টংকাবতী একটি নদীর নাম ও একটি পাহাড়ি জনপদের নাম। অন্যদিকে বাংলা সাহিত্যের একটি জনপ্রিয় রূপকথাধর্মী উপন্যাসের নাম ‘কঙ্কাবতী‘। আর মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের প্রথম নারী কবির নাম ‘চন্দ্রাবতী’। কাব্যিক নাম হলেও কিন্তু টংকাবতী কোন কবি বা কবিতার নাম নয়। টংকাবতী নিয়ে আমার জানা মতে কোন কবিতা বা গল্প, উপন্যাস রচিত হয়নি। টংকাবতী নিজেই কবিতার মতো সুন্দর। নুপুর পরা পাহাড়ি মেয়ের মতো অপার সৌন্দর্য নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবানের চিম্বুক–থানচির মধ্যবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলে এর উৎপত্তি। টংকাবতী মূলত একটি উপনদী বা খাল। প্রাচীনকাল থেকে নদীর তীরে গড়ে সভ্যতা, শহর, বন্দর, নগর ও জনপদ।
টংকাবতী নদীর তীরে নদীর নামানুসারে বান্দরবানে সদর উপজেলায় একটি ইউনিয়নের নামকরণও হয়েছে এবং টংকাবতী নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি বাজার। ম্রো উপজাতি অধ্যুষিত এই ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে টংকাবতী নদী, রঙিন খাল এবং উওর ও দক্ষিণ হাঙ্গর খাল। ম্রো বা অন্য উপজাতির মধ্যে সুন্দরী কোন মেয়ের নাম টংকাবতী আছে কিনা আমার জানা নেই।
এই নদী বান্দরবানের চিম্বুক–থানচির মধ্যবর্তী পাহাড়ি অঞ্চল যা সুয়ালক ইউনিয়নের দক্ষিণে, রোয়াংছড়ি উপজেলার তারাছা ইউনিয়নের পশ্চিমে এবং রুমা উপজেলার সরই ইউনিয়নের উত্তরে পাহাড়ের পাদদেশে প্রবাহিত টংকাবতী ইউনিয়নের বুক ছিড়ে প্রবাহিত শাখা নদী বা খাল থেকে সৃষ্টি হয়ে লোহাগাড়া থানার চরম্বা ইউনিয়ন, কলাউজান ইউনিয়ন, পদুয়া ইউনিয়নের পাশ ধরে আমিরাবাদ ইউনিয়নের মাঝখানে প্রবাহিত হয়ে সাতকানিয়া থানার গারাঙ্গিয়ায় দীর্ঘ ২৫–৩০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ডলু নদীতে মিশে যায়। টংকাবতীর মুখ হলো চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী একটি বিশেষ স্থান, যেখানে টংকাবতী নদী ও বোয়ালিয়া খালের স্রোতও ডলু নদীর সাথে মিশে একাকার। এই স্থানটি ‘তিন খালের মুখ’ বা ‘টর মুখ’ হিসেবে খ্যাত। টর মুখ টংকাবতীর মুখের সংক্ষিপ্ত রূপ।
আমি শৈশব থেকে এই টর মুখ নামের সাথে পরিচিত। আমার মায়ের মামার বাড়ি সাতকানিয়া সদর ইউনিয়নের বারোদোনা গ্রামের এই টর মুখ এলাকায়। সেই সুবাদে শৈশবে মায়ের সাথে বেশ কয়েকবার সুযোগ হয়েছে। টংকাবতীর দুই তীর কূলবর্তী এলাকায় বিভিন্ন ধরনের শাক সবজি চাষ হতো, এখনো হয়। শিশুকালে সেই ফসলের ভাগ আমরাও কিছু পেয়েছি।
বর্ষা মৌসুমে টংকাবতী দিয়ে পাহাড়ি ঢলের কারণে দুপাশের ফসলি জমি কাদাপলি ধারা প্লাবিত হওয়ায়, এখানে বারোমাসই শাক–সবজি ও ধান চাষের বাম্পার ফলন হয়। বৈচিত্র্যময় স্বাদের জন্য টংকাবতীর চরের শাক, মরিচ, বেগুন, মুলা, শশা ও অন্যান্য সবজির সমগ্র চট্টগ্রামে ব্যাপক সুনাম ও চাহিদা রয়েছে। তাই কৃষিখাতে এক সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে নির্মাণ করা হয়েছে একটি রাবার ড্যাম, যার সুবাদে প্রতিনিয়ত খাদ্যশস্যের বিশাল যোগান দিয়ে যাচ্ছে টংকাবতী। সেজন্য এখানের শতকরা প্রায় ৩০% মানুষ কৃষি নির্ভর হলেও দিনে দিনে তা বাড়ছে এবং অনাবাদি জমিও আবাদযোগ্য করতে সক্ষম হচ্ছে। দীর্ঘকাল ধরে এই নদী এখানকার মানুষের সুখ–দুঃখ আনন্দ বেদনার স্বাক্ষী ও সাথী হওয়ার পাশাপাশি প্রকৃতির সৌন্দর্য হীরার মূল্যে খচিত করেছে। শীতের মৌসুমে নদীর দুই তীরে বাহারি সবজির চাষ, বিস্তীর্ণ বালুচরে একপাশে বাদাম ও আখ চাষ আরেকপাশে শিশু কিশোরদের খেলার মাঠ, নদীর তীর ঘেঁষে বহুকাল ধরে ঠাঁই নেয়া ছোট ছোট গ্রামের মানুষগুলো ঘরবাড়ির যাবতীয় ধোয়া মোছার কাজ থেকে শুরু করে পাহাড় থেকে বাঁশ, কাঠের অন্যতম যোগাযোগ মাধ্যম এই নদী। পর্যটনের সম্ভবনাময় নান্দনিক নৈসর্গিক সৌন্দর্যের এক আসন পেতে বসে আছে বলেই নদীর বিভিন্ন স্পটে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসে মানুষ একটু নির্মল বাতাস ও প্রাণ জুড়াতে। তাছাড়া টংকাবতীর রূপালি বালু পাকা বা বহুতল ভবন ও অন্যান্য অবকাটামো নির্মাণে অন্যতম কাঁচামাল হওয়ার কারণ এবং অসাধু মাটি ও বালু ব্যবসায়ীদের লেলুপ দৃষ্টির ফলে দিনে দিনে বালি শূণ্য হয়ে সৌন্দর্য হারাচ্ছে এই নদী। পাহাড়ি অঞ্চল থেকে শুরু হয়ে বয়ে চলা টঙ্কাবতী নদীর শেষ প্রান্ত বা মোহনার নাম টঙ্কাবতীর মুখ। এছাড়াও টংকাবতীর দুই তীরবর্তী এলাকায় রয়েছে খ্যাতিমান ব্যক্তিবর্গ ও মনীষীর জন্মস্থান এবং খ্যাতনামা প্রাচীন ও আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
লোহাগাড়া ও সাতকানিয়া উপজেলাকে বিভক্ত করেছে টংকাবতী নদী। সাতকানিয়াবাসীর দুঃখ বর্ষায় ডলু নদীর ভাঙন, আর টংকাবতীর মুখের দুঃখ একটি বাঁশের সাঁকো এবং স্বপ্ন একটি পাকা সেতু। যদিও টর মুখ এলাকায় টংকাবতী নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল, কিছু কাজও হয়েছে তবে প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয়েছে প্রায় ১ বছর আগে। অথচ অদৃশ্য কারণে এখনো নির্মাণ কাজ অসম্পূর্ণ। অথচ একটি সেঁতুর কারণে বছরের পর বছর ধরে প্রতিদিন দুই উপজেলার হাজারো মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। দুই উপজেলার মানুষের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা বাঁশের সাঁকো। টিন ও গাছ ব্যবহার করে নির্মিত সাঁকো দিয়ে মানুষকে ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করতে হয়। বর্ষায় নদীতে পানি বাড়লে সাঁকোর অস্থিত্ব বিলীন হয়ে যায় এবং যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। তাই টংকাবতীর মুখে একটি পাকা সেতু শুধু প্রয়োজন নয়, একটি বহু বছরের লালিত স্বপ্ন। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে দ্রুত নির্মাণাধীন সেতুর কাজ শেষ করে নিরাপদ ও নিরিবচ্ছন্ন যোগাযোগ নিশ্চিত করা খুবই প্রয়োজন।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক।












