রাঙামাটির বরকল উপজেলার বরুনাছড়িতে মানুষের ভালোবাসায় টিকে রয়েছে ১০ থেকে ১২টি বন্যহাতি। এলাকাটির ছোট ছোট আম লিচু বা আমলকির বাগানে এসব হাতির বসবাস চলছে এক দশক ধরে। বাগানের ফল, গাছপালা হাতির খাবার। বাগান নষ্ট করে ফেললেও স্থানীয় বাসিন্দারা হাতিকে আক্রমণ করে না। এমন দৃশ্য সারাদেশে বিরল। যেখানে মানুষের সাথে দ্বন্দ্বে প্রতিনিয়ত হাতি আক্রান্ত হচ্ছে সেখানে বরকলের দৃশ্য একেবারে আলাদা।
গত মঙ্গলবার সকালে বরুনাছড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্থানীয় বাসিন্দা পারভীন বেগমের বাড়ির পাশে লিচু বাগানে হাতির দল অবস্থান নিয়েছে। ৪টা হাতি সেখানে গত পাঁচ দিন ধরে অবস্থান করছে। তারা বাগানের ভেতরে সবুজ লতাপাতা খাচ্ছে। লিচু গাছের ডাল ভাঙছে। বাগানের একপাশে থাকা বাঁশপাতা ছিড়ে খাচ্ছে। বাগানের পাশেই কাপ্তাই লেকের জলরাশি। প্রয়োজনে হাতি সেখান থেকে পানি পান করছে। পারভীন বেগম বলেন, আমার বাগানে হাতি বেশ কয়েকদিন ধরে আছে। আমরা তাদের উত্যক্ত করি না। তারা বাগানে অবস্থান করে বিভিন্ন ধরনের খাবার খায়। লেকে পানিও পর্যাপ্ত। তাদের খাবারের কোনো সংকট থাকে না। আমাদের এই যে আমলকি গাছ ভাঙা, পেয়ারা গাছ ভাঙা, পাক ঘরের ভেঙে ফেলেছে। রাতে ১০টা, ১১টা থেকে ৩টা–৪টা পর্যন্ত সজাগ থাকা লাগে। আমরা কখনো হাতিকে আক্রমণ করি না। টর্চ মারলে সরে যায়, দূরে সরে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা জাফর উদ্দিন বলেন, সপ্তাহে একবার দুইবার আমার এখানে আসে। মাসের ভিতরে না হলেও দুইবার আসবে। আইসে এখানে থাকবে, আমার ঘরে ঢুইকা ভাইঙ্গা ফেলছে। এভাবে অনেক ক্ষতি করছে আমার। আমি একবার আবেদন করছিলাম (ক্ষতিপূরণের), এখন ওইটা পাইনি। হাতিকে আমরা আক্রমণ করি না। অনেক সময় দেখা যায়, টর্চ মাইরা, টিন বাইরা তাড়াইতে হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের আওতাধীন বরকল ও লংগদুতে হাতির বিচরণ ক্ষেত্র চিহ্নিত করে গড়ে তোলা হয়েছে এ্যালিফেন্ট রেসপন্স টিম। হাতির জীবন সুরক্ষার পাশাপাশি হাতি রক্ষায় মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করে এই টিমের সদস্যরা। হাতির অবস্থান জানিয়ে ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সর্তকও করছে তারা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী–কীভাবে হাতির দ্বারা ক্ষতি কমানো যায় সে বিষয়ে স্থানীয়দের পরামর্শ দেওয়া ও হাতির অবস্থান জানিয়ে সাধারণ মানুষকে সর্তক করা তাদের কাজ।
এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম সদস্য মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বাবু বলেন, যদি পার্শ্ববর্তী কোথায়ও হাতি কারো ঘর আক্রমণ করে বা কোনো বাগানের ক্ষতি করে, সংবাদ পাওয়া মাত্র সেটা আমরা প্রথমত আমাদের যে অফিস আছে ফরেস্ট অফিস কাচালংমুখ, সেখানে অবগত করি এবং ইআরটির সদস্য যারা আছে, তৎক্ষণিক যারা বিপদের সম্মুখীন হয় তাদের সহায়তা করার চেষ্টা করি। বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, বাদ্যযন্ত্রের মাধ্যমে বা উচ্চস্বরের মাধ্যমে চেষ্টা করি হাতিটা তাড়ানোর জন্য। যতটা আমাদের দ্বারা সম্ভব হয়। মানুষের দ্বারা এখানে হাতি আক্রান্ত হয় না।
হাতিকে বলা হয় ফরেস্ট ইঞ্জিনিয়ার। কারণ তারা বনের বীজ ছড়িয়ে নতুন গাছ জন্মাতে সাহায্য করে। একটি হাতি ৬০ থেকে ৭০ বছর বাঁচে। পাহাড়ে হাতির আবাসস্থল নষ্ট হয়ে যাওয়া, গাছপালা কাটা, বনে আগুন দেয়া, মানুষের বসতি স্থাপনের পরও যেটুক সবুজ বন বা পাহাড় রয়েছে সেখানে ঠিকে থাকার লড়াই করছে হাতিরা। একটি প্রাপ্ত বয়স্ক হাতির দৈনিক একশ থেকে দেড়শ কেজি খাবার ও অন্তত ১০০ লিটার পানি প্রয়োজন হয়। চিরসবুজ বনে খাবার ও কাপ্তাই লেকের পানির সহজলভ্যতার কারণে এক দশকের বেশি সময় ধরে হাতিগুলো সেখানে বিচরণ করছে। চলতি বছরে বন বিভাগের দফতরে বন্যহাতি দ্বারা ক্ষতিগ্রস্তদের ৪২টি আবেদন জমা পড়েছে। সেগুলো যাচাই বাছাই করে ক্ষতিপূরণ দিবে বনবিভাগ।
পাহাড়ের চিরসবুজ বনের হাতির সুরক্ষায় বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রফিকুজ্জামান শাহ। তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বনবিভাগের আওতাধীন আমাদের লংগদু এবং বরকল উপজেলায় এশিয়ান হাতিগুলো বিচরণ করে। এই এশিয়ান হাতিগুলো দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় বিচরণ করছে। এই এলাকায় বিচরণ করার ক্ষেত্রে কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের করিডোর দিয়ে যাতায়াতের কারণে বিভিন্ন সময় মানুষের ফসলহানি সহ বিভিন্ন রকম কনফ্লিক্ট তৈরি হয়। এই কনফ্লিক্টগুলো আমরা দ্রুত নিরসন করে, কোনো ক্ষয়ক্ষতি হলে এগুলো আমরা সাথে সাথে এটা দেওয়ার চেষ্টা করছি। এছাড়া স্থানীয় জনগণসহ আমাদের যে ইআরটি মেম্বার আছে, হাতি সুরক্ষা প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা তাদের কিছু কিছু সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করছি। সহায়তার মধ্যে তাদের আমরা টর্চলাইট দেই, হুইসেল দেই, ঢোল দিচ্ছি এবং হাতি আসলে তাদের করণীয় কী–এ বিষয়ে লিফলেট বিতরণ করছি। লিফলেটসহ আমরা স্থানীয়ভাবে কিছু ব্যানার টাঙিয়েছি, কিছু সাইনবোর্ড টাঙিয়েছি। হাতির চলাচলের রাস্তায় হাতি চলাচলকালীন যাতে কেউ কোনো ডিস্টার্ব না করে এবং হাতিগুলো যাতে নিরাপদে তাদের আবাসস্থলে থাকতে পারে এবং বিচরণ করতে পারে, তাদের প্রজনন বৃদ্ধি করতে পারে, সেই ব্যাপারে আমাদের যে সচেতনতামূলক কার্যক্রম সেগুলো আমরা ওখানকার স্থানীয় স্কুল থেকে আরম্ভ করে স্থানীয় জনসাধারণ, গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে বিভিন্ন রকম সভা করছি। সভা করে সবাইকে আমরা এই মেসেজটা দেওয়ার চেষ্টা করছি যে, হাতি রক্ষা করতে হবে, বন রক্ষা করতে হবে, জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হবে। হাতি এবং হাতির আবাসস্থল সুরক্ষার জন্য যা করণীয় সরকারের পক্ষ থেকে আপনাদের সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করা হবে। এই মেসেজটা আমরা দিয়েছি এবং স্থানীয় জনগণের পক্ষ থেকে আমরা যথেষ্ট সহযোগিতা পাচ্ছি। আমরা আশা করছি, এই হাতিটাকে আমরা যদি এই সর্বাধিক সুরক্ষা দিতে পারি, তাহলে তাদের বংশবিস্তার হবে এবং ওই এলাকার যে বনাঞ্চল আছে সেটাও সমৃদ্ধ হবে এবং জীববৈচিত্র্য ক্রমান্বয়ে আস্তে আস্তে আরো অধিকতর বৃদ্ধি পাবে।











