নারীর মনের গহিনে এক অদৃশ্য জানালা থাকে। সেই জানালা দিয়ে কেউ অবারিত আকাশ দেখেন, কেউ আবার ঝড়ের ভয়ে কপাট এঁটে বসে থাকেন। অথচ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে ২০২৬–এর প্রাক্কালে আমাদের মূল সুর ছিল, জানালার আগল খুলে দেওয়া। এবারের থিম ছিলো-‘ইফ টু গেইন’ অর্থাৎ অর্জনের পথে নিজেকে মেলে ধরা।
চট্টগ্রাম পাহাড়–সমুদ্র ঘেরা জনপদ। এই জনপদে নারীরা যুগ যুগ ধরে অদম্য। কিন্তু আজও প্রতিটি নারী তার মনের জানালাটি পুরোপুরি খুলতে পারেননি।
সমাজে আমরা দুই ধরনের নারী দেখি। একদল নারী তাদের আত্মবিশ্বাসের জানালাটি সাহসের সঙ্গে খুলে দিয়েছেন। তাঁরা তাদের মেধা, দক্ষতা আর সৃজনশীলতার এক বিশাল ঝাঁপি বা ডালি সাজিয়ে বসেছেন। উদ্যোক্তা হিসেবে হোক কিংবা পেশাজীবী তারা জানেন, সাহসীকতাই কেবল আলো নিয়ে আসে ঘরে।
এখনো অসংখ্য নারীর কপাট বন্ধ। সামাজিক সংস্কার, লোকলজ্জার ভয় কিংবা পারিবারিক কড়াকড়ি তাদের আটকে রেখেছে। সেই বন্ধ জানালার ওপাশে কতশত গল্প, অভিনব আইডিয়া আর কত সম্ভাবনা গুমরে মরছে, তার হিসাব সমাজ রাখছে না। অথচ এই কপাট খুললেই বেরিয়ে আসতে পারত একজন দক্ষ কারিগর বা এক অনন্য নেতৃত্ব। মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, নারীরা যখন তাদের মনের অব্যক্ত কথাগুলো প্রকাশ করতে পারেন না, তখন তাদের সৃজনশীলতা বাধাগ্রস্ত হয়। মনের কোণে জমানো কথাগুলো কেবল দীর্ঘশ্বাস হয়ে রয়।
সমপ্রীতি পাহাড়ঘেরা এক চমৎকার নারী–কলেজে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। কলেজ ও হোস্টেলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সত্যিই মুগ্ধ করার মতো। এমন একটি নয়নাভিরাম পরিবেশে তরুণীদের প্রজাপতির মতো মুক্ত ডানায় ঘুরে বেড়ানোর কথা। কিন্তু অদ্ভুত এক বাস্তবতায় মন ভারাক্রান্ত হলো, যে বয়সে প্রাণশক্তিতে ভরপুর থাকার কথা, এই মেয়েদের মধ্যে যেন সেই স্বাভাবিক চপলতা ও স্বতঃস্ফূর্ততার বড়ই অভাব।
কাছে গিয়ে কথা বলে আসল চিত্রটি স্পষ্ট হলো। তাদের অধিকাংশই মফস্বল বা গ্রাম থেকে আসা। নারী হওয়াতে পরিবারের কড়া অনুশাসন, রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি এবং কঠোর বিধিনিষেধের বেড়াজালে তাদের শৈশব–কৈশোরের স্বাভাবিক আনন্দগুলো যেন আগেই বন্দী হয়ে আছে। তাদের কথাবার্তায় এক ধরনের গভীর জড়তা ও সংকোচ স্পষ্ট। মনে হচ্ছিল, তারা চাইলেও প্রাণ খুলে হাসতে বা কথা বলতে ভয় পায়। পারিপার্শ্বিক শৃঙ্খলের অদৃশ্য ছায়া তাদের অদম্য মানসিক বাড়বৃদ্ধিকে যেন অনেকটাই স্তিমিত করে দিয়েছে।
তবে আশার আলোও রয়েছে। অধ্যয়নরত কয়েকজন তরুণীর আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এই প্রতিকূলতা পেরিয়ে এদের মধ্য থেকেই অনেকে সব সামাজিক ও মানসিক বন্ধন ছিন্ন করে একদিন সাফল্যের শিখরে পৌঁছাবে।
মনে রাখতে হবে কিছু অর্জন করতে হলে নিজেকে প্রকাশ করা অপরিহার্য। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বেগম রোকেয়া থেকে শুরু করে আজকের সফল নারী উদ্যোক্তারা, সবাই আগে তাদের মনের জানালাটি খুলেছিলেন। তারা জানতেন, গন্ডির বাইরে না তাকালে অবারিত আকাশের খোঁজ পাওয়া অসম্ভব। প্রাপ্তির মিছিলে শামিল হতে হলে নারীদের আগে নিজেদের ভেতরের জড়তা কাটিয়ে মন জানালা খুলে দিতে হবে।
বাংলাদেশের আর্থ–সামাজিক প্রেক্ষাপটে নারী ক্ষমতায়ন এবং পরিবেশ সুরক্ষার এই দ্বিমুখী মিশনে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং কাঠামোগত বৈষম্যকে চিহ্নিত করা হয়। এটি কেবল একটি সমস্যা নয়, বরং একটি শিকড়, যা অন্য সকল সীমাবদ্ধতাকে লালন করে। আমাদের সমাজব্যবস্থায় অধিকাংশ পরিবারে বড় কোনো সিদ্ধান্তে যেমন, অর্থনৈতিক বিনিয়োগ, জমির ব্যবহার বা পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে রূপান্তর নেওয়ার ক্ষমতা পুরুষদের হাতে থাকে। নারী যদি পরিবেশবান্ধব কোনো উদ্যোগ নিতে চান, তবে অনেক ক্ষেত্রেই তিনি পরিবারের সমর্থন বা আর্থিক সহযোগিতা পান না।
উপরে ওঠার প্রথম ধাপ হলো নিজেকে অক্ষম ভাবার মানসিকতা ঝেড়ে ফেলা। শিক্ষা, দক্ষতা অর্জন এবং নিজের অধিকার সম্পর্কে জ্ঞান থাকা অত্যন্ত জরুরি। যেকোনো বাধা এলে ভেঙে না পড়ে সেটিকে একটি শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে নারীকে । নিজের স্বকীয়তাকে বিশ্বাস করা এবং নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে সম্মান জানানোই হলো প্রকৃত শক্তির উৎস।
একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে দাঁড়িয়ে আমরা যখন সমসাময়িক ঘটনার দিকে তাকাই, তখন কেবল নারী নির্যাতনের করুণ চিত্র নয়, বরং সাহসের জয়গানও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। কোন কোন নারী আজ আর কেবল ঘরের কোণে সীমাবদ্ধ নন। তারা ভেঙে ফেলেছেন প্রথাগত সব দেয়াল। আকাশ ছোঁয়া উচ্চাকাঙ্ক্ষায় আর অদম্য জেদ নিয়ে তারা প্রমাণ করছেন, সুযোগ পেলে পৃথিবী বদলানোর ক্ষমতা তাদের হাতেও সমানভাবে বিদ্যমান।
সামপ্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের নারীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছেন, তা সত্যিই বিস্ময়কর। খেলাধুলা থেকে শুরু করে প্রযুক্তি, রাজনীতি থেকে মহাকাশ গবেষণা, সবখানেই নারীর পদচারণা আজ আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের মেয়েদের টানা শিরোপা জয় কেবল একটি ট্রফি জয় নয়, এটি একটি সামাজিক বিপ্লব গায়ের রঙ, দারিদ্র্য কিংবা সামাজিক বাধা জয় করে তারা আজ লক্ষ লক্ষ কিশোরীর অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে।
ফেসবুকভিত্তিক ব্যবসার মাধ্যমে আজ দেশের হাজারো নারী স্বাবলম্বী হয়েছেন। ছোট পরিসরে শুরু করা উদ্যোগগুলো এখন বড় বড় প্রতিষ্ঠানের রূপ নিচ্ছে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে রাখছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। পুরুষশাসিত প্রযুক্তি খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সাফল্যের এই উজ্জ্বলতার নিচেও রয়ে গেছে কিছু তিক্ত বাস্তবতা। কর্মক্ষেত্রে বেতনবৈষম্য, যাতায়াতে নিরাপত্তাহীনতা এবং সাইবার বুলিংয়ের মতো নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন নারীরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নেতিবাচক ব্যবহার অনেক সময় মেধাবী নারীদের মানসিকভাবে ভেঙে ফেলার চেষ্টা করছে।
নারীর সাফল্য মানেই কেবল ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এটি একটি জাতির এগিয়ে যাওয়ার মাপকাঠি। যে সমাজ তার নারীদের সম্মান এবং সুরক্ষা দিতে পারে না, সে সমাজ কখনোই টেকসই উন্নয়ন করতে পারে না।
নারীদের জানতে হবে, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেয়ে বড় স্বাধীনতা আর নেই। সমাজের সমালোচনাকে তোয়াক্কা না করে নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকা নারীই সাফল্যেও সিঁড়ি বেয়ে উঠতে পেরেছে।
নারী যখন সাহসী হয়ে ওঠেন, তখন সমাজকে হতে হবে আরও সহনশীল। একজন নারীর উত্তরণের পথটি মসৃণ নয়, কিন্তু অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে তা অসাধ্যও নয়। প্রতিটি নারী হোক তাঁর নিজের আকাশের ধ্রুবতারা।











