তিন দফা দাবিতে রাঙামাটির সাজেকে আবারও অনির্দিষ্টকালের জন্য সড়ক অবরোধ শুরু করেছে ইউপিডিএফ সমর্থিত সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী অ্যাসোসিয়েশন।
গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে অবরোধের কারণে সাজেকের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়েছে। বারবার অবরোধের ঘটনায় সাজেকে পর্যটকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় খাগড়াছড়ির সামগ্রিক পর্যটনশিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। এতে পরিবহন মালিক, চালক, হোটেল–মোটেল ব্যবসায়ী ও স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা করছেন। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সাজেক সড়কের বাঘাইহাটের ১০ নম্বর এলাকায় টায়ার জ্বালিয়ে পিকেটিং শুরু করেন অবরোধকারীরা। সাজেক থেকে জনসংহতি সমিতির সদস্যদের সরিয়ে নেওয়াসহ তিন দফা দাবি পূরণ না হওয়ায় এ কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। এর আগে দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত অবরোধ স্থগিত রাখা হয়েছিল। অবরোধের খবর না জেনে খাগড়াছড়িতে গিয়ে সাজেকে যেতে না পেরে বিপাকে পড়েন অনেক পর্যটক। আকস্মিক অবরোধে ভ্রমণ পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ায় হতাশ পর্যটকেরা। কেউ খাগড়াছড়ির অন্যান্য পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে বাড়ি ফেরার পরিকল্পনা করছেন, আবার কেউ যাচ্ছেন অন্য গন্তব্যে। পর্যটক শায়লা শারমিন বলেন, অনেক আশা নিয়ে সাজেক ঘুরতে এসেছিলাম। কিন্তু এখানে এসে অবরোধের কথা জানতে পারি। এখন কোথায় যাব, কীভাবে ফিরব, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছি। তাই খাগড়াছড়ির পর্যটনকেন্দ্রগুলো ঘুরে ঢাকায় ফিরব।
আরেক পর্যটক ফয়সাল আরেফিন বলেন, সাজেকের সৌন্দর্য উপভোগ করতে এসেছিলাম। কিন্তু অবরোধের কারণে পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘুরতে পারিনি। পরিবার নিয়ে দুই দিনের ছুটিতে এসেছিলাম। এখন বাধ্য হয়ে বান্দরবান চলে যাচ্ছি। সাজেকে কিছুদিন পরপর এমন অস্থিরতার কারণে পর্যটকেরা আগ্রহ হারাচ্ছেন। প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এ বিষয়ে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
বন্ধ পরিবহন, আয়–রোজগার নিয়ে দুশ্চিন্তা : অবরোধের কারণে সাজেকগামী যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে আয়–রোজগার হারিয়ে বিপাকে পড়েছেন পরিবহন মালিক ও শ্রমিকেরা। সাজেকের জিপচালক ইব্রাহিম বলেন, সড়ক বন্ধ থাকায় আমাদের গাড়ি বসে আছে। গাড়ি চালাতে না পারায় আয়–রোজগারও বন্ধ। এভাবে হঠাৎ অবরোধ হলে পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। খাগড়াছড়ি সাজেক কাউন্টারের ব্যবস্থাপক মো. আরিফ বলেন, প্রতিদিন তাদের কাউন্টার থেকে অন্তত ১০০ থেকে ১৫০টি পর্যটকবাহী জিপ সাজেকের উদ্দেশে ছেড়ে যেত। তবে তৃতীয়বারের মতো অবরোধ শুরু হওয়ায় বৃহস্পতিবার কোনো পরিবহন সাজেকের উদ্দেশে ছেড়ে যায়নি। পরিস্থিতি জানিয়ে টিকিট নিতে আসা পর্যটকদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
খাগড়াছড়ি সিএনজি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জসীম উদ্দিন বলেন, সড়ক বন্ধ থাকায় তাঁদের গাড়িগুলো ডিপোতে বসে আছে। আকস্মিক অবরোধে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকেরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
হোটেল–মোটেলেও পর্যটক কম : পর্যটকের উপস্থিতি কমে যাওয়ায় খাগড়াছড়ির হোটেল–মোটেল ব্যবসায়ও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। খাগড়াছড়ির হোটেল অরণ্য বিলাসের ব্যবস্থাপক আব্দুর রশীদ সাগর বলেন, খাগড়াছড়িতে তুলনামূলকভাবে পর্যটক অনেক কমে গেছে। পর্যটনের এ মৌসুমে সাজেকে আবারও অবরোধ শুরু হওয়ায় পর্যটকেরা খাগড়াছড়িতে আসতে চাইছেন না। তাদের হোটেলেও অতিথির সংখ্যা কমেছে। তিনি বলেন, খাগড়াছড়িতে আলুটিলা, জেলা পরিষদ পার্কসহ অনেক পর্যটনকেন্দ্র রয়েছে। পর্যটকেরা চাইলে এসব স্থান ঘুরে দেখতে পারেন।
খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ পার্কের কাউন্টারের দায়িত্বে থাকা মনোতোষ ত্রিপুরা বলেন, সাজেকে কিছুদিন পরপর অবরোধের কারণে পর্যটক কমে যাচ্ছে। দ্রুত এ সমস্যার সমাধান করে পর্যটনশিল্প রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করেন তিনি।
যানবাহন মালিক সমিতির সভাপতি আয়ুস চাকমা বলেন, পর্যটন বন্ধ থাকায় অনেক শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। চালক ও সহকারীদের অনেকে দৈনিক মজুরিতে কাজ করেন। কয়েক দিন পরপর অবরোধ হওয়ায় তাদের সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছে। গাড়ির মালিকেরাও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, তাদের অনেকেই ঋণ নিয়ে গাড়ি কিনেছেন। মাস শেষে ব্যাংক ও সমিতিকে কিস্তি দিতে হয়। অবরোধের কারণে গাড়ি না চললেও কিস্তি বন্ধ থাকে না।
ই–ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (ইটাব) সদস্য উজ্জ্বল বলেন, সাজেক কার্বারী অ্যাসোসিয়েশনের নামে একটি প্রতিষ্ঠান সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে অবরোধের ডাক দিয়েছে। দুই আঞ্চলিক সংগঠনের বিরোধের জেরে পর্যটন ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কয়েক দিন পরপর আন্দোলন কর্মসূচি দেওয়ায় পর্যটকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। পর্যটন মৌসুমে সাজেককে ঘিরে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ টাকা আয় হতো। এখন পর্যটক না আসায় সেই আয় বন্ধ হয়ে গেছে।
খাগড়াছড়ি হোটেল মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক জহিরুল ইসলাম বলেন, খাগড়াছড়ি শহরে ৪৩টি হোটেল রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা ক্ষতি হচ্ছে শুধুমাত্র সাজেক বন্ধ হওয়ার কারণে।
তবে আলোচনার মাধম্যে সংকট নিরসনের কথা বলেছেন খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সর্ম্পকিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ওয়াদুদ ভূইয়া। তিনি বলেন, সাজেকে সামপ্রতিককালে যে সমস্যা চলছে, এটা সমস্যা যেন শান্ত থাকে। এটি যেন আর বড় না হয়, সকলের জন্য একটা অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়; যেজন্য আমরা সকলে কাজ করব। তাই আমি এমপি দীপেন দেওয়ান, সন্তু বাবু (আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান সন্তু লারমা) ও ইউপিডিএফসহ যারা আছেন সকলকে অনুরোধ করব, যাদের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে তাদের সঙ্গে সবাই মিলে আলোচনা করে দ্রুত এর সমাধান করা দরকার।











