লেখক : ব্যাংকার ও প্রাবন্ধিক









