কক্সবাজারের পেকুয়া উপকূলকে ঘিরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকায় নিয়মিত প্রবাহিত সামুদ্রিক বাতাসকে কাজে লাগিয়ে বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি বড় পরিসরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় পেকুয়া অঞ্চলে প্রস্তাবিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব একনেক সভায় উঠেছে। কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকায় বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনার বাস্তব উদাহরণ ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে। কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুল, পিএমখালী, পোকখালী ও চৌফলদণ্ডী ইউনিয়নের উপকূলীয় এলাকায় ২২টি বায়ু টারবাইন নিয়ে স্থাপিত ৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রটি ২০২৩ সালের ২৫ মে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং ২০২৪ সালের ৮ মার্চ বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে। এ কেন্দ্র থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ২৯ কোটি ৮২ লাখ কিলোওয়াট–ঘণ্টা বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ হয়েছে। এ প্রকল্পের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, কক্সবাজারের উপকূলীয় অঞ্চলে বাতাসকে কাজে লাগিয়ে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে পেকুয়ার মগনামা, উজানটিয়া, রাজাখালীসহ বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকায় বায়ুপ্রবাহের সম্ভাবনাকে বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করে পরিকল্পিতভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। কক্সবাজার বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল কাদের গনি জানান, বাতাসের গতিবেগ প্রতি সেকেন্ডে ৩ মিটারের বেশি হলে বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়। আর কেন্দ্রটির পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বাতাসের গতিবেগ প্রতি সেকেন্ডে ৯ মিটারের বেশি প্রয়োজন। বাতাসের গতিবেগের তারতম্যের ওপর নির্ভর করে কেন্দ্রটি থেকে সর্বনিম্ন ১৫ মেগাওয়াট থেকে সর্বোচ্চ ৬০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব। তার মতে, কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ উপকূলজুড়ে প্রবাহিত সামুদ্রিক বাতাসকে পরিকল্পিত ও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারলে বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি বৃহৎ পরিসরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়নেরও উল্লেখযোগ্য সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা ক্রমবর্ধমান। একই সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌর, বায়ু ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও গুরুত্ব পাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে পেকুয়ার উপকূলীয় এলাকা ভবিষ্যতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
এ বিষয়ে ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) এর সদস্য সচিব এবং ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ এর সমন্বয়ক শরীফ জামিল বলেন, বাংলাদেশের উপকূলীয় এই অঞ্চলে বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা নিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন সমীক্ষা হয়েছে। পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং কৃষক ও লবণচাষিদের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পিতভাবে এ সম্ভাবনা কাজে লাগানো গেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে এর সুফল শুধু উপকূলীয় জনগোষ্ঠী নয়, দেশের সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থাতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো এলাকায় বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে দীর্ঘমেয়াদি বাতাসের গতি, দিক, মৌসুমী পরিবর্তন, ভূমির ব্যবহার, পরিবেশগত প্রভাব এবং গ্রিড সংযোগের সক্ষমতা যাচাই জরুরি। এসব তথ্যের ভিত্তিতে প্রকল্প নির্বাচন করা হলে উপকূলীয় বাতাসকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কার্যকর উৎসে পরিণত করা সম্ভব।
এদিকে পেকুয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব একনেকে আলোচনায় আসায় স্থানীয়ভাবে নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়ন, স্থানীয় কর্মসংস্থান এবং উপকূলীয় অর্থনীতিতে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় জনগণের ভূমি ও জীবিকার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি সুফল নিশ্চিত করা জরুরি।
বঙ্গোপসাগরের নিকটবর্তী পেকুয়ার উপকূলের ভৌগোলিক অবস্থান এবং সম্ভাব্য বায়ুপ্রবাহকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগাতে পারলে এ অঞ্চল শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেই নয়, দেশের পরিষ্কার ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।













