ক্ষমা মহত্বের লক্ষণ। এটা চিরন্তন। সেটা যে বয়সেই হোক প্রযোজ্য। আমাদের বাংলাদেশে ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে যাদের বয়স তাদেরকে প্রবীণ বলা হয়। ইতিহাস ঘাটলে ক্ষমা প্রদর্শনের ভুরি ভুরি মহৎ দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ক্ষমা হলো তাদের উদারতা। মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার খ্যাতি, সম্পদ নয়। ক্ষমতা নয় সমাজের জন্য। দেশের জন্য, মানব কল্যাণে তার কতটুকু অবদান আছে বা ছিল। মৃত্যু পরিবর্তিত মানুষ বিচার করে সাধারণের প্রতি তার ব্যবহার আচার আচরণ বিরূপ ছিল। পাড়াপ্রতিবেশীদের প্রতি তার কর্তব্য নিষ্ঠাবোধ, দেশকে কী দিয়ে গেল এইগুলি বিচার করে। কার কয়টা ফ্ল্যাট, ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স, জমিজমা এই গুলি কেউ মনে রাখে না। যে লোকটি বহু বছর আগে অন্যায়, অপরাধ করেছে বা মনে ভীষণ ব্যথা দিয়েছে। যে অঘটন ঘটিয়েছে যে গুলি ক্ষমতার অযোগ্য। কিন্তু প্রবীণ বয়সে সেগুলি স্মৃতি হয়ে থাকে। ইতিহাস হয়ে যায়। সে অতীত যদি বর্তমানের শান্তি কেড়ে নেয় তাহলে সেই আগুনে সবচেয়ে বেশি দগ্ধ হন যিনি সেইগুলি বহন করে বেড়ায়। বেশি বয়সে মানুষ বর্তমানের চেয়ে অতীতের সঙ্গে বেশি বসবাস করে। মনের গোপন ভাণ্ডার খুলে যায় এক–এক করে। শৈশবের নির্মল দিল, যৌবনের উচ্ছ্বাস, সংসারের সংগ্রাম, কর্মজীবনের সাফল্য ব্যর্থতা সবই ফিরে আসে। সেই স্মৃতিমালায় দীপ্তির ফুল ফুটে থাকে। লুকিয়ে থাকে অপমানের কাঁটা। বিশ্বাস ভঙ্গের ক্ষত। দীর্ঘশ্বাসের ইতিহাস। বার্ধক্য মানব জীবনের এমন একটা সময় যখন সময়ের স্রোত ধীরে বয়ে চলে আর স্মৃতির মহাকাল হয়ে উঠে গভীর ও তড়িৎ গতিসম্পন্ন। প্রবীণ বয়স মানুষের শেষ ধাপ। অস্তমিত সূর্য পশ্চিম আকাশে ধীরে ধীরে অস্ত যায়। অস্ত গেলে পৃথিবী অন্ধকার হয়ে আসে। রেখে যায় সারাদিনের স্মৃতি। মনে রাখা ভালো অতীতকে বদলানো যায় না। কিন্তুু তার শৃঙ্খল থেকে যে জিনিসটা দিয়ে নিজেকে মুক্ত করা যায় সেটা হলো ক্ষমা। দুর্বলতা নয়। এটা শক্তিমান দৃঢ়চেতা লোকের সিদ্ধান্ত। এটা অন্যের প্রতি দয়া নয়। নিজের আত্মচেতনার বহিঃপ্রকাশ। মনোবিজ্ঞানীরা এই আত্মমুক্তির পথকে পাঁচ ধাপে ব্যাখ্যা করেছেন। (১) নিজের কষ্টকে ঢেকে না রেখে নির্ভয়ে মেনে নেওয়া। ঢেকে রাখলে যেমন ক্ষত ভেতরে ভেতরে আরো গভীর হয়। তাই নিজেকে বোঝার জন্য আঘাতের মুখোমুখি হতে হয়। প্রতিশোধের জন্য নয় (২) ক্ষমাকে এক নিঃস্বার্থ উপহার হিসেবে গ্রহণ করা। আমরা প্রত্যেকেই জীবনের কোন না কোন সময়ে অন্যের ক্ষমার প্রার্থী ছিলাম এবং অন্যের ক্ষমতায় রক্ষা পেয়েছি। সেই মানবিক ঋণই অন্যের প্রতি উদারতার হাত বাড়িয়ে দিতে শেখায় (৩) ক্ষমার সিদ্ধান্তে অবিচল থাকা। ক্ষমা শুধু ক্ষণিকের আবেগ নয়। এটি সচেতন অঙ্গীকার, আমি অতীতের বন্দিত্ব থেকে মুক্তি চাই। (৪) পুরোনো ক্ষত জেগে উঠলেও ক্ষমার পথ থেকে সরে না আসা। কারণ ক্ষমা মূহূর্তের ঘটনা নয়। এটা অনুশীলন করতে হয় (৫) অপরাধীর চোখ দিয়ে পৃথিবীকে দেখা। মানুষ কখনো কখনো সীমাবদ্ধতার বা অজ্ঞতার কারণে পরিস্থিতির কাছে পরাজিত হয়। কিন্তু ইহা যেন বৈধতা না পায়। ঘৃণার জানালা যেন খোলা থাকে। এইগুলির অনুশীলন প্রবীণ বয়সে আরো জরুরি। মানুষ যখন অবসর জীবন যাপন করে পুরোনো স্মৃতিগুলি বার বার ফিরে আসে। একই ঘটনা এবং স্মৃতির দৃশ্যগুলি বারবার মনে পড়ে। কিন্তু এই মাত্র যেটা মনে করলো সেটা নিমিষেই ভুলে যায়। এটাই প্রকৃতি। দুঃখের ঘটনাগুলি বার বার হৃদয়কে আঘাত করে। ঘৃণাবহনকারী মানুষটি সবচেয়ে বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এই খানে উল্লেখ্য দীর্ঘদিনের প্রতিশোধ স্পৃহা রোগগ্রস্ত লোকটির অনীহা। উদ্বেগ, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, বিষণ্নতা প্রভৃতি রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে মনে করা দরকার ক্ষমা মানে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া নয়। ক্ষমা মানে বিচার থেকে সরে আসা নয়। ক্ষমা মানে নিজেকে বিষবাষ্প থেকে মুক্ত থাকা। আমাদের সমাজে বহু লোক আছে–অবহেলার স্মৃতি সম্পত্তি জনিত বিরোধ, নিকট জনদের শোক, ভুলতে না পারা, মৃত্যুশয্যায় এইগুলি মনে করে। এগুলি শারীরিক বিপর্যয় ডেকে আনে। বর্তমান সারা বিশ্ব দারুণ অস্থিরতার মধ্যে কাটছে। আমাদের দেশও ইহার ব্যতিক্রম নয়। প্রবীণেরা ভারাক্রান্ত মনে এইগুলি অবলোকন করে। কিন্তু তাদের কিছু করার থাকে না। প্রবীণ জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া হলো সব স্মৃতি বহন করতে হয় না। সব হিসেব মেলাতে হয় না। কিছু ক্ষত সময়ের সাথে বিলিন হয়ে যায় আর কিছু ঈশ্বরের হাতে। ক্ষমা শুধু অন্যকে মুক্তি দেয় না ক্ষমাকারীকেও মুক্ত করে দেয়। যে ক্ষমা করতে শেষে তার বার্ধক্য হয় প্রশান্ত। আর জীবন পায় পূর্ণতা। গেয়ে বেড়ায় “জীবনের অনেকটা পথ একলাই পেরিয়ে এসেছি কী পেয়েছি কী পাইনি তার হিসাবটুকু রাখিনি। চলার পথে দেখা দৃশ্যগুলি স্মৃতির পাতায় ধরে রেখেছি।” আমরা যেন ভুলি না যায় প্রতিশোধ ক্ষণিকের তৃপ্তি দেয় আর ক্ষমা দেয় দীর্ঘস্থায়ী মুক্তি। সংকীর্ণতা হিসাব রাখে বৃহৎমন হিসাব মুছে দেয়।
লেখক: প্রাক্তন চিফ অ্যানাসথেসিওলজিস্ট, বাংলাদেশ রেলওয়ে হাসপাতাল, চট্টগ্রাম।











